বিএনপি সরকারের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে ধর্মীয় বিষয়ে ৯ দফা দাবি পেশ করেছে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ। এসব দাবির মধ্যে নতুন করে ‘হেযবুত তওহীদ’ সংগঠনকে নিষিদ্ধ করার দাবি এসেছে। পাশাপাশি দাওরায়ে হাদিসের মাস্টার্স সমমানের স্বীকৃতির কার্যকর বাস্তবায়ন এবং ২০১৩ সালের শাপলা চত্বর, ২০২১ সালের মোদি-বিরোধী আন্দোলন ও ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের হত্যাকাণ্ডের বিচারের দাবিও রাখা হয়েছে।
গত রোববার সরকারি সফরে চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারে যান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সফরের অংশ হিসেবে তিনি চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির আল জামিয়াতুল ইসলামিয়া আজিজুল উলুম বাবুনগর মাদ্রাসায় গিয়ে হেফাজতে ইসলামের আমির আল্লামা শাহ মহিবুল্লাহ বাবুনগরীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। পরে সংগঠনটির শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেন তিনি। ওই বৈঠকেই হেফাজতের পক্ষ থেকে ৯ দফা দাবি তুলে ধরা হয়।
হেফাজতের নতুন দাবিগুলোর অন্যতম হলো ‘হেযবুত তওহীদ’ নিষিদ্ধ করা। সংগঠনটির কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব আজিজুল হক ইসলামাবাদী বলেন, “হেযবুত তওহীদ ইসলামকে বিকৃত করছে, বিভিন্ন ফিতনা ছড়াচ্ছে। তাদের তৎপরতা দেশের জন্য হুমকিস্বরূপ। এ জন্য সংগঠনটি নিষিদ্ধ করার দাবি জানানো হয়েছে।”
হেফাজতের আগের দাবিগুলোর মধ্যে কাদিয়ানি সম্প্রদায়কে ‘অমুসলিম’ ঘোষণার বিষয়টি ধারাবাহিকভাবে ছিল। এবার এর সঙ্গে হেযবুত তওহীদ নিষিদ্ধের দাবিও যুক্ত হয়েছে।
এ ছাড়া দাওরায়ে হাদিসকে মাস্টার্সের সমমানের স্বীকৃতি কার্যকর করা, কওমি মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানো এবং সরকারি চাকরির বিজ্ঞপ্তিতে দাওরায়ে হাদিসের ডিগ্রিকে যোগ্যতা হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার দাবিও রয়েছে।
২০১৩ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ১৩ দফা দাবি তুলে দেশজুড়ে আলোচনায় এসেছিল হেফাজতে ইসলাম। সংগঠনটির বর্তমান ও অতীতের দাবিগুলো পর্যালোচনায় দেখা যায়, এবারের তালিকা থেকে আগের কয়েকটি দাবি বাদ পড়েছে, আবার নতুন কিছু বিষয় যুক্ত হয়েছে।
২০১১ সালে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতিমালার বিরোধিতার মধ্য দিয়ে হেফাজত প্রকাশ্য রাজনৈতিক আলোচনায় আসে। নীতিমালায় সম্পত্তি ও আয়ের ক্ষেত্রে নারী-পুরুষের সমানাধিকারের কথা থাকলেও সংগঠনটির নেতারা সেটিকে ইসলামি শরিয়াহ ও কোরআনের উত্তরাধিকার বিধানের পরিপন্থী বলে দাবি করেছিলেন। পরে ২০১৩ সালে শাহবাগের গণজাগরণ মঞ্চের আন্দোলন এবং ধর্ম অবমাননার অভিযোগকে কেন্দ্র করে সংগঠনটি রাজপথে সক্রিয় হয়। তখনই ১৩ দফা দাবি ঘোষণা করা হয়।
ওই ১৩ দফার প্রথম দাবিতে সংবিধানে ‘আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস’ পুনঃস্থাপন এবং কোরআন-সুন্নাহবিরোধী আইন বাতিলের কথা বলা হয়েছিল। দ্বিতীয় দাবিতে আল্লাহ, রাসুল (সা.) ও ইসলাম ধর্মের অবমাননা এবং মুসলমানদের বিরুদ্ধে কুৎসা রোধে মৃত্যুদণ্ডের বিধান রেখে আইন প্রণয়নের দাবি ছিল।
২০১৩ সালের ৫ মে হেফাজতের সবচেয়ে আলোচিত কর্মসূচি হয়। সেদিন ঢাকার ছয়টি প্রবেশপথে অবস্থান নেওয়ার পর বিভিন্ন কওমি মাদ্রাসা থেকে আসা নেতা-কর্মী ও শিক্ষার্থীরা মতিঝিলের শাপলা চত্বরে অবস্থান নেন। দিনভর বিভিন্ন স্থানে সংঘাত ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। রাতে পুলিশ, র্যাব ও বিজিবি সেখানে অভিযান চালায়। এতে গুলি, কাঁদানে গ্যাস ও সাউন্ড গ্রেনেড ব্যবহারের ঘটনা ঘটে এবং হতাহত হন অনেকে। পরবর্তী সময়ে হেফাজত শাপলা চত্বরে গণহত্যার অভিযোগ তোলে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ২০২৫ সালের ৩ মে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সমাবেশ করে হেফাজত। সেখান থেকে অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে ১২ দফা দাবি পেশ করা হয়। এর মধ্যে সংবিধানের মূলনীতিতে ‘আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস’ পুনঃস্থাপন, শাপলা চত্বর ও জুলাই গণহত্যার বিচারে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সক্ষমতা বাড়ানো এবং জাতীয় নির্বাচনের আগে শেখ হাসিনা ও তাঁর চিহ্নিত দোসরদের বিচার নিশ্চিত করার দাবি ছিল।
এবারের ৯ দফায় সংবিধানে ‘আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস’ পুনঃস্থাপনের দাবি রাখা হয়নি। এ বিষয়ে আজিজুল হক ইসলামাবাদী বলেন, বিএনপি তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে এ বিষয়টি সংযোজনের ঘোষণা দিয়েছে এবং সংসদে এ নিয়ে বিল পাস হয়েছে বলে হেফাজতের ধারণা; তাই আলাদা করে দাবিটি রাখার প্রয়োজন হয়নি।
তবে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, সংবিধান সংশোধনের কোনো বিল এখনো সংসদে তোলা হয়নি। এ-সংক্রান্ত বিশেষ কমিটি কাজ শুরু করেছে এবং বিরোধী দল এতে অংশ নিচ্ছে না।
এবারের দাবিতে ২০১৩ সালের ৫ মে শাপলা চত্বরের ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের বিচারের পাশাপাশি ২০২১ সালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বাংলাদেশ সফরকে কেন্দ্র করে সংঘটিত সহিংসতা এবং ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের আন্দোলনে হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি, নির্দেশদাতা ও হত্যাকারীদের বিচারের দাবি জানানো হয়েছে।
হেফাজতের নেতা আজিজুল হক ইসলামাবাদী বলেন, ট্রাইব্যুনালের সংখ্যা ইতিমধ্যে বাড়ানো হয়েছে এবং হেফাজতের মামলা ট্রাইব্যুনাল-২-এ রয়েছে। এ কারণে ট্রাইব্যুনালের সক্ষমতা বাড়ানোর পুরোনো দাবিটি এবার আলাদাভাবে উল্লেখ করা হয়নি।
হেফাজতের ৯ দফার চার নম্বর দাবিতে দাওরায়ে হাদিসের মাস্টার্স সমমানের স্বীকৃতি কার্যকর করার কথা বলা হয়েছে। সংগঠনটির দাবি, এর মাধ্যমে কওমি মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের দেশে ও বিদেশে উচ্চশিক্ষা এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়বে। একই সঙ্গে সরকারি চাকরির বিজ্ঞপ্তিতে সরকারি মাদ্রাসার ডিগ্রির পাশাপাশি কওমি মাদ্রাসার দাওরায়ে হাদিসকে স্নাতকোত্তর সমমানের শিক্ষাগত যোগ্যতা হিসেবে উল্লেখ করার দাবি জানানো হয়েছে।
২০১৭ সালে দাওরায়ে হাদিসের সনদকে স্নাতকোত্তরের সমমান দেওয়ার পরও এর বাস্তব প্রয়োগ কর্মসংস্থান ও উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে যথেষ্ট হয়নি বলে অভিযোগ হেফাজত নেতাদের। তাঁদের দাবি, গেজেট প্রকাশের পরও এ সনদধারীদের উচ্চতর ডিগ্রি অর্জনের সুযোগ নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। এ কারণেই দাবিটি নতুন করে তোলা হয়েছে।
২০১৩ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে হেফাজতে ইসলাম সরকারের কাছে নানা দাবি জানিয়ে এসেছে। এর মধ্যে প্রাথমিক থেকে উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে মুসলিম শিক্ষার্থীদের জন্য ইসলাম শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা, কাদিয়ানি সম্প্রদায়কে ‘অমুসলিম’ ঘোষণা, পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে দেশি-বিদেশি মিশনারিদের কথিত তৎপরতা বন্ধ, হেফাজত নেতাদের বিরুদ্ধে মামলা প্রত্যাহার এবং টঙ্গীর বিশ্ব ইজতেমায় ভারতের মাওলানা সাদ কান্ধলভী ও তাঁর অনুসারীদের অংশগ্রহণ বন্ধের দাবি উল্লেখযোগ্য।
আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ১৩ দফা এবং শাপলা চত্বরের কর্মসূচির মধ্য দিয়ে জাতীয় রাজনীতিতে প্রভাব তৈরি করে হেফাজত। পরে কওমি মাদ্রাসার স্বীকৃতি, ধর্মীয় শিক্ষা ও অন্যান্য দাবিকে কেন্দ্র করে সরকারের সঙ্গে সংগঠনটির টানাপোড়েন ও সমঝোতা—দুই-ই দেখা গেছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের কাছেও তারা ১২ দফা দাবি জানায়।
এবার বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে দাবির সংখ্যা ১৩ থেকে কমিয়ে ৯ করা হয়েছে। তবে দীর্ঘদিনের ধর্মীয় দাবিগুলোর বড় অংশই এতে বহাল রয়েছে। একই সঙ্গে বিচার, কওমি শিক্ষার স্বীকৃতির বাস্তবায়ন এবং সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ঘটনাবলির বিচারসংক্রান্ত বিষয়ও নতুন করে গুরুত্ব পেয়েছে।
