প্রতিষ্ঠার ১৮ বছর পর অবশেষে পূর্ণাঙ্গ টিচিং হাসপাতালের সুবিধা পাওয়ার পথে এগোচ্ছে কক্সবাজার মেডিকেল কলেজ (কমেক)। ৫০০ শয্যার হাসপাতাল ভবনের পাশাপাশি ইন্টার্ন চিকিৎসকদের আবাসন, নার্সিং ডরমিটরি, স্টাফ কোয়ার্টার, কলেজ ভবন ও মসজিদসহ মোট ২৬টি অবকাঠামোর নির্মাণকাজ একসঙ্গে এগিয়ে চলছে।
সংশ্লিষ্টদের আশা, এসব অবকাঠামো চালু হলে কক্সবাজারের প্রায় ২৮ লাখ বাসিন্দা, প্রায় ১২ লাখ বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গা এবং প্রতিবছর আসা বিপুলসংখ্যক পর্যটকের জন্য বিশেষায়িত চিকিৎসাসেবার সুযোগ বাড়বে। একই সঙ্গে মেডিকেল শিক্ষার্থীদের দীর্ঘদিনের ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ ও হাসপাতাল সংকটও অনেকটা দূর হবে।
২০০৮ সালে কক্সবাজার জেলা সদর হাসপাতালের একটি ভবনে অস্থায়ী ক্যাম্পাসের মাধ্যমে কক্সবাজার মেডিকেল কলেজের যাত্রা শুরু হয়। দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও নিজস্ব ৫০০ শয্যার টিচিং হাসপাতাল চালু হয়নি। ফলে শিক্ষার্থীদের ক্লিনিক্যাল প্রশিক্ষণের জন্য প্রায় ৮ কিলোমিটার দূরে জেলা সদর হাসপাতালে যেতে হচ্ছে।
তবে এবার সেই পরিস্থিতির পরিবর্তন হতে যাচ্ছে। হাসপাতাল ভবনসহ নতুন অবকাঠামোর নির্মাণকাজ দৃশ্যমানভাবে এগিয়ে চলছে। ইতোমধ্যে কয়েকটি ভবন বহুতল পর্যন্ত উঠেছে এবং হাসপাতাল ভবনের প্রথম তলার কাঠামোও দৃশ্যমান হয়েছে।
তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭ সালের ৬ মে কক্সবাজার মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়েছিল। কিন্তু আর্থিক সংকটসহ নানা জটিলতায় দীর্ঘদিন নির্মাণকাজ শুরু করা সম্ভব হয়নি।
পরবর্তী সময়ে শিক্ষার্থীদের দীর্ঘদিনের দাবি ও আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে হাসপাতাল ভবনসহ আরও ২৬টি স্থাপনা নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। এর অংশ হিসেবে বর্তমানে একাধিক ভবনের নির্মাণকাজ চলছে।
গত শুক্রবার নির্মাণাধীন মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল প্রকল্পে নতুন করে ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, ভিত্তিপ্রস্তরটি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদের নামে স্থাপন করা হয়েছে।
কক্সবাজার মেডিকেল কলেজ ২০০৮ সালে অস্থায়ী ব্যবস্থায় যাত্রা শুরু করলেও পরে স্থায়ী ক্যাম্পাসে স্থানান্তরিত হয়। এ পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটি ১৮টি ব্যাচ পার করেছে এবং ১৪টি এমবিবিএস ব্যাচ ইতোমধ্যে বের হয়েছে।
তবে শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়লেও দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষক, আবাসন ও হাসপাতাল সংকট রয়ে গেছে। নিজস্ব টিচিং হাসপাতাল না থাকায় তৃতীয় বর্ষ থেকে শিক্ষার্থীদের ক্লিনিক্যাল প্রশিক্ষণের জন্য জেলা সদর হাসপাতালে যেতে হয়।
শিক্ষার্থীদের হিসাবে, এই যাতায়াতের কারণে বছরে প্রায় ৫৯৮ ঘণ্টা সময় নষ্ট হচ্ছে। তাদের ভাষ্য, মেডিকেল শিক্ষার গুরুত্বপূর্ণ অংশ ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ হলেও স্বতন্ত্র হাসপাতাল না থাকায় সেই সুযোগ পর্যাপ্তভাবে পাওয়া যায়নি।
বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিলের (বিএমডিসি) নিয়ম অনুযায়ী, মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থীদের জন্য টিচিং হাসপাতাল থাকা গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু কক্সবাজার মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থীরা দীর্ঘ ১৮ বছরেও পূর্ণাঙ্গ হাসপাতালের সুবিধা পাননি।
কক্সবাজার জেলায় প্রায় ২৮ লাখ মানুষের বিপরীতে জেলা সদরে বর্তমানে রয়েছে ২৫০ শয্যার একটি হাসপাতাল। সেখানে প্রতিদিন হাজার হাজার রোগী চিকিৎসা নিতে আসেন। রোগীর চাপ বেশি হওয়ায় অনেক সময় অতিরিক্ত রোগীদের ফ্লোর, করিডোর কিংবা সিঁড়ির পাশেও অবস্থান করতে হয়।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে প্রায় ১২ লাখ বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর চিকিৎসার চাপ। ফলে হাসপাতালটির ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়েছে।
বিশেষায়িত চিকিৎসাসেবার ক্ষেত্রেও রয়েছে ঘাটতি। হেমাটোলজি, হেপাটোলজি, সাইকিয়াট্রি, নিউরোমেডিসিন, নিউরোসার্জারি ও এনআইসিইউসহ গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন বিভাগে পর্যাপ্ত সুবিধা নেই। বার্ন ইউনিটেরও ঘাটতি রয়েছে।
ফলে জটিল রোগীদের অনেক সময় চট্টগ্রাম কিংবা ঢাকায় পাঠাতে হয়। দূরত্ব ও ব্যয়ের কারণে নিম্নআয়ের অনেক রোগীর জন্য এই চিকিৎসা নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী ৫০০ শয্যার হাসপাতালটি চালু হলে কক্সবাজার মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থীরা নিজস্ব ক্যাম্পাসেই উন্নত ক্লিনিক্যাল প্রশিক্ষণের সুযোগ পাবেন। পাশাপাশি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, প্রশিক্ষিত নার্স ও অন্যান্য জনবলের নতুন পদ সৃষ্টির সুযোগ তৈরি হবে।
প্রকল্পের আওতায় চিকিৎসকদের কোয়ার্টার, ইন্টার্ন হোস্টেল, ডক্টরস ডরমিটরি, নার্স ডরমিটরি, অধ্যক্ষ ও পরিচালকের বাসভবন এবং স্টাফ কোয়ার্টার নির্মাণ করা হচ্ছে।
এ ছাড়া আধুনিক চিকিৎসা অবকাঠামো তৈরি হলে এমআরআই, সিটি স্ক্যান, এনজিওগ্রাম, ডায়ালাইসিস, আইসিইউ ও সিসিইউসহ বিভিন্ন বিশেষায়িত সেবা চালুর সুযোগ তৈরি হবে বলে সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন।
হাসপাতালের পাশাপাশি কক্সবাজার মেডিকেল কলেজে শিক্ষক সংকটও দীর্ঘদিনের। কলেজে অধ্যক্ষসহ বিভিন্ন পর্যায়ে মোট ৮৯টি শিক্ষক পদ থাকলেও অধ্যাপক, সহযোগী অধ্যাপক, সহকারী অধ্যাপক ও প্রভাষকের একাধিক পদ শূন্য রয়েছে।
অপর্যাপ্ত শিক্ষক নিয়েও কলেজটি একাডেমিক কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। এমনকি চট্টগ্রাম মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ফাইনাল প্রফেশনাল পরীক্ষায় পাসের হারে প্রতিষ্ঠানটি সাফল্যও দেখিয়েছে।
কলেজ কর্তৃপক্ষের মতে, পূর্ণাঙ্গ হাসপাতাল ও প্রয়োজনীয় শিক্ষক নিশ্চিত করা গেলে শিক্ষা, গবেষণা এবং উচ্চতর প্রশিক্ষণের সুযোগ আরও বাড়বে।
কমেকের সংক্রামক রোগ ও ট্রপিক্যাল মেডিসিন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. শাহজাহান নাজির বলেন, কক্সবাজারে বিশেষায়িত চিকিৎসাসেবার ঘাটতি দীর্ঘদিনের। স্থানীয় জনগোষ্ঠীর পাশাপাশি রোহিঙ্গাদের চিকিৎসার চাপ থাকায় জেলা সদর হাসপাতালে রোগীর সংখ্যা অনেক বেশি। ৫০০ শয্যার হাসপাতাল চালু হলে এই চাপ কমবে এবং রোগীদের চট্টগ্রাম বা ঢাকায় পাঠানোর প্রয়োজনও কমে আসবে।
কক্সবাজার উন্নয়ন আন্দোলনের সমন্বয়ক অ্যাডভোকেট ওয়াহিদ রুবেলের মতে, স্থানীয় বাসিন্দা, রোহিঙ্গা ও পর্যটক—সব মিলিয়ে কক্সবাজারে স্বাস্থ্যসেবার ওপর বড় চাপ রয়েছে। ২৫০ শয্যার জেলা সদর হাসপাতাল দিয়ে এই চাহিদা পূরণ করা কঠিন।
স্থানীয় সমাজকর্মী তারেক আরমানও মনে করেন, মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল চালু হলে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকা ও চট্টগ্রামমুখী রোগীর সংখ্যা কমবে। একই সঙ্গে জেলা সদর হাসপাতালের ওপর চাপও কমবে।
গণপূর্ত বিভাগ কক্সবাজারের তথ্য অনুযায়ী, ৫০০ শয্যার মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও আনুষঙ্গিক ভবন নির্মাণ প্রকল্পের আওতায় ১০ তলা হাসপাতাল ভবনের কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছে ২০২৫ সালের ২৯ জুন। হাসপাতাল ভবনের পাইলিংয়ের কাজ শেষ হয়েছে এবং বিভিন্ন ব্লকে দ্রুত নির্মাণকাজ এগিয়ে চলছে।
চুক্তি অনুযায়ী, হাসপাতাল ভবনের নির্মাণকাজ ২০২৮ সালের জুনে শেষ হওয়ার কথা। অন্যদিকে অন্যান্য ভবনের নির্মাণকাজ ২০২৭ সালের বিভিন্ন সময়ে শেষ করার লক্ষ্য রয়েছে।
দীর্ঘ ১৮ বছর ধরে অস্থায়ী টিচিং হাসপাতাল, শিক্ষক সংকট ও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার মধ্যে চলেছে কক্সবাজার মেডিকেল কলেজ। এখন ৫০০ শয্যার হাসপাতালসহ ২৬টি অবকাঠামোর নির্মাণকাজ এগিয়ে যাওয়ায় প্রতিষ্ঠানটির পূর্ণাঙ্গ রূপ পাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। হাসপাতালটি চালু হলে একদিকে মেডিকেল শিক্ষার্থীদের ব্যবহারিক প্রশিক্ষণের সুযোগ বাড়বে, অন্যদিকে কক্সবাজার অঞ্চলের সাধারণ মানুষ, রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী ও পর্যটকদের জন্য বিশেষায়িত চিকিৎসাসেবা পাওয়ার পথও সহজ হবে।
