অভাব-অনটনের সংসারে নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও জিপিএ-৫ পেয়েছেন লক্ষ্মীপুরের দালাল বাজার ফাতেমা গার্লস হাইস্কুলের শিক্ষার্থী নুজহাতী নুর। বাবাকে ছোটবেলায় হারানোর পর মা ও মামাদের সহযোগিতায় পড়াশোনা চালিয়ে গেছেন তিনি। জিপিএ-৫ পাওয়াকে নিজের পাশাপাশি মায়েরও সাফল্য বলে মনে করেন নুজহাতী।
বুধবার সকালে লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলা পরিষদ মিলনায়তনে শিখো-প্রথম আলো আয়োজিত জিপিএ-৫ সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে নিজের জীবনের সংগ্রামের কথা তুলে ধরেন নুজহাতী। অনুষ্ঠানে জেলার প্রায় সাড়ে চার শ শিক্ষার্থী অংশ নেয়। তাঁদের সঙ্গে কয়েক শ অভিভাবকও উপস্থিত ছিলেন।
নুজহাতী জানান, তাঁর বাবা একটি ছোট চায়ের দোকান চালাতেন। ২০১৫ সালে তিনি মারা যান। তখন নুজহাতী ছিলেন প্রাক্-প্রাথমিকের শিক্ষার্থী। বাবাকে হারানোর পর ছোট বোন ও তাঁকে নিয়ে মা দিশাহারা হয়ে পড়েন।
অভাবের কারণে কখনো খেয়ে, কখনো না খেয়ে দিন কাটাতে হয়েছে তাঁদের। পড়াশোনার জন্য আলাদা পড়ার টেবিলও ছিল না। মামারা মাঝেমধ্যে সহযোগিতা করেছেন। তাঁর মামারাও কৃষিকাজ করেন। তাঁদের সহায়তার পাশাপাশি মায়ের চেষ্টা ও পরিশ্রমে নুজহাতীর পড়াশোনা এগিয়ে চলে।
নুজহাতীর ভাষায়, জিপিএ-৫ পাওয়াটা তাঁর জন্য অনেক বড় অর্জন। এটি শুধু তাঁর নয়, তাঁর মায়েরও সাফল্য।
বুধবার সকাল থেকেই লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলা পরিষদ মিলনায়তন চত্বরে কৃতী শিক্ষার্থীদের উপস্থিতিতে উৎসবমুখর পরিবেশ তৈরি হয়। সকাল ৯টার দিকে শিক্ষার্থীদের আনন্দ-উচ্ছ্বাসে সংবর্ধনা অনুষ্ঠান প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে। সকাল ১০টায় জাতীয় সংগীতের মধ্য দিয়ে মূল অনুষ্ঠান শুরু হয়।
শুরুতে স্বাগত বক্তব্য দেন প্রথম আলোর লক্ষ্মীপুর প্রতিনিধি এ বি এম রিপন। এরপর শিক্ষার্থীদের অনুপ্রেরণা দিতে বক্তব্য দেন লক্ষ্মীপুর সরকারি কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ মাইন উদ্দিন পাঠান, হিসাববিজ্ঞান বিভাগের বিভাগীয় প্রধান হাসিবুল ছিদ্দিক, লক্ষ্মীপুর কলেজিয়েট উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা খোদেজা খাতুন এবং প্রথম আলোর হেড অব ফাস্ট রিপোর্টিং টিপু সুলতান।
লক্ষ্মীপুর সরকারি কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ মাইন উদ্দিন পাঠান শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে বলেন, তাঁদের অর্জন শুধু পরিবারের আনন্দের বিষয় নয়, পুরো জেলার জন্যও গর্বের। তবে সামনে সাফল্যের পথে নানা বাধা আসতে পারে। দৃঢ় ইচ্ছাশক্তি থাকলে সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করা সম্ভব বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
অধ্যাপক হাসিবুল ছিদ্দিক বলেন, জিপিএ-৫ শিক্ষার্থীদের জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হলেও এটি গন্তব্য নয়। ভালো ফলাফলের পাশাপাশি ভালো মানুষ হওয়ার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।
শিক্ষিকা খোদেজা খাতুন শিক্ষার্থীদের বড় স্বপ্ন দেখার পরামর্শ দেন। সেই স্বপ্ন যেন শুধু নিজের জন্য না হয়ে পরিবার, সমাজ ও দেশের জন্যও হয়—এমন প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন তিনি।
অনুষ্ঠানে প্রথম আলোর হেড অব ফাস্ট রিপোর্টিং টিপু সুলতান শিক্ষার্থীদের মাদক, মিথ্যা ও মুখস্থকে না বলার শপথ পাঠ করান। তিনি শিক্ষার্থীদের পাঠ্যবইয়ের পাশাপাশি সাহিত্য, বিজ্ঞান ও সংবাদপত্র পড়ার পরামর্শ দেন।
তিনি আরও বলেন, কোনো তথ্য দেখলেই তা বিশ্বাস বা ছড়িয়ে দেওয়ার আগে যাচাই করতে হবে। পাশাপাশি খেলাধুলা করা, বন্ধুদের সঙ্গে মেশা এবং মানুষের কথা শোনার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।
অনুষ্ঠানে অভিভাবক গোলাম সারওয়ার শিক্ষার্থীদের সততা, নৈতিকতা ও মানবিকতা ধরে রাখার আহ্বান জানান। তিনি স্বপ্ন দেখে তা বাস্তবায়নে নিয়মিত চেষ্টা চালিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেন।
বক্তব্যের পাশাপাশি অনুষ্ঠানে ছিল সাংস্কৃতিক পরিবেশনা ও কুইজ। ‘স্বপ্ন দেখো, জীবন গড়ো’ স্লোগানে আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান সহযোগিতা করে।
