মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থিতা চূড়ান্ত হওয়া এবং বিএনপির মহাসচিবের পদ থেকে তাঁর পদত্যাগের পর দল ও সরকার—দুই ক্ষেত্রেই পরিবর্তনের আলোচনা জোরালো হয়েছে। ফখরুলের ছেড়ে দেওয়া স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ে নতুন দায়িত্ব বণ্টনের পাশাপাশি মন্ত্রিসভায় সীমিত রদবদলের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা চলছে। একই সময়ে বিএনপির শূন্য মহাসচিব পদ, জাতীয় স্থায়ী কমিটিতে নতুন সদস্য অন্তর্ভুক্তি এবং ঠাকুরগাঁও-১ আসনে সম্ভাব্য উপনির্বাচন ঘিরে দলের ভেতরে নতুন সমীকরণ তৈরি হয়েছে।
রাষ্ট্রপতি হিসেবে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের শপথের পর এসব পরিবর্তনের প্রক্রিয়া আরও স্পষ্ট হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে। বিশেষ করে মহাসচিব পদে নতুন নেতৃত্ব, সরকারের ছয় মাস পূর্তিতে মন্ত্রিসভায় দায়িত্ব পুনর্বণ্টন এবং ফখরুলের ছেড়ে দেওয়া সংসদীয় আসনে বিএনপির প্রার্থী কে হবেন—এসব বিষয় এখন আলোচনার কেন্দ্রে।
এরই মধ্যে বিএনপির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটিতে রুহুল কবির রিজভী, আমানউল্লাহ আমান, মো. ইসমাইল জবিউল্লাহ ও ফরহাদ হালিমকে যুক্ত করা হয়েছে। নতুন চার সদস্য যুক্ত হওয়ায় কমিটির সদস্যসংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৬ জনে।
বর্তমান সদস্যরা হলেন—বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান, খন্দকার মোশাররফ হোসেন, রফিকুল ইসলাম মিয়া, মির্জা আব্বাস, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, আবদুল মঈন খান, নজরুল ইসলাম খান, আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, সালাহউদ্দিন আহমদ, সেলিমা রহমান, ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু, এ জেড এম জাহিদ হোসেন, রুহুল কবির রিজভী, আমানউল্লাহ আমান, মো. ইসমাইল জবিউল্লাহ ও ফরহাদ হালিম।
রুহুল কবির রিজভী দীর্ঘদিন বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিবের দায়িত্ব পালন করেছেন। বর্তমানে তিনি প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক ও শিল্পবিষয়ক উপদেষ্টা। সাবেক সচিব মো. ইসমাইল জবিউল্লাহ প্রধানমন্ত্রীর জনপ্রশাসনবিষয়ক উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। চিকিৎসক ফরহাদ হালিম জিয়াউর রহমান ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক। ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি ও ডাকসুর সাবেক ভিপি আমানউল্লাহ আমানও বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ে দায়িত্ব পালন করেছেন।
মির্জা ফখরুল মহাসচিবসহ দলীয় পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন। এ ছাড়া স্থায়ী কমিটির প্রবীণ সদস্য রফিকুল ইসলাম মিয়া দীর্ঘদিন ধরে নিষ্ক্রিয় রয়েছেন। অসুস্থতার কারণে বহু বছর ধরে দলীয় সভা ও কর্মসূচিতে তাঁকে দেখা যায় না।
বিএনপির গঠনতন্ত্র অনুযায়ী, দলের চেয়ারম্যান, সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান ও মহাসচিব স্থায়ী কমিটির সদস্য হিসেবে নির্বাচিত বলে গণ্য হন। তাঁদেরসহ জাতীয় স্থায়ী কমিটির মোট সদস্যসংখ্যা ১৯ জন। চেয়ারম্যানই কমিটির প্রধান।
২০১৬ সালের ১৯ মার্চ বিএনপির সর্বশেষ জাতীয় কাউন্সিলে স্থায়ী কমিটি পুনর্গঠন করা হয়েছিল। এরপর সদস্যদের মৃত্যু, পদত্যাগসহ বিভিন্ন কারণে কয়েকটি পদ শূন্য হয়। বিভিন্ন সময়ে সেসব পদে নতুন সদস্য নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এবার একসঙ্গে চারজনকে কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত করা হলো।
মির্জা ফখরুলের পদত্যাগের পর বিএনপির মহাসচিবের পদটি এখন শূন্য। নতুন মহাসচিব কে হবেন, তা নিয়ে দলের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে আলোচনা চলছে। তবে এখন পর্যন্ত কোনো নাম আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হয়নি।
রুহুল কবির রিজভীকে স্থায়ী কমিটির সদস্য করার পর আগামী কাউন্সিল পর্যন্ত তাঁকে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব দেওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে দলের অভ্যন্তরে আলোচনা রয়েছে। তবে এ বিষয়ে দলীয়ভাবে কোনো সিদ্ধান্ত জানানো হয়নি।
রাষ্ট্রপতি পদে ফখরুলের প্রার্থিতা চূড়ান্ত হওয়ায় তাঁর দায়িত্বে থাকা স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ে নতুন মুখ আসার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। একই সময়ে সরকারের ছয় মাস পূর্ণ হওয়ায় মন্ত্রিসভার কাজ পর্যালোচনা করে দায়িত্ব পুনর্বণ্টনের বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর ভাষ্য, রাষ্ট্রপতির শপথের আগে মন্ত্রিসভায় বড় ধরনের পরিবর্তনের সম্ভাবনা কম। তবে কয়েকজন নতুন মুখ যুক্ত করে সীমিত রদবদল হতে পারে।
স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে নতুন দায়িত্বপ্রাপ্ত হিসেবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদউদ্দিন চৌধুরীর নাম আলোচনায় রয়েছে। তবে কোনো সিদ্ধান্ত এখনো চূড়ান্ত হয়নি।
সম্ভাব্য নতুন মুখ হিসেবে কৃষক দলের সাধারণ সম্পাদক শহিদুল ইসলাম বাবুল, গাইবান্ধা-৪ (গোবিন্দগঞ্জ) আসনের সংসদ সদস্য শামীম কায়সার লিংকন, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. মঈন খান ও সেলিমা রহমান, ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু, চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল, লুৎফুজ্জামান বাবর, যুগ্ম মহাসচিব হাবিব উন নবী খান সোহেল এবং বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির (বিজেপি) চেয়ারম্যান আন্দালিভ রহমান পার্থের নামও আলোচনায় আছে।
মিত্র দল নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমানকে টেকনোক্র্যাট কোটায় মন্ত্রী করা হতে পারে—এমন আলোচনাও রাজনৈতিক মহলে রয়েছে। এ ছাড়া বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করা কয়েকজনকে পূর্ণ মন্ত্রী করার সম্ভাবনা নিয়েও আলোচনা আছে। এসব বিষয়ে অবশ্য কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
গত দুই দিনে সরকারের একাধিক মন্ত্রী ও বিএনপির উচ্চপর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে এ প্রতিবেদক কথা বললেও কেউ মন্ত্রিসভার সম্ভাব্য রদবদল নিয়ে মন্তব্য করতে রাজি হননি।
রাষ্ট্রপতি হলে মির্জা ফখরুলের ঠাকুরগাঁও-১ সংসদীয় আসনটি শূন্য হবে। ফলে সেখানে উপনির্বাচনের প্রয়োজন হবে। এই আসনে বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে স্থানীয়ভাবে ফখরুলের ছোট ভাই ও ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপির সভাপতি মির্জা ফয়সল আমিন এবং বড় মেয়ে মির্জা শামারুহর নাম আলোচনায় এসেছে। তবে মির্জা পরিবারের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
স্থানীয়ভাবে ফখরুলের উত্তরসূরি কে হবেন, তা নিয়ে দলীয় পর্যায়েও আলোচনা চলছে। অভিজ্ঞ নেতৃত্বের মাধ্যমে তৃণমূলকে সংগঠিত রাখার পক্ষে যেমন মত রয়েছে, তেমনি পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতায় তরুণ ও আধুনিক চিন্তার প্রতিনিধিত্বের বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে।
তবে শেষ পর্যন্ত প্রার্থী বাছাইয়ের সিদ্ধান্ত বিএনপির হাইকমান্ড এবং মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
ফখরুলের রাষ্ট্রপতি পদে যাওয়া, মহাসচিবের পদ শূন্য হওয়া, স্থায়ী কমিটিতে নতুন চারজনের অন্তর্ভুক্তি এবং সম্ভাব্য মন্ত্রিসভা পুনর্বিন্যাস—সব মিলিয়ে বিএনপির রাজনীতিতে এখন একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের অপেক্ষা তৈরি হয়েছে। ঠাকুরগাঁও-১ আসনে উপনির্বাচনের সম্ভাবনাও সেই পরিবর্তনের অন্যতম বড় পরীক্ষা হয়ে উঠতে পারে।
