জমির সংকোচন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, কমে আসা আবর্তকাল এবং নতুন প্রজন্মের অনাগ্রহ—এই চারটি বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে পার্বত্য চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী বহুফসলি জুমচাষ ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি শুধু একটি কৃষিপদ্ধতির সংকট নয়; বরং আদিবাসী জনগোষ্ঠীর জীবনধারা, সংস্কৃতি, খাদ্যনিরাপত্তা ও প্রজন্মান্তরে গড়ে ওঠা জ্ঞানেরও সংকট।
খাগড়াছড়ির দীঘিনালা উপজেলার পাহাড়ি গ্রাম সীমানাপাড়ার বাসিন্দা ৭২ বছর বয়সী বনেরঞ্জন ত্রিপুরা এখনও পাহাড়ের ঢালে জুমচাষ করে জীবিকা নির্বাহ করছেন। তাঁর জুম খেতে ধান, কুমড়া, মরিচ, তিল, ভুট্টা, হলুদ ও শিমসহ নানা ধরনের ফসল উৎপাদিত হয়। তবে বয়সের ভার, শ্রমিকের সংকট এবং জমির স্বল্পতার কারণে আগামী বছর থেকে তিনি আর জুম করতে পারবেন কি না, তা নিয়ে সংশয়ে রয়েছেন।
বনেরঞ্জন জানান, একসময় একই পাহাড়ে ১০ থেকে ১২ বছর পরপর চাষ করা হতো। এতে জমির উর্বরতা ফিরে আসত এবং বনও পুনরায় গড়ে উঠত। এখন জমির অভাবে মাত্র তিন বছর পরই একই স্থানে আবার জুম করতে হচ্ছে। ফলে ফলন কমে যাচ্ছে এবং আগের মতো সার ও কীটনাশক ছাড়া চাষ করা সম্ভব হচ্ছে না।
তিনি বলেন, “আগে জুমের ফসলে সারা বছর চলে যেত। আমার এখনো ১০ মাস চলে যায়। কিন্তু এখন অনেকের ছয় মাসও চলে না। পাহাড়ে আমাদের বাঁচার উপায় কী?”
পার্বত্য চট্টগ্রামের চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, তঞ্চঙ্গ্যা, ম্রো, বম, খুমি, খিয়াং, পাংখোয়া, চাক ও লুসাইসহ বিভিন্ন আদিবাসী জনগোষ্ঠীর কাছে জুমচাষ শুধু কৃষিকাজ নয়। এটি খাদ্যসংস্কৃতি, সামাজিক সম্পর্ক, উৎসব, বিশ্বাস এবং ঐতিহ্যবাহী জ্ঞানের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জুম একটি বহুফসলি কৃষিপদ্ধতি, যেখানে একই জমিতে ধান, ভুট্টা, কুমড়া, মরিচ, তিল, আদা, হলুদ, শিমসহ নানা ধরনের ফসল একসঙ্গে উৎপাদিত হয়। এতে খাদ্যের বৈচিত্র্য যেমন বাড়ে, তেমনি একটি ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হলেও অন্য ফসল থেকে কৃষকের খাদ্য ও আয়ের সুযোগ তৈরি হয়।
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) এবং সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল ফরেস্ট্রি রিসার্চ অ্যান্ড ওয়ার্ল্ড অ্যাগ্রোফরেস্ট্রির (সিফর-আইসিআরএএফ) বিভিন্ন গবেষণায় বলা হয়েছে, জুমকে শুধুমাত্র বন উজাড়ের কারণ হিসেবে দেখলে বাস্তবতা সম্পূর্ণভাবে প্রতিফলিত হয় না।
গবেষণাগুলোতে বলা হয়েছে, পর্যাপ্ত সময় জমি পতিত রাখার সুযোগ থাকলে সেখানে দ্বিতীয় পর্যায়ের বন গড়ে ওঠে, মাটির উর্বরতা ফিরে আসে এবং জীববৈচিত্র্যও পুনরুদ্ধার হতে পারে। তবে পতিত রাখার সময় কমে গেলে মাটির জৈব উপাদান হ্রাস, আগাছা বৃদ্ধি এবং উৎপাদন কমে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।
গত কয়েক দশকে পার্বত্য চট্টগ্রামে ভূমি ব্যবহারে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের কারণে বিপুল কৃষিজমি পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ার পর পাহাড়ি ঢালে কৃষির চাপ বাড়ে। পরবর্তীতে জনসংখ্যা বৃদ্ধি, নতুন বসতি, সংরক্ষিত বন, সড়ক, পর্যটন, ফলের বাগান, রাবারসহ বাণিজ্যিক চাষ এবং বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের কারণে জুমের জন্য উন্মুক্ত জমির পরিমাণ আরও কমে যায়।
এর ফলে আগে যেখানে ১০ থেকে ২০ বছর পর একই জমিতে ফিরে চাষ করা হতো, এখন অনেক এলাকায় তিন থেকে পাঁচ বছরের মধ্যেই একই জমি পুনরায় ব্যবহার করতে হচ্ছে।
খাগড়াছড়ির কুমারধনপাড়ার কৃষক মঞ্জু বিকাশ ত্রিপুরা জানান, ছোটবেলায় একটি জুম খেতে বিভিন্ন জাতের দেশি ধান, তিল, তুলা, কুমড়া ও মরিচসহ বহু ধরনের ফসল উৎপাদিত হতো। এখন সেই বৈচিত্র্য অনেক কমে গেছে।
তিনি বলেন, “আমার পরে আমার বংশে আর কোনো জুমিয়া থাকবে না।”
তাঁর দুই ছেলে উচ্চশিক্ষিত। একজন রাঙামাটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা শেষ করেছেন, অন্যজন ডিপ্লোমা প্রকৌশলী। তাঁরা কেউই জুমচাষে ফিরবেন না।
একই গ্রামের দীপন ত্রিপুরাও জানান, তাঁর বাবা বয়সের কারণে দুই বছর আগে জুমচাষ ছেড়ে দিয়েছেন এবং পরিবারের নতুন প্রজন্মও আর এ পেশায় ফিরছে না।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী—
- বান্দরবান: ২০২০-২১ অর্থবছরে জুমের জমি ছিল ৯ হাজার ২০ হেক্টর, যা ২০২৫-২৬ অর্থবছরে কমে দাঁড়িয়েছে ৮ হাজার ১৭৪ হেক্টরে। একই সময়ে ফলচাষের জমি ৪৬ হাজার ১০৪ হেক্টর থেকে বেড়ে হয়েছে ৫১ হাজার ৮৩২ হেক্টর।
- রাঙামাটি: একই সময়ে জুমের জমি ৬ হাজার ৫১০ হেক্টর থেকে কমে ৫ হাজার ২ হেক্টরে নেমেছে। বিপরীতে ফলচাষের জমি ৩৫ হাজার ৩১৮ হেক্টর থেকে বেড়ে হয়েছে ৩৬ হাজার ৯৯০ হেক্টর।
- খাগড়াছড়ি: ২০১৪-১৫ অর্থবছরে জুমের আওতা ছিল ২ হাজার ১৯৫ হেক্টর। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা কমে হয়েছে ১ হাজার ১৫০ হেক্টর। একই সময়ে উৎপাদন ২ হাজার ৮১৬ টন থেকে কমে ২ হাজার ১২৮ টনে নেমেছে।
জুমচাষ সম্পূর্ণভাবে ঋতুচক্র ও বৃষ্টির ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বৃষ্টির সময় ও ধরনে বড় ধরনের পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন কৃষকেরা।
জুমিয়া নারী কৃষক বিমলা ত্রিপুরা বলেন, অতিরিক্ত গরমের কারণে ফসলের ক্ষতি হচ্ছে। পাশাপাশি পোকামাকড় ও আগাছার আক্রমণ বাড়ায় কীটনাশকের ব্যবহারও বেড়েছে।
বাংলাদেশ ও নরওয়ের আবহাওয়া অধিদপ্তরের যৌথ গবেষণা ‘চেঞ্জিং ক্লাইমেট ইন বাংলাদেশ’ (২০২৫)-এ দেখা গেছে, গত ১০ বছরে পার্বত্য চট্টগ্রামে তাপপ্রবাহের সংখ্যা বেড়েছে এবং বর্ষা-পরবর্তী সময়ে অতি ভারী বৃষ্টিপাতও বৃদ্ধি পেয়েছে। চলতি বছরের জুলাই মাসে ওই অঞ্চলে মাত্র এক সপ্তাহে প্রায় ১ হাজার ৪০০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে।
গবেষণার নেতৃত্বদানকারী বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের জ্যেষ্ঠ আবহাওয়াবিদ মো. বজলুর রশিদ বলেন, সমতলে সেচ দিয়ে তাপপ্রবাহের প্রভাব কিছুটা মোকাবিলা করা গেলেও পাহাড়ি জুমচাষে সেই সুযোগ নেই। আবার অসময়ের অতিবৃষ্টিতেও ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হতে পারে।
পার্বত্য চট্টগ্রামে দীর্ঘদিন ধরে জুমকে বন ধ্বংসের অন্যতম কারণ হিসেবে তুলে ধরা হলেও সাম্প্রতিক গবেষণায় বিষয়টিকে আরও বিস্তৃত প্রেক্ষাপটে দেখার আহ্বান জানানো হয়েছে।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বনবিদ্যা ও পরিবেশবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক খালেদ মিসবাহুজ্জামান বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামে নানা কারণে জুমের জমি কমে এসেছে। এ দায় শুধু জুমনির্ভর মানুষের ওপর চাপানো ঠিক হবে না। তাঁর ভাষায়, বিশ্বের বহু দেশেই জুমচাষ প্রচলিত রয়েছে এবং একে সরলভাবে পরিবেশবিরোধী কৃষিপদ্ধতি হিসেবে আখ্যা দেওয়া সঠিক নয়।
অন্যদিকে চাকমা সার্কেলের প্রধান রাজা দেবাশীষ রায় বলেন, পাহাড়ে জুমের বিকল্প খুব সীমিত। তবে বাজার অর্থনীতির প্রভাবের মধ্যেও এমনভাবে পরিবর্তন আনতে হবে, যাতে বহুফসলি চাষ, দেশি বীজ, খাদ্যনিরাপত্তা এবং জুমিয়াদের ঐতিহ্যবাহী জ্ঞান সংরক্ষিত থাকে।
দেশি ফসল ও বীজ সংরক্ষণে খাগড়াছড়ির বেসরকারি সংস্থা জাবারাং কল্যাণ সমিতি জুমচাষিদের ১৫ ধরনের ফসলের বীজ সরবরাহ করছে। সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক মথুরা বিকাশ ত্রিপুরা জানান, হারিয়ে যেতে বসা দেশি ফসল পুনরায় উৎপাদনে কৃষকদের উৎসাহিত করার পাশাপাশি বাজারযোগ্য নতুন ফসল চাষেও সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পার্বত্য চট্টগ্রামে জুমের সংকট কেবল কৃষিজমি কমে যাওয়ার বিষয় নয়। ভূমির অধিকার, পর্যাপ্ত আবর্তকাল, দেশি বীজ সংরক্ষণ, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলা এবং নতুন প্রজন্মকে সম্পৃক্ত করার মাধ্যমে এই ঐতিহ্যবাহী কৃষিপদ্ধতিকে টেকসই রাখাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। বনেরঞ্জন ত্রিপুরা ও মঞ্জু বিকাশ ত্রিপুরার মতো প্রবীণ জুমিয়াদের পর যদি নতুন প্রজন্ম আর এই পেশায় না ফেরে, তবে তাদের সঙ্গে হারিয়ে যেতে পারে পাহাড়ের প্রকৃতি, বীজ, ঋতুচক্র ও কৃষিজ্ঞানভিত্তিক বহু প্রজন্মের উত্তরাধিকার।
