একটির পর একটি দুর্যোগে নেপালের পর্যটন খাত আবারও বড় ধরনের অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। রাজনৈতিক অস্থিরতা, বন্যা, বিমান দুর্ঘটনা ও করোনাভাইরাস মহামারির ধাক্কা সামলে পর্যটন যখন ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছিল, তখন গত বুধবার রাসুয়া জেলায় ভয়াবহ পাহাড়ি ঢল নতুন করে সংকট তৈরি করেছে।
বিশেষ করে লাভজনক কৈলাস মানস সরোবর তীর্থযাত্রার ওপর এ দুর্যোগের বড় প্রভাব পড়েছে। তিব্বতে যাওয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশপথ রাসুয়াগড়ি-তিমুর এলাকায় পাহাড়ি ঢল আঘাত হানে।
নেপালের পরিবেশবিশেষজ্ঞ বিজয় কুমার সিং মনে করেন, পাহাড়নির্ভর পর্যটন ব্যবস্থায় ঝুঁকি নিরূপণ ও দুর্যোগ প্রস্তুতিকে আরও গুরুত্ব দিতে হবে। তাঁর মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে হিমালয় অঞ্চলের ঝুঁকি বাড়ছে।
নেপালের পর্যটন খাত গত কয়েক বছরে একাধিক সংকটের মধ্য দিয়ে গেছে। করোনাভাইরাস মহামারির কারণে আন্তর্জাতিক পর্যটন প্রায় পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর রাজনৈতিক অস্থিরতাও খাতটিকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
এর আগে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে কাঠমান্ডু উপত্যকায় ভয়াবহ বন্যা হয়। বিভিন্ন মূল্যায়ন অনুযায়ী, চার দশকের মধ্যে ওই সময়ে নেপালে সবচেয়ে ভারী বৃষ্টিপাত হয়েছিল। বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওই বন্যায় ২৪৯ জন নিহত, ১৭৭ জন আহত এবং ১০ হাজারের বেশি পরিবার বাস্তুচ্যুত হয়।
বিমান দুর্ঘটনাও নেপালের পর্যটন খাতে বড় আঘাত দিয়েছে। ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে পোখারায় অবতরণের সময় ইয়েতি এয়ারলাইনসের একটি এটিআর-৭২ বিধ্বস্ত হয়ে ৬৮ যাত্রী ও চার ক্রুসহ সবাই নিহত হন। পরের বছর জুলাইয়ে কাঠমান্ডু বিমানবন্দর থেকে উড্ডয়নের পর শৌর্য এয়ারলাইনসের একটি বোম্বার্ডিয়ার সিআরজে-২০০ বিধ্বস্ত হয়ে ১৮ জন নিহত হন।
এর সঙ্গে ২০১৫ সালের ভয়াবহ ভূমিকম্পও পর্যটন অবকাঠামো ও প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনার ব্যাপক ক্ষতি করে। প্রায় ৯ হাজার মানুষের প্রাণহানি ঘটে এবং বিদেশি পর্যটকের সংখ্যা কমে যায়।
রাসুয়ার সর্বশেষ দুর্যোগ নেপালের পর্যটননির্ভর অর্থনীতির সামনে নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে—জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে হিমালয়ের পাহাড় ও পর্যটন এলাকা কি ক্রমেই বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে?
বিশেষজ্ঞরা নেপালের ৪২টি হিমবাহ হ্রদকে অত্যন্ত বিপজ্জনক হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। হিমালয়ে তাপমাত্রা বৃদ্ধি ও দ্রুত বরফ গলার ফলে এসব হ্রদ বড় হচ্ছে। দুর্বল প্রাকৃতিক বাঁধ ভেঙে গেলে বিপুল পানি, পাথর ও কাদা নিচের দিকে ধেয়ে আসতে পারে। এতে জনবসতি, সড়ক, সেতু, জলবিদ্যুৎ প্রকল্প এবং পর্যটন অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
নেপালের বৈশ্বিক কার্বন ডাই-অক্সাইড নিঃসরণে অংশ শূন্য দশমিক ১ শতাংশেরও কম হলেও দেশটি নাজুক পাহাড়ি পরিবেশের কারণে জলবায়ু পরিবর্তনের উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে।
সাবেক পরিবেশমন্ত্রী গণেশ শাহ মনে করেন, পাহাড়ি পর্যটন রক্ষা ও দুর্যোগ মোকাবিলায় নেপালকে আধুনিক প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় দ্রুত উদ্ধার তৎপরতার জন্য স্যাটেলাইট যোগাযোগব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তার কথাও তিনি বলেছেন।
রাসুয়ার দুর্যোগের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে কৈলাস মানস সরোবর তীর্থযাত্রায়। গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত নেপাল পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, তিব্বতগামী ৬৪৪ জন তীর্থযাত্রী নিখোঁজ ছিলেন। তাঁদের মধ্যে ১৭৮ জন ভারতীয়, ১২৭ জন নেপালি, ৫৫ জন মার্কিন, ৫৩ জন ইউক্রেনীয়, ৫১ জন মালয়েশীয়, ৩৫ জন অস্ট্রেলীয় এবং ৩৩ জন ব্রিটিশ নাগরিক ছিলেন।
এ পরিসংখ্যান থেকে তিব্বত যাওয়ার ক্ষেত্রে নেপালের পথের আন্তর্জাতিক গুরুত্বও স্পষ্ট হয়।
চলতি বছর কৈলাস মানস সরোবর যাত্রার চাহিদা ছিল বেশি। ৪০ হাজারের বেশি মানুষের আগ্রহ থাকলেও চীন সরকার নেপাল হয়ে যাওয়া ভারতীয় তীর্থযাত্রীর সংখ্যা সর্বোচ্চ ২৪ হাজারে সীমাবদ্ধ রাখে।
গত মে মাসের মাঝামাঝি আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু হয়। নেপালগঞ্জ, সিমিকোট ও হিলসার মতো ট্রানজিট পয়েন্টগুলোতে তখন পর্যটকদের উপস্থিতি বাড়ে।
ট্যুর অপারেটরদের কাছে এ তীর্থযাত্রা অত্যন্ত লাভজনক। ১০ দিনের রাসুয়াগড়ি-কেরুং প্যাকেজে পর্যটকপ্রতি খরচ প্রায় ১ হাজার ৭০০ মার্কিন ডলার। এ মৌসুম থেকে হোটেল, বিমান সংস্থা, রেস্তোরাঁ, গাইড ও কুলিদের আয় হয়; একই সঙ্গে সরকারের রাজস্বও বাড়ে।
তিব্বতি পঞ্জিকা অনুযায়ী ২০২৬ সাল ‘ইয়ার অব দ্য হর্স’। ধর্মীয় বিশ্বাসে এ বছর কৈলাস পরিক্রমা বিশেষভাবে শুভ বলে মনে করা হয়। ফলে এবার তীর্থযাত্রার চাহিদাও বেড়েছিল।
নেপাল ট্যুরিজম বোর্ডের সাবেক প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা দীপক রাজ যোশী মনে করেন, রাসুয়ার দুর্যোগের প্রভাব পর্যটন খাতে দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। তাঁর মতে, এ ক্ষতির রেশ ছয় থেকে সাত মাস পর্যন্ত থাকতে পারে।
তিনি আরও মনে করেন, নেপালের অন্যান্য নিরাপদ ও অক্ষত পর্যটন অঞ্চলগুলোর বিষয়ে আন্তর্জাতিক পর্যটকদের কাছে সঠিক বার্তা পৌঁছে দিতে বিশেষ পর্যটন পুনরুদ্ধার দল প্রয়োজন।
তবে নেপালের পর্যটন খাত অতীতেও বড় সংকট কাটিয়ে ঘুরে দাঁড়িয়েছে। রাজনৈতিক অস্থিরতা, মাওবাদী বিদ্রোহ, বিমান দুর্ঘটনা, ভূমিকম্প, বিদ্যুৎ-সংকট ও মহামারির পরও খাতটি পুনরুদ্ধার করেছে।
দীপক রাজ যোশীর মতে, সংকট কাটিয়ে দ্রুত ঘুরে দাঁড়ানোর সক্ষমতা নেপালের রয়েছে।
ওয়ার্ল্ড ট্রাভেল অ্যান্ড ট্যুরিজম কাউন্সিলের হিসাবে, নেপালের মোট দেশজ উৎপাদনে ভ্রমণ ও পর্যটনের অবদান ৬ দশমিক ৬ শতাংশ। বিশেষ করে দুর্গম পাহাড়ি এলাকার মানুষের আয়ের বড় উৎস এই খাত।
ফলে প্রাকৃতিক দুর্যোগে পর্যটন ক্ষতিগ্রস্ত হলে স্থানীয় মানুষের জীবন-জীবিকাতেও বড় প্রভাব পড়ে। সড়ক, সেতু, বিমানবন্দর ও হোটেল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি সরবরাহব্যবস্থা ব্যাহত হয় এবং পর্যটকদের বুকিং বাতিল হতে পারে।
নেপাল মাউন্টেনিয়ারিং অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক রাজেন্দ্র লামা বলেন, মহামারির ধাক্কা কাটিয়ে পর্যটন যখন ঘুরে দাঁড়াচ্ছিল, তখন রাসুয়ার দুর্যোগ নতুন বড় আঘাত হিসেবে এসেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এখন নেপালের জন্য শুধু পর্যটক বাড়ানোই যথেষ্ট নয়। পর্যটকদের আকর্ষণ করা পাহাড় ও পর্বতগুলোকে নিরাপদ রাখাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
এ জন্য আগাম সতর্কবার্তা ব্যবস্থা, শক্তিশালী অবকাঠামো, নির্ভরযোগ্য যোগাযোগব্যবস্থা, স্যাটেলাইট পর্যবেক্ষণ এবং দুর্গম এলাকায় দ্রুত উদ্ধার সক্ষমতা বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে। পাশাপাশি হিমবাহ হ্রদসহ জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ঝুঁকিগুলোও আরও নিখুঁতভাবে চিহ্নিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
নেপালের পর্যটন খাত অতীতে নানা সংকট সামলে ঘুরে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু হিমালয়ের তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে জলবায়ু পরিবর্তন এখন এমন একটি দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি তৈরি করছে, যা পর্যটন পরিকল্পনা ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনাকে একই কাঠামোর মধ্যে আনার প্রয়োজনীয়তা আরও স্পষ্ট করছে।
