কক্সবাজারের টেকনাফ-কক্সবাজার সড়কে দিনের বেলায় যাত্রীবাহী বাস থামিয়ে বিকাশের ৫৭ লাখ টাকা লুটের ঘটনায় দুই সন্দেহভাজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। গত সোমবার রাতে টেকনাফের হ্নীলা ইউনিয়নের লেদা এলাকার নুরালীপাড়ায় অভিযান চালিয়ে তাঁদের আটক করা হয়। তবে ঘটনার চার দিন পেরিয়ে গেলেও লুট হওয়া অর্থ উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। এ ঘটনায় আরও জড়িতদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
পুলিশের প্রাথমিক তদন্ত ও প্রত্যক্ষদর্শীদের তথ্য অনুযায়ী, বাসটি টেকনাফ স্টেশন ছাড়ার পর একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশায় থাকা বোরকা পরিহিত এক নারী বাসটিকে অনুসরণ করছিলেন। তদন্তকারীদের ধারণা, তাঁর দেওয়া সংকেতের পরই পাহাড় থেকে নেমে আসে সাত থেকে আট সদস্যের একটি সশস্ত্র ডাকাত দল। তারা সড়কে গাছের গুঁড়ি ও পেরেকযুক্ত কাঠ ফেলে বাসের গতি থামিয়ে দেয়। পরে অস্ত্রধারী চারজন বাসে উঠে দুই বিকাশ প্রতিনিধির কাছ থেকে ৫৭ লাখ টাকা ছিনিয়ে নেয়। এ সময় তাঁদের মারধর ও ছুরিকাঘাত করা হয়।
ঘটনাটি ঘটে গত ২ আগস্ট বেলা পৌনে ১টার দিকে টেকনাফের হ্নীলা ইউনিয়নের দমদমিয়া এলাকার ১৪ নম্বর সেতুর কাছে। টেকনাফ থেকে কক্সবাজারগামী বাসটিতে তখন প্রায় ৩০ জন যাত্রী ছিলেন। পুরো ডাকাতির ঘটনা শেষ হতে সময় লাগে প্রায় ১৫ থেকে ২০ মিনিট।
পুলিশ, মামলার এজাহার এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের তথ্য অনুযায়ী, ঘটনার দিন দুপুরে টেকনাফের দুটি ব্যাংক থেকে নগদ অর্থ তুলে তিনজন বিকাশ এজেন্টের বিক্রয় প্রতিনিধি পালকি পরিবহনের একটি বাসে ওঠেন। হ্নীলা বাজারে গ্রাহকদের মধ্যে অর্থ বিতরণের জন্য তাঁদের কাছে মোট ৮২ লাখ টাকা ছিল।
এর মধ্যে একরাম হোছেনের কাছে ছিল ৩৫ লাখ টাকা, আল আরমানের কাছে ২২ লাখ টাকা এবং আবদুল করিমের কাছে ছিল ২৫ লাখ টাকা। বাসে একরাম ও আরমান পাশাপাশি এবং তাঁদের সামনের আসনে বসেছিলেন করিম।
যাত্রাপথে যাত্রীরা লক্ষ্য করেন, একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশায় থাকা কালো বোরকা পরিহিত এক নারী বাসটিকে অনুসরণ করছেন। কয়েকজন যাত্রীর ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি বারবার মোবাইল ফোনে কারও সঙ্গে কথা বলছিলেন।
দমদমিয়া এলাকার ১৪ নম্বর সেতুর কাছে পৌঁছানোর পর সড়কে গাছের গুঁড়ি ও পেরেকযুক্ত কাঠ ফেলে বাসের পথরোধ করা হয়। বাস থামতেই পাহাড় থেকে নেমে আসা মুখোশধারী সশস্ত্র ব্যক্তিরা কয়েক রাউন্ড ফাঁকা গুলি ছুড়ে যাত্রীদের আতঙ্কিত করে।
মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে, বাসে যাত্রী সেজে থাকা একজন ব্যক্তি একরাম ও আরমানকে শনাক্ত করে ডাকাতদের দেখিয়ে দেন। এরপর ডাকাতরা আল আরমানের কাছ থেকে টাকার ব্যাগ ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করলে তিনি বাধা দেন। এতে তাঁকে পিঠের ডান পাশে ছুরিকাঘাত করা হয় এবং তাঁর কাছ থেকে ২২ লাখ টাকা ছিনিয়ে নেওয়া হয়। একইভাবে একরাম হোছেনকে মারধর করে তাঁর কাছ থেকে ৩৫ লাখ টাকা লুট করা হয়। এরপর ডাকাতরা দ্রুত পাহাড়ের দিকে পালিয়ে যায়। একই সময় ওই নারী অটোরিকশা নিয়ে কক্সবাজারমুখী হন বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন।
বাসের যাত্রীদের বক্তব্য অনুযায়ী, ডাকাতরা সরাসরি বিকাশ প্রতিনিধিদের কাছে গিয়ে টাকার ব্যাগ ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে। এতে পুলিশের ধারণা, ডাকাত দলের সদস্যদের কেউ আগে থেকেই প্রতিনিধিদের চিনতেন অথবা বাসের ভেতর থেকে কেউ তাঁদের পরিচয় ও অর্থ বহনের তথ্য সরবরাহ করেছিলেন।
ঘটনার পরদিন ৩ আগস্ট বিকাশের বিক্রয় প্রতিনিধি একরাম হোছেন টেকনাফ মডেল থানায় মামলা করেন। মামলায় সাত থেকে আটজন অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে।
ডাকাতির পর বিজিবি, র্যাব ও পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে আহত আল আরমান ও একরাম হোছেনকে উদ্ধার করে টেকনাফ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেয়। পরে আল আরমানকে উন্নত চিকিৎসার জন্য কক্সবাজার সদর হাসপাতালে পাঠানো হয়।
বিকাশের টেকনাফ এজেন্ট আবদুল করিম বলেন, প্রতিদিনের মতো ওই দিনও তিনজন বিক্রয় প্রতিনিধি গ্রাহকদের কাছে অর্থ পৌঁছে দিতে যাচ্ছিলেন। তাঁদের কাছে মোট ৮২ লাখ টাকা ছিল, যার মধ্যে দুই প্রতিনিধির কাছ থেকে ৫৭ লাখ টাকা লুট হয়।
তিনি বলেন, “বাসটির আগে আগে একটি অটোরিকশায় একজন নারী অনুসরণ করছিলেন। ওই নারীর সংকেতেই ডাকাতেরা পাহাড় থেকে নেমে এসে লুট করেছে বলে এলাকায় আলোচনা হচ্ছে। তবে ওই নারীর পরিচয় এখনো শনাক্ত হয়নি।”
তদন্তে ডাকাত দলের সদস্যদের পরিচয় ও সম্ভাব্য সহযোগীদের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করছে পুলিশ। এজাহার অনুযায়ী, ডাকাতরা কক্সবাজার অঞ্চলের আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলছিলেন। তাঁদের বয়স আনুমানিক ২৫ থেকে ৩৫ বছরের মধ্যে। কারও গায়ের রং শ্যামলা, কারও কালো। তাঁদের পরনে ছিল গেঞ্জি, টি-শার্ট এবং হাফ ও ফুল প্যান্ট।
টেকনাফ মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাইফুল ইসলাম বলেন, “ডাকাতির নেপথ্যে নানা তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। বাসটিকে একজন নারীর অনুসরণ করার বিষয়টি অনুসন্ধান করা হচ্ছে। বাসের চালক, সহকারী কিংবা কোনো যাত্রীর সংশ্লিষ্টতা ছিল কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।”
পুলিশ জানায়, গত সোমবার রাতে লেদা রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরসংলগ্ন নুরালীপাড়া এলাকায় অভিযান চালিয়ে আকতার হোসেন ও নজরুল ইসলামকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁরা দুজনই লেদা এলাকার বাসিন্দা এবং ঘটনাস্থল থেকে তাঁদের বাড়ির দূরত্ব প্রায় দুই কিলোমিটার।
পুলিশের দাবি, বাস থামিয়ে অর্থ লুটের ঘটনায় তাঁদের সম্পৃক্ততার প্রাথমিক তথ্য পাওয়া গেছে। আকতার হোসেনের বিরুদ্ধে মাদক, হত্যা ও ডাকাতিসহ একাধিক মামলা রয়েছে।
তদন্তসংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে, এ ঘটনায় আকতার হোসেন, তাঁর ভাই ইমান হোসেন, ভাগনে কামাল হোসেন, আজিজুর রহমান, মিজানুর রহমান, মোহাম্মদ আলম, রাসেল ও খালেকসহ আরও কয়েকজন জড়িত থাকতে পারেন। তাঁদের মধ্যে রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীও থাকতে পারে বলে তদন্তকারীদের ধারণা।
ওসি সাইফুল ইসলাম জানান, গ্রেপ্তার দুই আসামিকে ডাকাতি মামলায় আদালতে পাঠানো হয়েছে এবং তাঁদের জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ১০ দিনের রিমান্ড আবেদন করা হয়েছে। একই সঙ্গে লুট হওয়া অর্থ উদ্ধার এবং ঘটনার সঙ্গে জড়িত অন্যদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
