গবেষণাটি এ মাসের শুরুতে বিজ্ঞান সাময়িকী ‘গ্লোবাল ইকোলজি অ্যান্ড কনজারভেশনে’ প্রকাশিত হয়েছে। এতে বন অধিদপ্তর, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব ফরেস্ট্রি অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগ এবং জার্মানির ইউনিভার্সিটি অব গেটিনয়েনের গবেষকেরা যুক্ত ছিলেন।
বন অধিদপ্তরের বাংলাদেশ ওয়াইল্ডলাইফ সেন্টারের পরিচালক বিপুল কৃষ্ণ দাস গবেষণাটির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তিনি জানান, ইনানী জাতীয় উদ্যানের আয়তন ৭ হাজার ৮৫ হেক্টর। সেখানে ১৫টি ক্যামেরার মাধ্যমে ৩২টি স্থান পর্যবেক্ষণ করা হয়। তিনটি ক্যামেরায় মেঘলা চিতার পাঁচটি ছবি ধরা পড়ে। এ ছাড়া জলাশয় ও পানির প্রবাহ রয়েছে এমন এলাকায় অন্যান্য অংশের তুলনায় বন্য প্রাণীর উপস্থিতি বেশি পাওয়া গেছে।
প্রকৃতি সংরক্ষণের আন্তর্জাতিক জোট আইইউসিএনের লাল তালিকায় বাংলাদেশে মেঘলা চিতা মহাবিপন্ন হিসেবে রয়েছে। বৈশ্বিকভাবে প্রাণীটি ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে তালিকাভুক্ত। দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বনভূমিতে বসবাসকারী এই মাঝারি আকারের প্রাণীর শরীরে মেঘের মতো বড় বড় ছোপ রয়েছে। দিনের বড় একটি সময় এটি গাছের ওপর কাটায়। বানর, পাখি ও ছোট স্তন্যপায়ী প্রাণী এর শিকারের তালিকায় রয়েছে।
মেঘলা চিতার উপস্থিতি কক্সবাজারের ইনানী জাতীয় উদ্যানে বন্য প্রাণী সংরক্ষণের নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। গবেষণায় বলা হয়েছে, উদ্যানের প্রায় ৩ হাজার হেক্টর বনাঞ্চল মেঘলা চিতার বসবাসের উপযোগী, যা মোট আয়তনের প্রায় ৪৪ শতাংশ। মূলত গাছ ও ঘন ঝোপঝাড়সমৃদ্ধ এলাকায় প্রাণীটির উপস্থিতি বেশি পাওয়া গেছে। এ ধরনের বনাঞ্চলের পরিমাণ ২ হাজার ৮৮৭ হেক্টর।
বন্য প্রাণী গবেষক রেজা খান বলেন, মেঘলা চিতা খুবই বিরল প্রাণী। ইনানীর বনে এর উপস্থিতি বন্য প্রাণী সংরক্ষণে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে। তাঁর মতে, মেঘলা চিতার বসবাসের এলাকাগুলো চিহ্নিত করে বিশেষভাবে সংরক্ষণের ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে কাঠ আহরণ বন্ধ করা এবং বনের ভেতরে বসতি থাকলে তা সরিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থা করার কথা বলেন তিনি।
রেজা খান জানান, একসময় চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও তিন পার্বত্য জেলার বন অবিভক্ত ছিল। পরে এসব বন খণ্ডবিখণ্ড হয়েছে। মেঘলা চিতা গাছ থেকে গাছে লাফিয়ে শিকার ধরে এবং খুব কমই মাটিতে নামে। ইনানীর বনে এটি শীর্ষ শিকারি হওয়ায় এর আবাসস্থল সুরক্ষিত রাখা জরুরি বলে তিনি মনে করেন।
মেঘলা চিতার পাশাপাশি গবেষণায় আরও ২১ প্রজাতির বন্য প্রাণীর তথ্য পাওয়া গেছে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে এশিয়ান হাতি, মুখপোড়া হনুমান, উল্টোলেজি বানর, শজারু, রেসাস মেকাক, শিয়াল, গন্ধগোকুল, ছোট খাটাশ, বড় খাটাশ, বনবিড়াল, চিতা বিড়াল, শূকর, কাঁকড়াভুক বেজি, গোরখোদক, ইরাবতী কাঠবিড়ালি, গেছো চুছো, মায়া হরিণ, দাঁতাল ফেরেট বেজার, ছোট রক্তপেকো বাদুড়, বাদামি কাঠবিড়ালি, লজ্জাবতী বানর ও লাল উড়ন্ত কাঠবিড়ালি।
গবেষণায় ইনানী জাতীয় উদ্যানের জীববৈচিত্র্যের জন্য কয়েকটি হুমকিও চিহ্নিত করা হয়েছে। মানুষের বসতি স্থাপন, রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরের সম্প্রসারণ, গাছ কেটে জ্বালানি সংগ্রহ এবং কৃষিজমির অবৈধ অনুপ্রবেশের কারণে বন্য প্রাণীর আবাসস্থল হুমকির মুখে পড়েছে। মানুষের আনাগোনা রয়েছে বা কৃষিকাজ হয়—এমন এলাকায় বন্য প্রাণীর সংখ্যা ও বৈচিত্র্য তুলনামূলকভাবে কম পাওয়া গেছে।
ইনানীর জীববৈচিত্র্য রক্ষায় বনের ভেতরের অবৈধ অনুপ্রবেশ ও বনভূমি দখল বন্ধ করার সুপারিশ করেছেন গবেষকেরা। পাশাপাশি বন্য প্রাণীদের সুপেয় পানির একমাত্র উৎস পাহাড়ি ছড়া ও খাল রক্ষা এবং পানির প্রবাহ সচল রাখার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
গবেষণায় উদ্যানের চারপাশে বাফার জোন তৈরি এবং পরিবেশগত ভারসাম্য বজায় রেখে বন্য প্রাণী সংরক্ষণে স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করার সুপারিশ করা হয়েছে। দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া না হলে ইনানী জাতীয় উদ্যানের উপকূলীয় অঞ্চলের জীববৈচিত্র্য ও বিরল স্তন্যপায়ী প্রাণী চিরতরে বিলুপ্ত হয়ে যেতে পারে বলেও গবেষণায় আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে।
