ব্যক্তি করদাতাদের জন্য ধাপে ধাপে করমুক্ত আয়ের সীমা ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত উন্নীত করার ঘোষণা
জাতীয় সংসদে ২০২৬ সালের অর্থ বিল গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি সংশোধনীসহ পাস হয়েছে। নতুন অর্থ বিলের মাধ্যমে ব্যক্তি করদাতাদের জন্য করমুক্ত আয়সীমা বাড়ানো, বিনিয়োগের উৎস প্রকাশসংক্রান্ত বিতর্কিত প্রস্তাব প্রত্যাহার এবং বিভিন্ন শিল্পখাতে শুল্ক ও কর সুবিধা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
সোমবার জাতীয় সংসদে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বিলটি উত্থাপন করলে কণ্ঠভোটে তা পাস হয়। অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন হাফিজ উদ্দিন আহমদ।
সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়, বাজেট আলোচনায় প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া নির্দেশনা এবং বিভিন্ন মহলের মতামতের ভিত্তিতে একাধিক প্রস্তাবে সংশোধন আনা হয়েছে।
সংশোধিত প্রস্তাব অনুযায়ী, ব্যক্তি করদাতাদের জন্য করমুক্ত আয়ের সীমা আগামী পাঁচ অর্থবছরে ধাপে ধাপে বৃদ্ধি করা হবে।
২০২৬-২৭ এবং ২০২৭-২৮ অর্থবছরে করমুক্ত আয়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে ৪ লাখ টাকা। ২০২৮-২৯ এবং ২০২৯-৩০ অর্থবছরে তা বেড়ে হবে ৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা। আর ২০৩০-৩১ অর্থবছরে করমুক্ত আয়ের সীমা ৫ লাখ টাকায় উন্নীত হবে।
এর আগে প্রস্তাবিত বাজেটে এই সীমা তুলনামূলক কম নির্ধারণ করা হয়েছিল।
অর্থ বিলের সবচেয়ে আলোচিত বিষয়গুলোর একটি ছিল বিনিয়োগের উৎস প্রকাশসংক্রান্ত বিধান। জনমনে বিভ্রান্তি ও উদ্বেগ সৃষ্টি হওয়ায় সরকার শেষ পর্যন্ত এ প্রস্তাব প্রত্যাহার করেছে।
অর্থমন্ত্রী বলেন, জমি নিবন্ধনের ক্ষেত্রে প্রকৃত বাজারমূল্যের পরিবর্তে অনেক সময় মৌজা মূল্যে লেনদেন নিবন্ধিত হওয়ায় করদাতারা জটিলতায় পড়েন। সেই সমস্যা নিরসনের উদ্দেশ্যে প্রস্তাবটি আনা হয়েছিল। তবে জনমতকে গুরুত্ব দিয়ে সরকার তা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
জনসাধারণের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হওয়ায় আরও দুটি প্রস্তাব প্রত্যাহার করা হয়েছে।
এর মধ্যে রয়েছে অধিকাংশ ব্যাংক হিসাব খোলার ক্ষেত্রে বাধ্যতামূলকভাবে করদাতা শনাক্তকরণ নম্বর (টিআইএন) সনদ জমা দেওয়ার বিধান এবং সম্পত্তি বণ্টন দলিল ও নামজারি নিবন্ধনের জন্য টিআইএন সনদ বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব।
উচ্চশিক্ষা খাতকে উৎসাহ দিতে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের আয়কর হার বিদ্যমান ১০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ করার প্রস্তাব রাখা হয়েছে।
এছাড়া পার্বত্য তিন জেলা এবং সমতলের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী জনগোষ্ঠীর জন্য কর সুবিধার আওতা বাড়ানো হয়েছে। ব্যবসা ও কৃষি আয়ের পাশাপাশি বেতনভিত্তিক আয়ও করমুক্ত সুবিধার অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
রপ্তানিমুখী চিংড়ি শিল্পকে সহায়তা দিতে আমদানিকৃত চিংড়ি খাদ্য, ভিটামিন, খনিজ উপাদান, প্রোবায়োটিকস এবং সংশ্লিষ্ট যন্ত্রপাতির ওপর বিদ্যমান শুল্ক ও মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) প্রত্যাহারের প্রস্তাব করা হয়েছে।
একই সঙ্গে বিভিন্ন শিল্পে ব্যবহৃত কাঁচামালের ওপর শুল্ক ছাড়, ওষুধ শিল্পে ব্যবহৃত আমদানিকৃত মধুর ওপর সম্পূরক শুল্ক প্রত্যাহার এবং শিল্প কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত পিভিসি ও পিইটি রেজিনের আমদানি শুল্ক কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে আনুষ্ঠানিক লেনদেন উৎসাহিত করতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ওটিটি প্ল্যাটফর্ম, সার্চ ইঞ্জিন ও অনলাইন মার্কেটপ্লেসে বিজ্ঞাপনের ওপর বিদ্যমান ১৫ শতাংশ ভ্যাট কমিয়ে ৫ শতাংশ করার প্রস্তাব দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী।
তার মতে, এতে বিদেশে অনানুষ্ঠানিকভাবে অর্থ পরিশোধের প্রবণতা কমবে এবং কর আদায় বাড়বে।
দেশীয় অটোমোবাইল শিল্পের বিকাশে স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত ডাবল কেবিন পিকআপ ও মাইক্রোবাসের ওপর ভ্যাট ১৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে।
এছাড়া এলইডি বাতি, প্রিফ্যাব ভবন এবং বিভিন্ন উৎপাদনশিল্পে ব্যবহৃত কাঁচামালের ওপর বিদ্যমান শুল্ক সুবিধার মেয়াদ ২০৩০ সাল পর্যন্ত বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, করমুক্ত আয়সীমা বৃদ্ধি মধ্যবিত্ত করদাতাদের জন্য স্বস্তি বয়ে আনবে। একই সঙ্গে ডিজিটাল বিজ্ঞাপন, উৎপাদনশিল্প, চিংড়ি খাত এবং ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জন্য দেওয়া নতুন সুবিধাগুলো সংশ্লিষ্ট খাতের প্রবৃদ্ধিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
তবে রাজস্ব আহরণ ও কর ব্যবস্থাপনার কার্যকারিতা নিশ্চিত করতে সরকারের সামনে নতুন চ্যালেঞ্জও তৈরি হবে বলে মনে করছেন তারা।
সংশোধিত অর্থ বিল ২০২৬-এ একদিকে সাধারণ করদাতাদের জন্য স্বস্তির বার্তা এসেছে, অন্যদিকে শিল্প ও রপ্তানি খাতের জন্য একাধিক প্রণোদনা রাখা হয়েছে। জনমতের প্রতিফলন ঘটিয়ে কয়েকটি বিতর্কিত প্রস্তাব প্রত্যাহার করায় বিলটি সংসদে তুলনামূলক গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
