দিল্লিতে শেখ হাসিনার সাংবাদিকদের সঙ্গে সরাসরি মতবিনিময়ের আয়োজনকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্কে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। ঢাকার পক্ষ থেকে এ ঘটনায় ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশের পর ভারত জানিয়েছে, অনুষ্ঠানে শেখ হাসিনার দেওয়া বক্তব্য, বিশেষ করে বাংলাদেশের বৈধভাবে গঠিত সরকারের বিরুদ্ধে দেওয়া বক্তব্য, তারা অনুমোদন করে না। এর মধ্যেই ভারতের গণমাধ্যম ও বিশ্লেষকদের কেউ কেউ শেখ হাসিনার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডকে ঘিরে দিল্লির অবস্থান নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন।
বাংলাদেশ সরকারের দায়িত্বশীল ও কূটনৈতিক একাধিক সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, দিল্লিতে ওই অনুষ্ঠান হওয়ার দুই দিন আগে ভারতের সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের একজন প্রতিনিধির সঙ্গে ঢাকার নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের প্রতিনিধিদের যোগাযোগ হয়েছিল। তখন শেখ হাসিনার গণমাধ্যমের সঙ্গে মতবিনিময় নিয়ে বাংলাদেশের উদ্বেগের কথা জানানো হয়। জবাবে ভারতীয় পক্ষ জানিয়েছিল, শেখ হাসিনার রেকর্ড করা বক্তব্য প্রচার করা হবে এবং গণমাধ্যমকর্মীদের উপস্থিতিও সীমিত থাকবে। শুধু আয়োজক সংগঠনের সদস্যদের অনুষ্ঠানে থাকার কথা বলা হয়েছিল। তবে শেষ পর্যন্ত সে ধরনের আয়োজন দেখা যায়নি।
এর আগে গত ৩০ জুলাই ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার দেশটির পররাষ্ট্রবিষয়ক সংসদীয় কমিটিকে জানিয়েছিল, শেখ হাসিনাকে ভারতের মাটি থেকে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার অনুমতি দেওয়া হয়নি। এর মাত্র এক সপ্তাহের মধ্যে দিল্লিতে সাংবাদিকদের সঙ্গে তাঁর সরাসরি মতবিনিময়ের আয়োজন হয়।
গত বুধবারের ওই অনুষ্ঠানের পর বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিবাদ জানায়। ঢাকার পক্ষ থেকে বলা হয়, শেখ হাসিনাকে নয়াদিল্লিতে সরাসরি গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ দেওয়ায় বাংলাদেশ ক্ষুব্ধ। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, সেখানে শেখ হাসিনা ও তাঁর সহযোগীরা বাংলাদেশ রাষ্ট্র ও জনগণের বিরুদ্ধে ‘বিষাক্ত ঘৃণা’ ছড়িয়েছেন।
বাংলাদেশ আরও জানিয়েছে, দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক পুনর্গঠনের প্রচেষ্টায় এ ধরনের আয়োজনের নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে—এমন উদ্বেগ অনুষ্ঠানটির আগেই ভারতকে জানানো হয়েছিল। এরপরও ভারতের মাটিতে শেখ হাসিনাকে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়ের সুযোগ দেওয়ায় ঢাকা গভীর হতাশা প্রকাশ করেছে।
এদিকে শুক্রবার ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নিয়মিত ব্রিফিংয়ে মুখপাত্র রণধীর জয়সোয়াল শেখ হাসিনার বক্তব্য থেকে নিজেদের দূরত্ব স্পষ্ট করেন। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘ওই মঞ্চ থেকে যা কিছু বলা হয়েছে, বিশেষ করে বাংলাদেশের বৈধভাবে গঠিত (ডিউলি কনস্টিটিউটেড) সরকারের বিরুদ্ধে, তা ভারত সরকার অনুমোদন করে না।’
শেখ হাসিনার দিল্লির অনুষ্ঠান নিয়ে ভারতের কয়েকটি গণমাধ্যমেও সমালোচনা হয়েছে। ইংরেজি দৈনিক ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস গতকাল একটি সম্পাদকীয়তে বলেছে, ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক শেখ হাসিনাকে কেন্দ্র করে পরিচালিত হওয়া উচিত নয়। পত্রিকাটির ভাষ্য অনুযায়ী, ভারতে শেখ হাসিনা নিরাপদ আশ্রয় পেলেও সেই আশ্রয়কে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের মঞ্চে পরিণত করা সমস্যাজনক।
দিল্লি থেকে প্রচারিত বিবিসি বাংলার এক প্রতিবেদনে প্রশ্ন তোলা হয়েছে, শেখ হাসিনাকে ঘিরে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের দৃষ্টিভঙ্গিতে কোনো পরিবর্তন এসেছে কি না। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দুই দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক গতিতে ফিরতে না পারার অন্যতম কারণ শেখ হাসিনা নিজেও। ভারত সরকারের বিভিন্ন প্রস্তাব তিনি প্রত্যাখ্যান করায় দিল্লির বিরক্তির কারণ হয়ে উঠেছেন বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। একসময় ভারতের ‘পরীক্ষিত বন্ধু’ হিসেবে বিবেচিত শেখ হাসিনা এখন দিল্লির জন্য ‘অস্বস্তির বোঝা’ হয়ে উঠেছেন কি না, সে প্রশ্নও তোলা হয়েছে।
মার্কিন চিন্তন প্রতিষ্ঠান আটলান্টিক কাউন্সিলের দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক বিশ্লেষক মাইকেল কুগেলম্যান বলেন, ‘ভারত চাইলে এই সংবাদ সম্মেলন ঠেকাতে পারত। তাই বাংলাদেশ সম্ভবত এ ঘটনাকে ভারতের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক মিত্র শেখ হাসিনাকে আরেকবার প্রশ্রয় দেওয়ার উদাহরণ হিসেবেই দেখবে। এই সংবাদ সম্মেলনের ক্ষেত্রে ভারত মাঝামাঝি অবস্থান নেওয়ার চেষ্টা করেছে। কিন্তু আমার মনে হয় না, এই ব্যাখ্যা ঢাকার কাছে গ্রহণযোগ্য হবে।’
২০২৪ সালে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে শেখ হাসিনা দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন এবং মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত পলাতক আসামি। দেশে তাঁর দল আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
প্রায় দুই বছর ধরে দিল্লিতে অবস্থান করছেন শেখ হাসিনা। এ সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন অডিও বার্তা দেওয়ার পাশাপাশি ই-মেইলের মাধ্যমে গণমাধ্যমে সাক্ষাৎকারও দিয়েছেন তিনি। তবে দিল্লির কোনো অনুষ্ঠানে সরাসরি অনলাইনে যুক্ত হয়ে বক্তব্য দেওয়ার ঘটনা এবারই প্রথম।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সূত্রের বরাত দিয়ে জানা গেছে, দিল্লিতে বসে শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণা নতুন করে বিতর্ক তৈরি করেছে। বিশেষ করে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের সম্মতি ছাড়া তিনি রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তনের ঘোষণা দিতে পারছেন কি না, তা নিয়ে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে প্রশ্ন উঠেছে। সম্প্রতি সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে এ বিষয়ে বিরক্তির বহিঃপ্রকাশও ঘটেছে।
ভারতের ওপি জিন্দাল গ্লোবাল ইউনিভার্সিটির আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অধ্যাপক শ্রীরাধা দত্ত বলেন, ‘এমন একসময়ে এ ঘটনা ঘটেছে, যখন প্রায় দুই বছর ধরে টানাপোড়েনের পর বাংলাদেশ ও ভারত ধীরে ধীরে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার চেষ্টা করছে।’
তাঁর মতে, ঘটনাটি দুই দেশের সম্পর্কের জন্য দীর্ঘমেয়াদি ধাক্কা হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। ভারত ও বাংলাদেশ পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে লাভবান হতে পারে বলেও তিনি মনে করেন।
ঢাকা ও দিল্লির কূটনৈতিক সূত্রগুলোর ভাষ্য, ভারতে অবস্থান করে শেখ হাসিনা যেন বাংলাদেশবিরোধী রাজনৈতিক তৎপরতা চালাতে এবং বাংলাদেশে অস্থিতিশীলতা তৈরির অপপ্রয়াস করতে না পারেন, সে বিষয়ে ভারতকে একাধিকবার ব্যবস্থা নিতে বলেছে ঢাকা। ভারতের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে প্রত্যাশিত সাড়া না পাওয়ায় দুই দেশের মধ্যে আস্থার সংকট আরও গভীর হয়েছে বলে মনে করছেন কূটনীতিকেরা।
কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, শেখ হাসিনার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড যেন বাংলাদেশের গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত তারেক রহমান সরকারের সঙ্গে ভারতের সম্পর্কের ওপর নেতিবাচক প্রভাব না ফেলে, সে বিষয়ে নয়াদিল্লিকে সতর্ক থাকা প্রয়োজন।
আগামী ১২ সেপ্টেম্বর দিল্লিতে ১৮তম ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। সম্মেলনের আউটরিচ অধিবেশনে বিমসটেকের বর্তমান চেয়ারম্যান হিসেবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে আমন্ত্রণ জানিয়েছে ভারত। তবে ওই আয়োজনে তিনি অংশ নেবেন কি না, সে বিষয়ে এখনো সরকার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়নি।
বাংলাদেশের জন্য আমন্ত্রণটি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ আউটরিচ অধিবেশনে অংশ নেওয়ার পাশাপাশি ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে তারেক রহমানের প্রথম সরাসরি সাক্ষাতের সুযোগ তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিনপিং, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনসহ অন্যান্য দেশের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গেও তাঁর বৈঠকের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
তবে ঢাকার কূটনীতিকেরা মনে করছেন, গত বুধবার দিল্লিতে শেখ হাসিনার সাংবাদিকদের সঙ্গে সরাসরি মতবিনিময়ের ঘটনা ব্রিকসের ওই আয়োজনে বাংলাদেশের অংশগ্রহণকে আরও অনিশ্চিত করেছে। বিশেষ করে ভারতের মাটি থেকে শেখ হাসিনার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড ঠেকাতে দৃশ্যমান পদক্ষেপ না নেওয়ায় ঢাকার অসন্তোষ আরও বেড়েছে।
দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এর সম্পাদকীয়তে বলা হয়েছে, দুই দেশের সরকারের উচিত স্বল্পমেয়াদি রাজনৈতিক হিসাবের বাইরে গিয়ে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে এগিয়ে নেওয়া। শেখ হাসিনা ভারতে নিরাপদ ও সুরক্ষিত অতিথি হিসেবে থাকতে পারেন; কিন্তু ভারত-বাংলাদেশের সম্পর্ক এতটাই গুরুত্বপূর্ণ যে তা কোনো ব্যক্তি বা বিশেষ স্বার্থের কাছে জিম্মি হওয়া উচিত নয়।
মাইকেল কুগেলম্যানের মতে, শেখ হাসিনার সংবাদ সম্মেলন ঠেকানোর সুযোগ ভারতের ছিল। ফলে বাংলাদেশ ঘটনাটিকে তাঁর প্রতি ভারতের আরেক দফা রাজনৈতিক প্রশ্রয় হিসেবেই দেখবে বলে তিনি মনে করেন।
অধ্যাপক শ্রীরাধা দত্তের ভাষায়, প্রায় দুই বছরের টানাপোড়েনের পর দুই দেশ যখন ধীরে ধীরে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার চেষ্টা করছে, তখন এমন ঘটনা সেই প্রক্রিয়াকে জটিল করে তুলেছে। তবে তাঁর মতে, পারস্পরিক স্বার্থ ও সহযোগিতার বিষয়গুলো বিবেচনায় নিলে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ককে আবারও স্বাভাবিক পথে নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
