বাংলাদেশে বন্য হাতির অস্তিত্ব ক্রমেই সংকটাপন্ন হয়ে উঠছে। একদিকে বন উজাড়, আবাসস্থল ও প্রাচীন চলাচলের করিডর দখল হয়ে যাওয়ায় হাতির নিরাপদ বিচরণক্ষেত্র সংকুচিত হচ্ছে, অন্যদিকে খাদ্যসংকট ও মানুষের সঙ্গে সংঘাত বাড়ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট, বিষপ্রয়োগ, ট্রেনের ধাক্কা ও শিকারের মতো কারণে হাতির মৃত্যু। ২০১৭ থেকে ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত দেশে অন্তত ১৫২টি হাতির মৃত্যু হয়েছে।
আজ ১২ আগস্ট বিশ্ব হাতি দিবস। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, প্রতিবছর দিবসটি পালিত হলেও মহাবিপন্ন এই প্রাণী রক্ষায় কার্যকর উদ্যোগ এখনো পর্যাপ্ত নয়।
আন্তর্জাতিক প্রকৃতি সংরক্ষণ সংস্থার (আইইউসিএন) লাল তালিকায় হাতি বিপন্ন প্রজাতি। বাংলাদেশে এটি মহাবিপন্ন। বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশে হাতির সংখ্যা কমে যাওয়ার প্রধান কারণ আবাসস্থল ধ্বংস, চলাচলের করিডর দখল এবং মানুষ ও হাতির সংঘাত।
আইইউসিএন ২০১৩ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত মাঠপর্যায়ের জরিপ চালিয়ে বাংলাদেশে হাতির ১২টি চলাচলের করিডর চিহ্নিত করে। এর মধ্যে কক্সবাজার দক্ষিণ বন বিভাগের তিনটি, উত্তর বন বিভাগের পাঁচটি এবং চট্টগ্রাম দক্ষিণ বন বিভাগের চারটি করিডর রয়েছে। পরে সরকার গেজেটের মাধ্যমে এসব করিডর সংরক্ষণের আওতায় আনে।
তবে বন বিভাগ সূত্র বলছে, চট্টগ্রাম দক্ষিণ বন বিভাগের চুনতি-সাতগড় করিডর বর্তমানে অনেকটাই বন্ধ। রেললাইন নির্মাণের ফলে ওই পথে হাতির চলাচল কমেছে। এতে চুনতি ও বাঁশখালী এলাকার হাতির দল অনেকটা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে হাতির প্রজনন ও বংশবিস্তারে।
নির্ধারিত ১২টি করিডরের বাইরেও হাতির ঐতিহ্যগত চলাচলের অনেক পথ এখন বসতি, সড়ক, রেললাইন ও বিভিন্ন অবকাঠামোর কারণে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
বন অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বান্দরবান, রাঙামাটি ও খাগড়াছড়িতে বন্য হাতির প্রধান ও স্থায়ী আবাসস্থল রয়েছে। সীমান্তবর্তী শেরপুর, জামালপুর, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, সুনামগঞ্জ, কুড়িগ্রাম, নেত্রকোনা, সিলেট ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় মৌসুমি বা সাময়িকভাবে হাতির বিচরণ দেখা যায়।
অর্থাৎ দেশের অন্তত ১৪টি জেলায় হাতির বিচরণ রয়েছে। হাতি প্রশাসনিক সীমানা মেনে চলাচল করে না; প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে ব্যবহৃত আন্তঃসীমান্ত করিডর দিয়েই তারা এক এলাকা থেকে অন্য এলাকায় যায়। এসব পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় খাবার ও নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে হাতি লোকালয়ে প্রবেশ করছে।
বন গবেষকদের মতে, প্রাকৃতিক বন ধ্বংস করে সেখানে শাল, সেগুন, পাইন বা আকাশমণির মতো গাছের বাগান গড়ে তোলায় হাতির স্বাভাবিক খাদ্যের জোগান কমে গেছে।
একটি পূর্ণবয়স্ক হাতির দৈনিক প্রায় ২৫০ কেজি খাবার প্রয়োজন। বাঁশ, লতাপাতা ও বুনো ফলমূল সাধারণত তাদের প্রধান খাদ্য। প্রাকৃতিক বন সংকুচিত হওয়ায় পর্যাপ্ত খাবার না পেয়ে হাতির দল এখন ফসলের জমিতে ঢুকে পড়ছে।
বন অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ধান, কলা ও পেঁপের প্রতি হাতির বিশেষ আকর্ষণ রয়েছে। ফলে এসব ফসলের খেতে হাতি ঢোকার সময় মানুষের সঙ্গে সংঘাত তৈরি হচ্ছে।
বন্য হাতির মৃত্যুর ঘটনাও উদ্বেগজনক হারে ঘটছে। বিদ্যুতের তারে জড়িয়ে বা বৈদ্যুতিক বেড়ায় বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে, বিষপ্রয়োগে, ট্রেনের ধাক্কায় এবং ধারালো অস্ত্রের আঘাতে হাতি মারা যাওয়ার ঘটনা রয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে মাংসের জন্য হাতির অঙ্গ কেটে নেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে।
বন বিভাগের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত দেশে অন্তত ১৪৮টি হাতির মৃত্যু হয়েছে। চলতি বছর সিলেট, মৌলভীবাজার, বান্দরবান ও রাঙামাটিতে আরও চারটি হাতি মারা গেছে। এতে ২০১৭ থেকে ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত হাতির মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৫২।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব মৃত্যু শুধু বন্যপ্রাণী হত্যার ঘটনা নয়; দেশের জীববৈচিত্র্যের জন্যও তা বড় হুমকি। মানুষের দখলে আবাসস্থল চলে যাওয়া এবং চলাচলের পথ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়াকে হাতির মৃত্যুর অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে।
২০১৬ সালের আইইউসিএনের শুমারি অনুযায়ী, বাংলাদেশে ২৬৮টি আবাসিক বন্য হাতি ছিল। এ ছাড়া ৯৩টি আন্তঃসীমান্তীয় এবং ৯৬টি বন্দি হাতি ছিল। গত এক দশকে আবাসস্থল সংকুচিত হওয়া ও অস্বাভাবিক মৃত্যুর ঘটনা অব্যাহত থাকায় দেশে আবাসিক হাতির সংখ্যা ২০০-এর নিচে নেমে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেলপথ, বিভিন্ন অর্থনৈতিক অঞ্চল, সড়ক ও অন্যান্য অবকাঠামো নির্মাণ এবং উত্তর-পূর্ব সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া হাতির দীর্ঘদিনের চলাচলের পথকে বিভিন্নভাবে বাধাগ্রস্ত করেছে।
করিডর বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ায় হাতির দল পরিচিত পথ হারিয়ে লোকালয়ে ঢুকে পড়ছে। এতে ফসল ও মানুষের সম্পদের ক্ষতি হচ্ছে। একই সঙ্গে মানুষের আক্রমণে হাতিও মারা যাচ্ছে। আবার হাতির হামলায় মানুষের মৃত্যুর ঘটনাও ঘটছে। ফলে দুই পক্ষের সংঘাত আরও তীব্র হচ্ছে।
ফসলি জমি ও বসতবাড়ি রক্ষায় স্থানীয়ভাবে বৈদ্যুতিক বেড়া ব্যবহারের প্রবণতাও হাতির মৃত্যুর ঝুঁকি বাড়িয়েছে। এসব বেড়ায় বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে হাতি মারা যাওয়ার ঘটনা ঘটছে।
সম্প্রতি পার্বত্য চট্টগ্রামে মাংসের জন্য হাতি হত্যার ঘটনাও সামনে এসেছে। গত এপ্রিলে রাঙামাটির লংগদুতে একটি মৃত হাতির পায়ের অংশ ও শুঁড় কেটে নিয়ে যায় দুর্বৃত্তরা।
পার্বত্য চট্টগ্রাম উত্তর বন বিভাগের সাবেক বিভাগীয় বন কর্মকর্তা রেজাউল করিম চৌধুরী জানান, হাতিটিকে প্রায় তিন বছর আগে গুলি করা হয়েছিল। পরে মাংসের জন্য এর অঙ্গ কেটে নেওয়া হয়।
নিজের ফেসবুক পোস্টে তিনি জানান, লংগদুর ওই পুরুষ হাতিটি এলাকায় থাকা ১৪টি হাতির মধ্যে একমাত্র বড় ও প্রজননক্ষম পুরুষ হাতি ছিল। একটি গোষ্ঠীর হাতে হাতিটি কয়েকবার গুলিবিদ্ধও হয়েছিল।
বিশেষজ্ঞদের মতে, হাতি রক্ষায় শুধু বিশ্ব হাতি দিবস পালন যথেষ্ট নয়। তাদের আবাসস্থল ও করিডর দখলমুক্ত রাখা, প্রাকৃতিক বন পুনরুদ্ধার এবং আন্তঃসীমান্ত চলাচলের পথ নিরাপদ করার পাশাপাশি মানুষ ও হাতির সংঘাত কমাতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন।
বৈদ্যুতিক বেড়া ও বিষপ্রয়োগ বন্ধ করা, অবৈধ শিকার প্রতিরোধ এবং হাতি হত্যার ঘটনায় দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার ওপরও গুরুত্ব দিচ্ছেন তাঁরা।
নিরাপদ আবাসস্থল ও নির্বিঘ্ন চলাচলের সুযোগ নিশ্চিত করা না গেলে দেশের বন্য হাতির সংখ্যা আরও কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিশ্ব হাতি দিবসে তাই মূল চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে—দিবসটির আনুষ্ঠানিকতা পেরিয়ে দেশের মহাবিপন্ন বন্য হাতির জন্য বাস্তবেই কতটা নিরাপদ আবাসস্থল ও চলাচলের করিডর নিশ্চিত করা যায়।
