পরীক্ষার্থী ঝরে পড়ার হার নিয়ে উদ্বেগ; শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বিশ্লেষণ চলছে
সারা দেশে আজ বৃহস্পতিবার থেকে শুরু হচ্ছে ২০২৬ সালের উচ্চ মাধ্যমিক সার্টিফিকেট (এইচএসসি) ও সমমানের পরীক্ষা। দেশের ১১টি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে এবার প্রায় ১২ লাখ ৭০ হাজার শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে। তবে পরীক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ ফরম পূরণ না করায় ঝরে পড়ার হার নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
বুধবার রাজধানীর সচিবালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে শিক্ষামন্ত্রী এএনএম এহসানুল হক মিলন পরীক্ষার সার্বিক প্রস্তুতি এবং শিক্ষা খাতের বিভিন্ন বিষয় তুলে ধরেন। মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ এ সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, দেশের নয়টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ড, একটি মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড এবং একটি কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে মোট ১২ লাখ ৭০ হাজার পরীক্ষার্থী এবারের পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে।
এর মধ্যে ছাত্রী সংখ্যা ৬ লাখ ৪৮ হাজার ৬১৪ জন এবং ছাত্র সংখ্যা ৬ লাখ ২১ হাজার ৯৬৯ জন।
পরীক্ষা শুরুর আগে প্রকাশিত তথ্য বলছে, সাধারণ শিক্ষা বোর্ডগুলোর আওতাধীন সম্ভাব্য পরীক্ষার্থীদের মধ্যে ৩৩ দশমিক ০৪ শতাংশ ফরম পূরণ করেনি।
বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডে এই হার ৪৪ দশমিক ০৭ শতাংশ এবং বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ডে সর্বোচ্চ ৫৪ দশমিক ৫৮ শতাংশ শিক্ষার্থী পরীক্ষার জন্য নিবন্ধন করেনি।
শিক্ষামন্ত্রী বলেন, এই উচ্চ ঝরে পড়ার হার কেন ঘটছে তা জানতে সরকার বিস্তারিত বিশ্লেষণ করছে। মূল কারণগুলো চিহ্নিত করে শিক্ষাব্যবস্থার দুর্বলতা দূর করা এবং ভবিষ্যতে শিক্ষার্থী ঝরে পড়া কমানোই সরকারের লক্ষ্য।
এবারের এইচএসসি পরীক্ষার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হলো দেশের নয়টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে অভিন্ন প্রশ্নপত্র চালু করা।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মতে, এতে মূল্যায়ন প্রক্রিয়ায় সমতা নিশ্চিত হবে এবং বিভিন্ন বোর্ডের মধ্যে প্রশ্নপত্রের মানগত পার্থক্য কমবে।
পরীক্ষা কেন্দ্রগুলোতে শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের বডি ক্যামেরা ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
এছাড়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরীক্ষাকে কেন্দ্র করে গুজব, ভুয়া তথ্য বা বিভ্রান্তিকর প্রচারণা ছড়ানোর বিরুদ্ধে সাইবার আইন কঠোরভাবে প্রয়োগ করা হবে বলে জানিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী।
তিনি বলেন, পরীক্ষা সংক্রান্ত অনিয়মে জড়িত শিক্ষক, কর্মকর্তা বা কর্মচারীদের বিরুদ্ধে শাস্তির বিধান আরও স্পষ্ট করে গণপরীক্ষা (অপরাধ) আইন, ১৯৮০-এ সংশোধন আনা হয়েছে।
প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা স্থানীয় কোনো সংকট দেখা দিলে পরীক্ষা স্থগিত করার পরিবর্তে স্থানীয় প্রশাসনকে তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত নিয়ে পরীক্ষা কার্যক্রম সচল রাখার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা মনে করছেন, এতে পরীক্ষার সময়সূচি ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি কমবে।
নতুন শিক্ষাক্রম প্রসঙ্গে এক প্রশ্নের জবাবে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, ২০২৭ সালের আগে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন করা সম্ভব নয়। ফলে নতুন শিক্ষাক্রম ২০২৮ সাল থেকে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে।
তিনি আরও জানান, কোচিংনির্ভরতা কমাতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অতিরিক্ত ক্লাস চালু, পাঠদানের মানোন্নয়ন এবং কোচিং সেন্টার পরিচালনায় সরকারি অনুমতির বাধ্যবাধকতাসহ বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
শিক্ষাবিদদের মতে, পরীক্ষার্থীদের বড় অংশের ঝরে পড়া দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার জন্য সতর্কবার্তা। বিশেষ করে কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষায় উচ্চ ঝরে পড়ার হার নিয়ে গভীর গবেষণা ও নীতিগত পদক্ষেপ প্রয়োজন।
তাদের মতে, শুধু পরীক্ষার আয়োজন নয়, শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে ধরে রাখা এবং উচ্চশিক্ষায় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
দেশজুড়ে এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা শুরু হলেও শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার উচ্চ হার শিক্ষা খাতের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে সামনে এসেছে। একদিকে অভিন্ন প্রশ্নপত্র, বাড়তি নিরাপত্তা ও নতুন নীতিগত উদ্যোগ পরীক্ষাকে আরও সুশৃঙ্খল করার চেষ্টা করছে, অন্যদিকে শিক্ষাব্যবস্থায় অংশগ্রহণ বাড়াতে দীর্ঘমেয়াদি সংস্কারের প্রয়োজনীয়তাও স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
