দেশের চলমান বিদ্যুৎ, গ্যাস ও জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় সরকার সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেন, অতীতে নেওয়া কিছু অপরিকল্পিত সিদ্ধান্তের কারণে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতে যে সংকট তৈরি হয়েছে, তা থেকে দেশ ও জনগণকে বের করে আনতে সরকার পরিকল্পিতভাবে কাজ করছে।
শনিবার (৮ আগস্ট) জাতীয় সংসদের এলডি হলে ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ড্যাব) ৩৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত চিকিৎসক সমাবেশে দেওয়া বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন।
তারেক রহমান বলেন, বর্তমান সরকার একটি ভঙ্গুর অবস্থার মধ্যে দায়িত্ব নিয়েছে। নানা সংকট মোকাবিলায় ইতোমধ্যে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। গ্যাস, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট থেকে মানুষকে ধীরে ধীরে বের করে আনতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করা হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, রাষ্ট্র, রাজনীতি ও প্রশাসনে ফ্যাসিবাদের সুবিধাভোগী একটি চক্র এখনো সক্রিয়। তারা দেশের জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করছে এবং এ খাত নিয়ে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়াচ্ছে।
চিকিৎসকদের সমাবেশে স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়ন নিয়েও কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী। মার্কিন উদ্ভাবক টমাস আলভা এডিসনের একটি বক্তব্যের প্রসঙ্গ তুলে ধরে তিনি বলেন, রোগ হওয়ার পর চিকিৎসার চেয়ে রোগ প্রতিরোধে আগে থেকেই সচেতন হওয়া বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
‘প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধ উত্তম’ নীতিতে সরকার বিশ্বাস করে উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন।
তিনি জানান, সারা দেশে এক লাখ নতুন স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এসব স্বাস্থ্যকর্মী নাগরিকদের প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা, রোগ প্রতিরোধ ও স্বাস্থ্য সচেতনতা বিষয়ে কাজ করবেন। তাদের যথাযথ প্রশিক্ষণের ক্ষেত্রে চিকিৎসকদের নেতৃত্ব দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
চিকিৎসকদের পক্ষ থেকে উত্থাপিত বিভিন্ন দাবির বিষয়ে ইতিবাচকভাবে বিবেচনার আশ্বাস দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।
এসব প্রস্তাবের মধ্যে রয়েছে স্বল্পতম সময়ে বিশেষ বিসিএসের মাধ্যমে ৫ হাজার চিকিৎসক নিয়োগ, সরকারি চাকরিতে চিকিৎসকদের প্রবেশের বয়সসীমা ৩২ থেকে ৩৪ বছরে উন্নীত করা এবং অবসরের বয়স ৬১ থেকে ৬৫ বছরে বাড়ানো।
এ ছাড়া চিকিৎসক ও রোগী উভয়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে স্বাস্থ্যসেবা সুরক্ষা আইন প্রণয়ন, উপজেলা ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে কর্মরত চিকিৎসকদের জন্য বিশেষ ভাতা ও প্রণোদনা এবং বেসরকারি খাতে কর্মরত চিকিৎসকদের জন্য একটি ন্যায্য বেতন কাঠামো তৈরির প্রস্তাব রয়েছে।
রাজধানীর বাইরে বিশেষায়িত হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার ওপরও গুরুত্ব দেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি জানান, শিশু হাসপাতালসহ ঢাকার বাইরে বেশ কয়েকটি বিশেষায়িত হাসপাতাল নির্মাণের পরিকল্পনা ইতোমধ্যে বাস্তবায়নের পথে রয়েছে।
তারেক রহমান বলেন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও জ্বালানি খাতকে আরও স্বনির্ভর করতে সরকার বাস্তবমুখী পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। স্বাস্থ্য খাতে এবার দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বাজেট বরাদ্দ রাখা হয়েছে এবং আগামী পাঁচ বছরে এই বরাদ্দ জিডিপির ৫ শতাংশে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
এ ছাড়া দ্রুত ই-হেলথ কার্ড চালুর কাজ শুরু হয়েছে বলে জানান তিনি। দেশের প্রতিটি উপজেলা হাসপাতালকে ১০১ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতালে উন্নীত করার সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়েছে।
তবে শুধু হাসপাতাল, অবকাঠামো ও আধুনিক সরঞ্জাম দিয়ে স্বাস্থ্যসেবায় কাঙ্ক্ষিত সফলতা অর্জন সম্ভব নয় বলে মন্তব্য করেন প্রধানমন্ত্রী। চিকিৎসকদের আন্তরিকতা, দায়িত্বশীলতা ও মানবিক আচরণও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে তিনি উল্লেখ করেন।
চিকিৎসকদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দায়িত্ব পালনের সময় নানা সীমাবদ্ধতার মুখোমুখি হতে হলেও অনিচ্ছাকৃত অবহেলা বা দায়িত্বে শৈথিল্য জনমনে চিকিৎসকদের প্রতি আস্থার সংকট তৈরি করতে পারে।
তিনি বলেন, দেশের মানুষ চিকিৎসকদের কাছ থেকে আরও দায়িত্বশীল ও মানবিক ভূমিকা প্রত্যাশা করে। সরকার ও চিকিৎসকদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এমন একটি স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, যেখানে দেশের প্রতিটি মানুষ মানসম্মত চিকিৎসাসেবা পাবে এবং উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে যেতে হবে না।
সমাবেশের আগে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও তাঁর সহধর্মিণী জুবাইদা রহমান জাতীয় সংসদ ভবনের এলডি হল প্রাঙ্গণে নিম ও অর্জুনগাছের চারা রোপণ করেন। পরে জাতীয় ও দলীয় পতাকা উত্তোলন এবং বেলুন ও পায়রা উড়িয়ে সমাবেশের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়।
ড্যাবের সভাপতি অধ্যাপক হারুন আল রশীদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে স্থানীয় সরকারমন্ত্রী ও বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, জুবাইদা রহমান, সমাজকল্যাণমন্ত্রী অধ্যাপক এ জেড এম জাহিদ হোসেন, স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন এবং ড্যাবের মহাসচিব মো. জহিরুল ইসলাম শাকিলসহ অনেকে বক্তব্য দেন।
