শ্বেতী বা ভিটিলিগো ত্বকের একটি দীর্ঘমেয়াদি রোগ, যাতে শরীরের বিভিন্ন অংশে স্বাভাবিক রঙের বদলে সাদা বা ফ্যাকাশে দাগ দেখা দেয়। প্রচলিত ধারণার বিপরীতে, এটি কোনো ছোঁয়াচে রোগ নয়। রোগটি কেন হয়, তার সুনির্দিষ্ট কারণ এখনো পুরোপুরি জানা না গেলেও রোগ প্রতিরোধব্যবস্থার অস্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া, জিনগত পরিবর্তনসহ বিভিন্ন বিষয় এর সঙ্গে সম্পর্কিত বলে মনে করা হয়।
কেন ত্বকে সাদা দাগ হয়
ত্বকের রং তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে মেলানিন নামের রঞ্জক পদার্থ। এটি তৈরি করে মেলানোসাইট নামের কোষ। শ্বেতীর ক্ষেত্রে আক্রান্ত স্থানের মেলানোসাইট নষ্ট হয়ে গেলে সেখানে মেলানিন উৎপাদন কমে বা বন্ধ হয়ে যায়। ফলে ত্বকের ওই অংশ সাদা হয়ে যায়।
ক্লিভল্যান্ড ক্লিনিকের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের মোট জনসংখ্যার প্রায় ১ শতাংশ শ্বেতীতে আক্রান্ত। বিশ্বে ৮০০ কোটির বেশি মানুষ থাকায় রোগীর সংখ্যা ৮ কোটির বেশি হতে পারে।
প্রতি বছর ২৫ জুন বিশ্বজুড়ে বিশ্ব ভিটিলিগো দিবস পালিত হয়। এই তারিখটি বেছে নেওয়ার সঙ্গে মার্কিন সংগীতশিল্পী মাইকেল জ্যাকসনের মৃত্যুর তারিখের সম্পর্ক রয়েছে। তিনি ২০০৯ সালের ২৫ জুন মারা যান এবং জীবনের শেষদিকে শ্বেতী রোগে আক্রান্ত ছিলেন।
শ্বেতী রোগের কারণ কী
শ্বেতীর সঠিক কারণ এখনো নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি। তবে কয়েকটি বিষয়কে সম্ভাব্য কারণ বা ঝুঁকি হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
এর মধ্যে অন্যতম হলো অটোইমিউন প্রতিক্রিয়া। এ ক্ষেত্রে শরীরের রোগ প্রতিরোধব্যবস্থা ভুল করে নিজের মেলানোসাইট কোষকে ক্ষতিকর হিসেবে চিহ্নিত করে সেগুলো ধ্বংস করতে পারে।
এ ছাড়া জিনগত পরিবর্তনও রোগটির ঝুঁকি বাড়াতে পারে। ক্লিভল্যান্ড ক্লিনিকের তথ্য অনুযায়ী, ৩০টির বেশি জিন ভিটিলিগোর ঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত।
দীর্ঘস্থায়ী মানসিক বা শারীরিক চাপ, বিশেষ করে কোনো শারীরিক আঘাতের পর অতিরিক্ত মানসিক চাপ, অতিবেগুনি রশ্মির প্রভাব এবং কিছু বিষাক্ত রাসায়নিকের সংস্পর্শও মেলানোসাইটের কার্যক্রমে প্রভাব ফেলতে পারে।
বংশগত কারণেরও ভূমিকা রয়েছে। প্রায় ৩০ শতাংশ রোগীর ক্ষেত্রে পারিবারিক ইতিহাস পাওয়া যায় বলে ক্লিভল্যান্ড ক্লিনিক জানিয়েছে।
তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—শ্বেতী কোনো সংক্রামক বা ছোঁয়াচে রোগ নয়। যুক্তরাজ্যের জাতীয় স্বাস্থ্যসেবা সংস্থা এনএইচএস এবং ক্লিভল্যান্ড ক্লিনিক—উভয় প্রতিষ্ঠানই এ বিষয়ে একই তথ্য দিয়েছে।
কারা বেশি ঝুঁকিতে
শ্বেতী যেকোনো বয়স, লিঙ্গ বা বর্ণের মানুষের হতে পারে। তবে গাঢ় ত্বকের মানুষের ক্ষেত্রে সাদা দাগ তুলনামূলকভাবে বেশি স্পষ্ট দেখা যায়। অনেকের ক্ষেত্রে ৩০ বছর বয়সের আগেই লক্ষণ প্রকাশ পায়।
অটোইমিউন রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের মধ্যে শ্বেতীর ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি হতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে অ্যাডিসনস ডিজিজ, রক্তশূন্যতা, টাইপ-১ ডায়াবেটিস, রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস ও থাইরয়েড-সংক্রান্ত রোগ।
এ ছাড়া সন্তান জন্মের পর হরমোনের পরিবর্তন, লিভার বা কিডনির সমস্যা এবং মেলানোমার মতো ত্বকের ক্যানসারের সঙ্গেও শ্বেতীর ঝুঁকির সম্পর্ক থাকতে পারে বলে এনএইচএসের তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে।
কী কী লক্ষণ দেখা যায়
শরীরের যেকোনো অংশে শ্বেতীর দাগ হতে পারে। তবে ঠোঁট, চোখের আশপাশ, আঙুল, কবজি, পায়ের পাতা, বগল, যৌনাঙ্গ, নিতম্ব, মুখের ভেতর এবং নাকের দুই পাশে এটি বেশি দেখা যেতে পারে।
মাথার চুল, দাড়ি বা ভ্রুতেও আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। শুরুতে ত্বকে ফ্যাকাশে দাগ দেখা দিতে পারে, যা পরে ধীরে ধীরে সাদা হয়ে যায়।
কারও ক্ষেত্রে কয়েকটি ছোট দাগের মধ্যেই রোগ সীমাবদ্ধ থাকে। আবার কারও শরীরের বড় অংশে বা প্রায় সারা শরীরেও দাগ ছড়িয়ে পড়তে পারে। আক্রান্ত স্থানের চুলও সাদা বা রুপালি হয়ে যেতে পারে।
শ্বেতীর দাগ সাধারণত ত্বক শুষ্ক করে না। তবে কোনো কোনো ক্ষেত্রে আক্রান্ত স্থানে চুলকানি হতে পারে।
তবে ত্বকে সাদা দাগ দেখা দিলেই সেটিকে শ্বেতী বলা যাবে না। অন্য কিছু রোগের কারণেও ত্বকে বিবর্ণতা দেখা দিতে পারে। তাই এমন পরিবর্তন দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
শ্বেতী কি পুরোপুরি ভালো হয়?
শ্বেতীর চিকিৎসা সব ক্ষেত্রে অপরিহার্য নয়। তবে দাগ ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়লে বা রোগীর মানসিক অস্বস্তি তৈরি হলে চিকিৎসা নেওয়া যেতে পারে।
এনএইচএসের তথ্য অনুযায়ী, শ্বেতীর সাদা দাগ সাধারণত স্থায়ী হয়। অর্থাৎ রোগটি পুরোপুরি সারিয়ে তোলার নিশ্চিত কোনো চিকিৎসা নেই। তবে দাগের দৃশ্যমানতা কমানোর জন্য বিভিন্ন চিকিৎসা পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়।
চিকিৎসক প্রয়োজন অনুযায়ী স্টেরয়েড ক্রিম দিতে পারেন। দীর্ঘদিন ব্যবহারে এ ধরনের ক্রিমের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হিসেবে ত্বক পাতলা হওয়া বা স্ট্রেচ মার্ক দেখা দিতে পারে।
স্টেরয়েডে কাঙ্ক্ষিত ফল না এলে লাইট থেরাপি বা ফটোথেরাপি ব্যবহার করা হতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমেও চিকিৎসা দেওয়া হয়।
চিকিৎসার মাধ্যমে ত্বকের রং সাময়িকভাবে ফিরে আসতে পারে। তবে সেই ফল সবসময় স্থায়ী হয় না এবং চিকিৎসা রোগটির বিস্তার পুরোপুরি বন্ধ করতে পারে—এমন নিশ্চয়তাও নেই।
ঝুঁকি কমাতে কী করবেন
শ্বেতী প্রতিরোধের নিশ্চিত কোনো উপায় না থাকলেও ত্বকের যত্ন ও সামগ্রিক স্বাস্থ্যের বিষয়ে সচেতন থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়। এর মধ্যে রয়েছে নিরাপদভাবে সূর্যের আলো এড়িয়ে বা মোকাবিলা করা, নিয়মিত ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার, মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং কোনো অটোইমিউন রোগ থাকলে তার যথাযথ চিকিৎসা নেওয়া।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, শ্বেতী রোগীকে এড়িয়ে চলার কোনো বৈজ্ঞানিক কারণ নেই। এটি ছোঁয়াচে নয় এবং আক্রান্ত ব্যক্তির সঙ্গে স্বাভাবিক সামাজিক যোগাযোগে রোগটি অন্যের মধ্যে ছড়ায় না।
