বৈশাখের পরও বাজারে পাকা আম—কাটিমনের কারণে বদলে যাচ্ছে প্রচলিত আমের মৌসুমের ধারণা। ভাদ্রের শেষ দিকেও দেশের বিভিন্ন বাজারে পাওয়া যাচ্ছে পাকা কাটিমন। আশ্বিনেও এর সরবরাহ থাকার কথা রয়েছে। আগামী দুই বছরের মধ্যে সারা বছরই দেশের বাজারে পাকা কাটিমন পাওয়া যেতে পারে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
রাজধানীর ফুটপাত থেকে শুরু করে অভিজাত এলাকার ফলের দোকানেও এখন কাটিমন বিক্রি হচ্ছে। আকার ও মানভেদে প্রতি কেজি ১৬০ থেকে ২৮০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে এই আম। অসময়ের আম হওয়ায় দাম কিছুটা বেশি হলেও তা ক্রেতাদের নাগালের বাইরে নয়।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে প্রায় এক লাখ মেট্রিক টন কাটিমন উৎপাদিত হচ্ছে। এটি মোট আম উৎপাদনের প্রায় ৫ শতাংশ। দেশে বছরে মোটামুটি ২৬ লাখ মেট্রিক টন আম উৎপাদিত হয়। এর মধ্যে আম্রপালি প্রায় ৩৫ শতাংশ, হিমসাগর ১৫ শতাংশ, বারি ১০ শতাংশ, হাঁড়িভাঙা ৭ শতাংশ এবং গোবিন্দভোগ ও কাটিমন ৫ শতাংশ করে।
তবে কাটিমনের উৎপাদন দ্রুত বাড়ছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের পরামর্শক (হর্টিকালচার) কৃষিবিজ্ঞানী মো. মেহেদী মাসুদের ভাষ্য, প্রতিবছর কাটিমনের উৎপাদন প্রায় দ্বিগুণ হচ্ছে। ফলে ভবিষ্যতে দেশের আমের বাজারে জাতটির অবস্থান আরও শক্ত হতে পারে।
কাটিমন থাইল্যান্ডের একটি বারোমাসি আমের জাত। এটি হাইব্রিড নয়। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ২০১৪ সালে বাংলাদেশে জাতটির পরীক্ষামূলক চাষ শুরু করে। চারা উৎপাদন ও গাছে মুকুল আসার সফলতার পর ২০১৬ সালে ব্যাপকভাবে চারা উৎপাদন এবং কৃষকদের প্রশিক্ষণ শুরু হয়।
কাটিমনের বাণিজ্যিক চাষের প্রচলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন মেহেদী মাসুদ। ২০১৪ সালে থাইল্যান্ড থেকে দুই হাজার কাটিমনের চারা আনা হয়। আমদানি করা চারা থেকে মাতৃগাছ তৈরি করে ২০১৬ সালে দেশের ৬৪ জেলার হর্টিকালচার সেন্টারে ১০টি করে গাছ রোপণ করা হয়।
চুয়াডাঙ্গার আমচাষি আবুল কাশেম পাঁচ বিঘা জমিতে কাটিমন চাষ করে সফল হওয়ার পর জাতটির বাণিজ্যিক সম্ভাবনা আরও স্পষ্ট হয়। পরে পর্যায়ক্রমে দেশের ৫০ হাজার চাষিকে কাটিমন চাষে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। পাশাপাশি ৫০ শতাংশ থেকে এক একর জমিতে ‘বাণিজ্যিক ফলবাগান’ নামে প্রদর্শনী বাগান করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। এভাবে প্রায় সাত হাজার বাগান গড়ে ওঠে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের হিসাবে, বর্তমানে দেশে প্রায় সাত হাজার একর জমিতে কাটিমনের বাণিজ্যিক চাষ হচ্ছে। এর মধ্যে নওগাঁয় সবচেয়ে বেশি, প্রায় ৭০০ থেকে ৮০০ একর। চাঁপাইনবাবগঞ্জে ৫০০ একরের বেশি জমিতে কাটিমন চাষ হচ্ছে।
কাটিমনের ফলন ও বাণিজ্যিক সম্ভাবনা নিয়ে কৃষকদের আগ্রহ বাড়াতে কৃষিবিষয়ক সাংবাদিক শাইখ সিরাজের পরিচালনায় চ্যানেল আইয়ের একটি অনুষ্ঠানও ভূমিকা রাখে। সেখানে মেহেদী মাসুদ কাটিমন চাষের পদ্ধতি, মুকুল ভাঙার সময়, শাখায় পাতার সংখ্যা ও সার ব্যবহারের বিষয়ে আলোচনা করেন। ২০২৩ সাল থেকে কাটিমন বাজারে উঠতে শুরু করে।
কাটিমনের বাণিজ্যিক চাষ মূলত গ্রাফটিং ও টপ ওয়ার্কিং—এই দুই পদ্ধতিতে করা হয়। গ্রাফটিং পদ্ধতিতে কলমের চারা রোপণের পর ভালো পরিচর্যায় ছয় মাসের মধ্যেই মুকুল আসতে পারে। তবে গাছের বৃদ্ধি ও দীর্ঘমেয়াদি ফলনের জন্য অন্তত দুই বছর বয়স পর্যন্ত মুকুল ভেঙে দিতে হয়। টপ ওয়ার্কিং পদ্ধতিতে বড় গাছের শাখা কেটে সেখানে কাটিমনের কলম জুড়ে দেওয়া হয়।
সাধারণত বছরে অন্তত দুবার কাটিমন পাওয়া যায়। দুই বছর বয়সী গ্রাফটিং কলমের গাছে প্রতিবার প্রায় ২০ কেজি করে বছরে ৪০ কেজি আম ধরতে পারে। গাছের বয়স বাড়ার সঙ্গে ফলনও বাড়ে। প্রতি বিঘায় ১০০টি গাছ থাকলে প্রায় চার হাজার কেজি আম উৎপাদন হতে পারে।
প্রতি কেজি ২০০ টাকা হিসাবে এই ফলনের মূল্য প্রায় আট লাখ টাকা। আবার সব খরচ বাদ দিয়ে পাইকারি দাম প্রতি কেজি ১২০ টাকা ধরলেও বিঘাপ্রতি প্রায় পাঁচ লাখ টাকা আয় হতে পারে। এই লাভজনক সম্ভাবনাকে কাটিমনের দ্রুত সাফল্যের অন্যতম কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ক্ষেত্রবিশেষে কাটিমনের গাছ ২০ থেকে ৩০ বছর ভালো ফলন দিতে পারে। সারা বছর ফলন পেতে গাছের মুকুল আসার সময় পরিকল্পিতভাবে তা নিয়ন্ত্রণ করতে হয়। এপ্রিল-মে মাসে আসা মুকুলের ফলন আগস্ট-সেপ্টেম্বরে পাওয়া যায়। জুন-জুলাইয়ের মুকুল থেকে অক্টোবর-নভেম্বরে এবং অক্টোবরের শেষের মুকুল থেকে ডিসেম্বর-জানুয়ারিতে ফলন পাওয়া সম্ভব। তবে গাছের স্বাস্থ্য ও ভালো ফলনের জন্য চাষিরা সাধারণত বছরে দুবার ফলন নেন।
কাটিমনের জলীয় অংশ কম হওয়ায় পাকা অবস্থায় এটি তুলনামূলক শক্ত থাকে। কোনো রাসায়নিক প্রয়োগ ছাড়াই সুপক্ব আম অন্তত ১০ দিন ভালো থাকতে পারে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এ কারণে রপ্তানির জন্যও এটি অন্য অনেক আমের তুলনায় বেশি উপযোগী বলে মনে করা হয়। উচ্চ মিষ্টতা ও কম জলীয় অংশের কারণে কাটিমন ‘হানি ম্যাঙ্গো’ নামেও পরিচিত।
পাকা কাটিমনের রং সোনালি হলুদ। ব্যাগিং পদ্ধতিতে চাষের কারণে কাঁচা অবস্থায়ও এটি অন্য আমের মতো গাঢ় সবুজ হয় না; বরং হলদে আভা থাকে। সুপক্ব হলে আমটি পুরোপুরি সোনালি হলুদ হয়। ভালো মানের তিনটি কাটিমনে এক কেজি হয় এবং গড় ওজন প্রায় ৩৯৬ গ্রাম।
কাটিমনের শাঁস সোনালি হলুদ, আঁটি পাতলা এবং স্বাদ মিষ্টি। তবে মিষ্টতার দিক থেকে এটি আম্রপালির চেয়ে কিছুটা কম। আম্রপালির মিষ্টতা ২৬ ব্রিকস, আর কাটিমনের ২০ ব্রিকস। ছোট অবস্থায় আম পেড়ে আনলে স্বাদ পানসে হতে পারে।
বর্তমানে রাজধানীর অভিজাত এলাকার ফলের দোকান, পাড়া-মহল্লার মোড়, ফুটপাত ও ভ্যানগাড়িতেও কাটিমন বিক্রি হচ্ছে। ধানমন্ডির সাতমসজিদ সড়কের এক ফল বিক্রেতার হিসাবে, তাঁর দোকানে প্রতিদিন প্রায় ৪০ কেজি কাটিমন বিক্রি হয়। ভালো মানের কাটিমন প্রতি কেজি ২৫০ থেকে ২৮০ টাকা এবং ছোট আম ১৮০ থেকে ২০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। ফুটপাত ও ভ্যানে ১৬০ টাকা কেজির আমগুলো তুলনামূলক নিম্নমানের বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
অনলাইনেও কাটিমনের বাজার তৈরি হয়েছে। ফেসবুক, ইউটিউবসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চাষি ও ব্যবসায়ীরা সরাসরি ক্রেতাদের কাছে আম বিক্রি করছেন। চাঁপাইনবাবগঞ্জের আম উৎপাদক ও ব্যবসায়ী শাহিন আলম জানিয়েছেন, তিনি রাজধানীর পাইকারি বাজারসহ দেশের বিভিন্ন এলাকার ক্রেতাদের কাছে কাটিমন পাঠান। নিজের বাগানের পাশাপাশি অন্য বাগান থেকেও আম সংগ্রহ করেন তিনি। বর্তমানে প্রতিদিন প্রায় এক ট্রাক কাটিমন বিক্রি করেন।
কাটিমনের দ্রুত বিস্তার নিয়ে এটি ভবিষ্যতে আগ্রাসী প্রজাতিতে পরিণত হবে কি না, এমন প্রশ্নও উঠেছে। মেহেদী মাসুদের মতে, বাণিজ্যিক সম্ভাবনাসম্পন্ন জাতকে গুরুত্ব দেওয়ার পাশাপাশি দেশের নিজস্ব প্রজাতির সুরক্ষাকেও গুরুত্ব দিতে হবে। কাটিমনের ইতিবাচক বৈশিষ্ট্যগুলো কাজে লাগিয়ে দেশীয় জাতের সঙ্গে সংকরায়ণের মাধ্যমে নতুন ও ভালো জাত উদ্ভাবনের উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে বলে তিনি মনে করেন।
