কক্সবাজারের টেকনাফের সেন্ট মার্টিন দ্বীপে ছয় মাস ধরে পর্যটকের আনাগোনা সীমিত থাকায় পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যে দৃশ্যমান পরিবর্তন এসেছে। সৈকতে বেড়েছে গাঙচিল, লাল কাঁকড়া, শামুক-ঝিনুক ও কাছিমের বিচরণ; কেয়াবনেও ফিরেছে প্রাণচাঞ্চল্য। তবে পর্যটননির্ভর অন্তত ৫ হাজার মানুষ আয়-রোজগার হারিয়ে সংকটে পড়েছেন। এর সঙ্গে মাছের সংকট, সমুদ্রভাঙন, লবণাক্ততা ও সুপেয় পানির অভাব তাঁদের জীবনকে আরও কঠিন করে তুলেছে।
সম্প্রতি প্রশাসনের অনুমতি নিয়ে দ্বীপটিতে গিয়ে দেখা যায়, পর্যটকদের পরিচিত কোলাহল নেই। জাহাজঘাটেও নেই আগের ভিড়। সৈকতে শুধু সাগরের ঢেউয়ের শব্দ। বর্ষাকালে মৌসুমি বায়ুর প্রভাব এবং পর্যটক চলাচলে নিষেধাজ্ঞার কারণে দ্বীপবাসীর বাইরের সঙ্গে যোগাযোগও সীমিত হয়ে পড়েছে।
দ্বীপের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, গত আড়াই বছরে সরকারের নানা বিধিনিষেধ ও পর্যটকসংখ্যা কমিয়ে দেওয়ার ফলে প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্যে পরিবর্তন এসেছে। কেয়াবনে ফল-ফুল দেখা যাচ্ছে। সৈকতে বেড়েছে গাঙচিলের আনাগোনা। বালুচরে লাল কাঁকড়া, শামুক ও ঝিনুকের বিচরণও চোখে পড়ছে। কাছিমের ডিম থেকে বাচ্চা ফোটানোর হ্যাচারিতেও চলছে কার্যক্রম।
সেন্ট মার্টিন ইউনিয়নের ৯টি ওয়ার্ডে লোকসংখ্যা ১০ হাজার ৭০০। তাঁদের মধ্যে ৫ হাজারের বেশি মানুষ জেলে, কৃষক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, দোকানদার ও অন্যান্য খেটে খাওয়া পেশার সঙ্গে যুক্ত। দ্বীপের প্রায় দেড় হাজার পরিবারের অর্ধেকই ঝুপড়ি ঘরে বসবাস করে।
৮ ও ৯ আগস্ট দ্বীপের ১২টি গ্রামের ১২০ জন মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তাঁরা পরিবেশ রক্ষায় সরকারি পদক্ষেপকে সমর্থন করলেও জীবিকার সংকট নিয়ে অসন্তুষ্ট। পর্যটন মৌসুমে বাড়তি আয়ের সুযোগ বন্ধ হয়েছে। একই সময়ে বৈরী আবহাওয়ার কারণে অনেক জেলেও নিয়মিত সাগরে যেতে পারছেন না।
স্থানীয় জেলে আবদুল শুক্কুর জানান, ৩২ বছর ধরে মাছ ধরে সংসার চালালেও পর্যটক চলাচল সীমিত হওয়ার পর বিকল্প আয়ের সুযোগ কমে গেছে। একসময় প্রায় পাঁচ মাস পর্যটক থাকতেন এবং সারা বছর ট্রলারে পর্যটকেরা দ্বীপে আসতেন। তখন দোকানদারি বা ভ্যান চালিয়েও আয় করা যেত।
৫৪ বছর বয়সী এই জেলে বলেন, গত তিন মাসে সাগরে তেমন মাছ পাওয়া যাচ্ছে না। সাগর উত্তাল থাকায় গভীর সমুদ্রেও যেতে পারছেন না। মাছ পাওয়া গেলেও স্থানীয় বাজারে ক্রেতার সংকট থাকে এবং আবহাওয়া খারাপ হলে মাছ টেকনাফে পাঠানোও সম্ভব হয় না। আট সদস্যের সংসার চালাতে গিয়ে তিনি বিপাকে পড়েছেন।
সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর সেন্ট মার্টিনে পর্যটকের যাতায়াত সীমিত করা হয়। ১ ডিসেম্বর থেকে ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত তিন মাস অনলাইন নিবন্ধনের মাধ্যমে প্রতিদিন সর্বোচ্চ ২ হাজার পর্যটক দ্বীপে যেতে পারেন। জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি—এই দুই মাস পর্যটকেরা সেখানে রাত কাটাতে পারেন। তবে নভেম্বর মাসে রাতযাপনের অনুমতি নেই; সেদিন গিয়ে সেদিনই কক্সবাজারে ফিরতে হয়।
এই ব্যবস্থায় গত দুই মৌসুমে ছয় মাসে ২ লাখ ৩৭ হাজার পর্যটক সেন্ট মার্টিন ভ্রমণ করেছেন। অথচ তিন বছর আগেও পাঁচ মাসের দীর্ঘ পর্যটন মৌসুমে ১০ থেকে ১৫ লাখ মানুষ দ্বীপটিতে যেতেন।
পরিবেশসংশ্লিষ্ট সংগঠন, নাগরিক সমাজ ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, পর্যটক কমে যাওয়ায় দ্বীপের অন্তত ৫ হাজার মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়েছেন। বছরের বাকি ৯ মাস ২৩০টির বেশি হোটেল, রিসোর্ট ও কটেজ বন্ধ থাকায় প্রায় ৩ হাজার মানুষ চাকরি হারিয়েছেন। এ ছাড়া ৪ শতাধিক ইজিবাইক, ৩ শতাধিক মোটরসাইকেল ও আড়াই শতাধিক বাইসাইকেল ভাড়া দিয়ে অন্তত ১ হাজার পরিবারের সংসার চলত। পর্যটক না থাকায় এসব পরিবারও আর্থিক সংকটে পড়েছে।
স্থানীয় ব্যবসায়ী নুর মোহাম্মদ বলেন, আগে তাঁর দোকানে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত পর্যটকদের ভিড় থাকত। কয়েক মাস ধরে দোকান বন্ধ থাকায় পরিবার চালাতে তাঁকে হিমশিম খেতে হচ্ছে।
পরিবেশ অধিদপ্তর চট্টগ্রাম অঞ্চলের পরিচালক মো. জমির উদ্দিন বলেন, সেন্ট মার্টিনে পানীয় জলের সংকট দূর করা, বেওয়ারিশ কুকুরের প্রজনন নিয়ন্ত্রণে বন্ধ্যত্বকরণ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, বর্জ্য থেকে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ উৎপাদন, বনায়ন এবং জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণসহ শত কোটি টাকার একাধিক প্রকল্পের কাজ চলছে। আগামী নভেম্বরের আগে এসব প্রকল্পের কাজ শেষ হলে দ্বীপবাসীর সংকট কমবে বলে তিনি আশা করেন।
৮ আগস্ট পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম সেন্ট মার্টিন পরিদর্শন করেন। এ সময় স্থানীয় বাসিন্দারা তাঁদের দুর্দশার কথা তাঁর কাছে তুলে ধরেন। সেন্ট মার্টিন ইউপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ফয়েজুল ইসলামও নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত চার মাস পর্যটকদের রাতযাপনের সুযোগ দেওয়ার দাবি জানান।
এ বিষয়ে শেখ ফরিদুল ইসলাম বলেন, অন্তত তিন মাস পর্যটকদের রাতযাপনের সুযোগ দেওয়ার বিষয়ে তিনি সিদ্ধান্ত জানাবেন।
১৯৯৯ সালে সেন্ট মার্টিনকে ‘প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা’ (ইসিএ) ঘোষণা করে পরিবেশ অধিদপ্তর। পরে ২০২৩ সালের জানুয়ারি মাসে বন্য প্রাণী সংরক্ষণ আইন অনুযায়ী সেন্ট মার্টিন সংলগ্ন বঙ্গোপসাগরের ১ হাজার ৭৪৩ বর্গকিলোমিটার এলাকাকে সংরক্ষিত এলাকা ঘোষণা করা হয়।
পরিবেশ অধিদপ্তর ও গবেষকদের তথ্য অনুযায়ী, অনিয়ন্ত্রিত অবকাঠামো নির্মাণ, বিপুল পর্যটকের উপস্থিতি এবং প্লাস্টিক দূষণের কারণে দ্বীপের পরিবেশ একসময় মারাত্মক হুমকির মুখে পড়ে। একসময় এখানে প্রবাল, শৈবাল, সামুদ্রিক কাছিম, শামুক-ঝিনুক, বিভিন্ন প্রজাতির সামুদ্রিক মাছ, পরিযায়ী ও স্থানীয় পাখি, স্তন্যপায়ী প্রাণী এবং কাঁকড়াসহ প্রায় ১ হাজার ৭৬ প্রজাতির জীববৈচিত্র্য ছিল। গত দুই দশকে এসবের অনেক কিছুই বিলুপ্ত হয়েছে।
পরিবেশ রক্ষায় বর্তমানে সৈকতে রাতে আলো জ্বালানো, শব্দদূষণ, বারবিকিউ পার্টি এবং শামুক-ঝিনুক ও প্রবাল সংগ্রহসহ বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। একই সঙ্গে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে ১২টি নির্দেশনা।
এসব পদক্ষেপের ফলে সৈকতে রাজ কাঁকড়া, শামুক-ঝিনুক ও শৈবালের বিস্তার বেড়েছে। কেয়াবন ও পাথরের স্তূপে বিভিন্ন প্রজাতির পাখির আনাগোনাও বাড়ছে। স্থানীয়দের মতে, পর্যটকের চাপ কমায় দূষণও নিয়ন্ত্রণে এসেছে।
সেন্ট মার্টিনের পরিবেশ পুনরুদ্ধারে কাজ করছে ‘ইয়ুথ এনভায়রনমেন্ট সোসাইটি’। সংস্থাটির নির্বাহী কর্মকর্তা ইব্রাহিম খলিল মামুন বলেন, পর্যটক কমে যাওয়ায় মা কাছিমের ডিম পাড়ার পরিবেশ ফিরে এসেছে। প্রথম বছরে ৩ হাজার এবং দ্বিতীয় বছরে ৭ হাজারের বেশি কাছিমের ডিম সংগ্রহ করে হ্যাচারিতে বাচ্চা উৎপাদনের পর সাগরে অবমুক্ত করা হয়েছে।
তিনি জানান, আগে বেওয়ারিশ কুকুর কাছিমের ডিম খেয়ে ফেলত। বর্তমানে একটি বেসরকারি সংস্থা অভুক্ত প্রায় ৩ হাজার কুকুরকে দিনে একবেলা খাবার দিচ্ছে। এতে কাছিমের ডিম সুরক্ষিত থাকছে।
‘সেন্ট মার্টিনের দ্বীপের জীববৈচিত্র্য ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় অভিযোজন প্রকল্প’-এর আওতায় ৮ কোটি ৯০ লাখ টাকার কাজ চলছে। প্রকল্পটির পরিচালক ও পরিবেশ অধিদপ্তরের কর্মকর্তা কামরুল হাসান বলেন, ছেঁড়াদিয়া, গোলদিয়া ও দিয়ারমাথায় প্রবাল ও শৈবালের বিস্তার ঘটছে। শৈবাল ও চুনাপাথরের গায়ে বিপুলসংখ্যক শামুক-ঝিনুক দেখা যাচ্ছে। বালিয়াড়িতে প্যারাবনও বেড়ে উঠছে। সেখানে ব্যাঙ, সাপ, টিকটিকি ও প্রজাপতিসহ বিভিন্ন প্রাণীর উপস্থিতি বেড়েছে।
জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান বলেন, জীববৈচিত্র্য রক্ষায় সরকারের ১২টি নির্দেশনা কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। গত দুই বছর কক্সবাজার থেকে একাধিক জাহাজে পর্যটকেরা সেন্ট মার্টিন যাতায়াত করছেন। পর্যটকদের যাতায়াত সহজ করতে টেকনাফের সাবরাং ট্যুরিজম পার্কে আধুনিক জেটি নির্মাণের প্রস্তুতি চলছে। সেটি চালু হলে যাতায়াতের সময় ও ভোগান্তি কমবে।
পরিবেশ রক্ষায় নানা পদক্ষেপ নেওয়া হলেও দ্বীপটির ঝুঁকি পুরোপুরি কাটেনি। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবও স্পষ্ট হচ্ছে। বঙ্গোপসাগরের পানির উচ্চতা বাড়ায় বর্ষাকালে উত্তাল সাগরের ঢেউয়ে দ্বীপের উত্তর, পশ্চিম ও দক্ষিণ অংশের বালিয়াড়ি দ্রুত ক্ষয়ে যাচ্ছে। সমুদ্রভাঙনে শত শত নারকেলগাছ উপড়ে পড়ছে।
একই সঙ্গে দ্বীপের ভূগর্ভস্থ সুপেয় পানির মজুত কমে সেখানে লবণাক্ত পানি প্রবেশ করছে। ফলে পানীয় জলের সংকট তীব্র হচ্ছে। সাগরেও আগের মতো মাছ পাওয়া যাচ্ছে না। পর্যটননির্ভর আয় বন্ধের পাশাপাশি প্রকৃতির এসব চাপ মিলিয়ে সেন্ট মার্টিনের মানুষের জীবনযাত্রা কঠিন হয়ে উঠেছে।
