বাতাসে থাকা জলীয় অণুর ক্ষুদ্র বৈদ্যুতিক চার্জ কাজে লাগিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রযুক্তি নিয়ে বিশ্বজুড়ে গবেষণা চলছে। বিজ্ঞানীদের কয়েকটি দল ইতিমধ্যে এমন পরীক্ষামূলক যন্ত্র তৈরি করেছে, যেগুলো আর্দ্র বাতাস থেকে অল্প পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদনে সক্ষম হয়েছে। ‘হাইগ্রোইলেকট্রিসিটি’ নামে পরিচিত এই প্রযুক্তি ভবিষ্যতে ছোট সেন্সর ও ইলেকট্রনিক যন্ত্র চালানোর সম্ভাবনাময় উৎস হতে পারে বলে মনে করছেন গবেষকেরা।
বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাতাসের আর্দ্রতা থেকে বিদ্যুৎ আহরণের ধারণাটি নতুন নয়। বিখ্যাত পদার্থবিজ্ঞানী নিকোলা টেসলাও একসময় মেঘে বৈদ্যুতিক চার্জ সৃষ্টির প্রক্রিয়া অনুসরণ করে আর্দ্রতা থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাবনা নিয়ে আগ্রহী ছিলেন। তবে তাঁর জীবদ্দশায় এ ধারণা বাস্তবে রূপ পায়নি।
বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটস অ্যামহার্স্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের জুন ইয়াও ও তাঁর সহকর্মীরা এ বিষয়ে কাজ করছেন। প্রায় পাঁচ বছর আগে তাঁদের একটি পরীক্ষায় দেখা যায়, বাতাসের আর্দ্রতা শনাক্ত করতে সক্ষম একটি যন্ত্র বিদ্যুৎ উৎপন্ন করছে। ঘটনাটি ঘটে যখন এক শিক্ষার্থী পরীক্ষামূলক যন্ত্রটি বৈদ্যুতিক সংযোগে যুক্ত করতে ভুলে যান। সেখান থেকেই গবেষকদের নতুন করে বিষয়টি নিয়ে কাজ শুরু হয়।
বিজ্ঞানীদের ধারণা, বাতাসে ভাসমান পানির অণুর মধ্যে অতি ক্ষুদ্র মাত্রায় বৈদ্যুতিক চার্জের আদান-প্রদান ঘটে। উপযুক্ত কাঠামোর মাধ্যমে সেই চার্জের পার্থক্যকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারলেই বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব।
ইয়াও ও তাঁর সহকর্মীরা ২০২০ সালে প্রকাশিত এক গবেষণায় ব্যাকটেরিয়া থেকে তৈরি অতিক্ষুদ্র প্রোটিনের তার ব্যবহার করে বাতাস থেকে বিদ্যুৎ আহরণের পদ্ধতি তুলে ধরেন। ধারণা করা হয়, ওই উপাদানের ক্ষুদ্র ছিদ্র পানির অণু আটকে রাখতে পারে। এর ফলে পানির অণুর সঙ্গে উপাদানের পারস্পরিক ক্রিয়ায় বৈদ্যুতিক চার্জ তৈরি হয় এবং একসময় দুই স্তরের মধ্যে চার্জের পার্থক্য গড়ে ওঠে।
ইয়াও এ প্রক্রিয়ার সঙ্গে বজ্রপাতের তুলনা করেছেন। ঝড়ের মেঘে বিপরীতধর্মী বৈদ্যুতিক চার্জ জমে একপর্যায়ে তা বজ্রপাত হিসেবে নির্গত হয়। গবেষকদের লক্ষ্য হলো পানির অণুর চলাচল ও চার্জের পার্থক্য তৈরির প্রক্রিয়াকে নিয়ন্ত্রিতভাবে কাজে লাগানো।
২০২৩ সালের মে মাসে ইয়াওয়ের দল আরেকটি গবেষণা প্রকাশ করে। এবার তারা অতি ক্ষুদ্র ছিদ্রযুক্ত একটি কাঠামো তৈরি করেন, যেখানে গ্রাফিন অক্সাইড, পলিমার এবং কাঠ থেকে পাওয়া সেলুলোজ ন্যানোফাইবার ব্যবহার করা হয়।
পরীক্ষায় দেখা যায়, উপাদান ভিন্ন হলেও প্রতিটি কাঠামোতেই বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা রয়েছে। এতে গবেষকদের ধারণা হয়, নির্দিষ্ট কোনো একটি উপাদানের চেয়ে কাঠামোর বৈশিষ্ট্যই সম্ভবত বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
তবে পরীক্ষামূলক যন্ত্রটি ছিল মানুষের একটি চুলের চেয়েও সরু এবং উৎপাদিত বিদ্যুতের পরিমাণ ছিল অত্যন্ত কম—এক ভোল্টের ক্ষুদ্র একটি অংশ। ইয়াওয়ের মতে, প্রযুক্তিটি বড় পরিসরে প্রয়োগ করা গেলে কয়েক ভোল্ট পর্যন্ত বিদ্যুৎ পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
তবে এর অর্থ এই নয় যে ভবিষ্যতে বাড়ি বা গাড়ির মতো বড় স্থাপনা চালানোর মতো বিদ্যুৎ পাওয়া যাবে। লন্ডনের ইম্পেরিয়াল কলেজের প্রকৌশলী রেশমা রাও, যিনি ওই গবেষণায় যুক্ত ছিলেন না, মনে করেন প্রযুক্তিটি মূলত সেন্সর বা ছোট ইলেকট্রনিক যন্ত্রে ব্যবহারের সম্ভাবনা রাখে।
যুক্তরাষ্ট্রের গবেষকদের পাশাপাশি বিশ্বের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানও আর্দ্র বাতাস থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের পদ্ধতি নিয়ে কাজ করছে। ইসরায়েলের একটি গবেষক দল ২০২০ সালে দুটি ধাতব অংশের মধ্য দিয়ে আর্দ্র বাতাস প্রবাহিত করে বিদ্যুৎ উৎপাদনের একটি পদ্ধতি তৈরি করে। বাতাস ধাতুর ওপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ার সময় বৈদ্যুতিক চার্জ সৃষ্টি হয়।
ওই গবেষণার সহলেখক কলিন প্রাইস জানান, তাঁদের পরীক্ষায় উৎপাদিত বিদ্যুতের পরিমাণ খুবই কম। পদ্ধতিটি উন্নত করার কাজ চলছে। তবে এ প্রযুক্তির জন্য প্রায় ৬০ শতাংশ আপেক্ষিক আর্দ্রতার বাতাস প্রয়োজন। অন্যদিকে ইয়াওয়ের দল প্রায় ২০ শতাংশ আর্দ্রতার বাতাসেও বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে সক্ষম হয়েছে।
পর্তুগালের একটি গবেষক দলও একই লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের ‘ক্যাচার’ প্রকল্পের অর্থায়নে তারা একটি প্রোটোটাইপ তৈরি করছে। লিসবন বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানী সভিৎলানা ল্যুবচিক ও তাঁর ছেলে আন্দ্রিই এ উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত।
তাঁদের তৈরি যন্ত্রে ১.৬ ইঞ্চি ব্যাসের জিরকোনিয়াম অক্সাইডের একটি চাকতি ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে। এটি আর্দ্র বাতাস থেকে পানির অণু আটকে একটি ক্ষুদ্র চ্যানেলের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত করবে। গবেষকদের দাবি, এতে প্রায় দেড় ভোল্ট বিদ্যুৎ উৎপন্ন হতে পারে এবং দুটি চাকতি ব্যবহার করে একটি এলইডি বাতি জ্বালানো সম্ভব। তবে এ প্রক্রিয়ার বিস্তারিত এখনো প্রকাশ করা হয়নি এবং অন্য বিজ্ঞানীদের মাধ্যমে এর স্বাধীন যাচাইও হয়নি।
আর্দ্রতা থেকে বৈদ্যুতিক চার্জ তৈরির বিষয়টি নতুন কোনো পর্যবেক্ষণ নয়। ১৮৪০ সালে ব্রিটেনের নিউক্যাসলের একটি কয়লাখনিতে এ ধরনের ঘটনার প্রথম দিকের একটি নজির পাওয়া যায়।
একটি স্টিম ইঞ্জিনের চালক তাঁর হাতে অস্বাভাবিক শিরশিরে অনুভূতি পাওয়ার পর লক্ষ্য করেন, তাঁর আঙুল ও ইঞ্জিনের লিভারের মধ্যে ক্ষুদ্র বৈদ্যুতিক স্ফুলিঙ্গ তৈরি হচ্ছে। পরে বিজ্ঞানীরা ধারণা করেন, বয়লারের ধাতব অংশের সংস্পর্শে আসা বাষ্পের কারণে বৈদ্যুতিক চার্জ তৈরি হয়েছিল।
হাইগ্রোইলেকট্রিসিটি নিয়ে গবেষণায় অগ্রগতি হলেও প্রযুক্তিটি এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। এর কার্যপ্রক্রিয়ার মৌলিক বৈজ্ঞানিক বিষয়গুলো আরও ভালোভাবে বোঝার প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করেন রেশমা রাও।
এ ছাড়া বাণিজ্যিকভাবে সফল হতে হলে পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ উৎপাদনের পাশাপাশি উৎপাদন খরচও প্রতিযোগিতামূলক পর্যায়ে আনতে হবে। কানাডার ম্যাকগিল বিশ্ববিদ্যালয়ের সারাহ জর্ডনের মতে, সৌর ও বায়ুশক্তির মতো প্রতিষ্ঠিত নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রযুক্তির সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে হলে হাইগ্রোইলেকট্রিক প্রযুক্তিকে একই সঙ্গে কার্যকর ও ব্যয়সাশ্রয়ী হতে হবে।
তবু গবেষকদের কাছে আর্দ্র বাতাস থেকে বিদ্যুৎ আহরণের সম্ভাবনা গুরুত্বপূর্ণ। কারণ সফলভাবে প্রযুক্তিটি উন্নত করা গেলে দিনের আলো, বাতাসের গতি কিংবা নির্দিষ্ট কোনো স্থানের ওপর নির্ভর না করেও ক্ষুদ্র ইলেকট্রনিক যন্ত্রের জন্য একটি বিকল্প শক্তির উৎস তৈরি হতে পারে।
