কক্সবাজারের সুগন্ধা সৈকতের সক্রিয় বালিয়াড়ির ওপর চার লেনের সড়ক ও কংক্রিটের প্রতিরক্ষা বাঁধ নির্মাণ নিয়ে পরিবেশ ও উপকূল ব্যবস্থাপনা নিয়ে কাজ করা ব্যক্তিদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তাঁদের মতে, ১ দশমিক ২ কিলোমিটার দীর্ঘ ও ২৮ মিটার প্রশস্ত এই সড়ক নির্মাণে প্রাকৃতিক বালিয়াড়ি ও স্থানীয় উদ্ভিদ ধ্বংস হচ্ছে, যা উপকূলের প্রাকৃতিক সুরক্ষা ব্যবস্থা দুর্বল করতে পারে।
দ্য ডেইলি স্টারে প্রকাশিত এক বিশ্লেষণধর্মী লেখায় সাতজন লেখক দাবি করেছেন, সড়কটি উচ্চ জোয়ারের রেখা থেকে মাত্র ৪০ থেকে ৫০ ফুট দূরে নির্মাণ করা হচ্ছে। প্রকল্পটির প্রথম ধাপের জন্য জাপান ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সির (জাইকা) ৬৩ কোটি ৫০ লাখ টাকা ঋণ নেওয়া হয়েছে। দ্বিতীয় ধাপে বেল হ্যাচারি পর্যন্ত আরও অংশ নির্মাণে আনুমানিক ১০০ কোটি টাকা ব্যয়ের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
লেখকদের ভাষ্য, কক্সবাজার শহরে সমুদ্রের পানি ঢুকে জলাবদ্ধতা তৈরি হওয়ার চেয়ে পাহাড়ি ঢল ও বৃষ্টির পানি নিষ্কাশনের সমস্যাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। সমুদ্রের সমান্তরালে বড় কংক্রিটের দেয়াল নির্মাণ করলে পাহাড় থেকে নেমে আসা পানির স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হতে পারে বলেও তাঁরা আশঙ্কা করেছেন।
লেখাটিতে বলা হয়েছে, কক্সবাজারের বালিয়াড়ি শুধু বালুর স্তূপ নয়; ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের সময় এগুলো ঢেউয়ের শক্তি শোষণ করে উপকূলকে সুরক্ষা দেয়। বালিয়াড়ির ভেতরে থাকা উদ্ভিদও বালু স্থিতিশীল রাখতে ভূমিকা রাখে।
লেখকদের দাবি, সুগন্ধা সৈকতে ইতিমধ্যে ৮ থেকে ১০ ফুট উঁচু ১০ থেকে ১২টি বড় বালিয়াড়ি ভারী যন্ত্র দিয়ে সমতল করা হয়েছে। গভীর শিকড়ের স্থানীয় উদ্ভিদ সাগরলতাও উপড়ে ফেলা বা মাটিচাপা দেওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
লেখাটিতে আরও বলা হয়েছে, এসব বালিয়াড়ি লাল ভূত কাঁকড়া ও অলিভ রিডলি কচ্ছপের আবাসস্থল হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ। বালিয়াড়ি সমতল করার ফলে এসব প্রাণীর আবাস ও প্রজননক্ষেত্র ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে লেখকেরা মনে করছেন।
লেখকদের মতে, চার লেনের সড়কটি সমুদ্রের উচ্চ জোয়ারের রেখার খুব কাছ দিয়ে নির্মাণ করা হচ্ছে। অতীতে উপকূলের কাছাকাছি নির্মিত কিছু অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার উদাহরণও তাঁরা তুলে ধরেছেন।
২০২৫ সালের উচ্চ জোয়ারে সাবরাং ইকো ট্যুরিজম পার্কের একটি সড়ক ধসে পড়ার কথা উল্লেখ করে লেখাটিতে বলা হয়েছে, ওই এলাকায় ২০১৭ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে বালু ভরাট করে বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণ করা হয়েছিল। ২০২৪ সাল পর্যন্ত প্রকল্পটিতে সরকারি ব্যয় ২ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছিল বলে লেখাটিতে দাবি করা হয়েছে।
এর বিপরীতে কক্সবাজারের সামিতি পাড়ার উদাহরণ দেওয়া হয়েছে। লেখকদের মতে, সেখানে স্থায়ী ও কঠিন অবকাঠামো সরাসরি সমুদ্রসৈকতের পাশে নির্মাণ না করে প্রাকৃতিক ভূমিরূপ ও পানি প্রবাহের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বসতি ও সড়ক গড়ে উঠেছে। স্যাটেলাইট বিশ্লেষণের বরাত দিয়ে তাঁরা দাবি করেছেন, ১৯৯০ থেকে ২০১০ সালের মধ্যে সামিতি পাড়ায় ১৯ লাখ ৪০ হাজার বর্গমিটার এবং ২০১০ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে আরও ৮ লাখ ৯০ হাজার বর্গমিটার উপকূলীয় ভূমি বৃদ্ধি পেয়েছে।
কক্সবাজার-টেকনাফ উপকূলের ১০ হাজার ৪৬৫ হেক্টর এলাকাকে ১৯৯৯ সালে প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা (ইসিএ) ঘোষণা করা হয়েছিল বলে লেখাটিতে উল্লেখ করা হয়েছে। লেখকদের দাবি, এই এলাকার প্রাকৃতিক মাটি, পানি, ভূমি বা উদ্ভিদ-প্রাণীর আবাসস্থলের স্বাভাবিক অবস্থা পরিবর্তন করে এমন কর্মকাণ্ডের ওপর বিধিনিষেধ রয়েছে।
সড়ক নির্মাণের জন্য পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিবেশগত ছাড়পত্র নেওয়া হয়েছে কি না, তা নিয়েও লেখাটিতে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, কক্সবাজার পৌরসভা ছাড়পত্র থাকার দাবি করলেও পরিবেশ অধিদপ্তর জানিয়েছে, তারা একটি বিদ্যমান সড়কের ৯ মিটার প্রশস্ত রক্ষণাবেক্ষণ পরিকল্পনার অনুমোদন দিয়েছিল।
লেখকদের ভাষ্য, সেই অনুমোদন ব্যবহার করে ২৮ মিটার প্রশস্ত চার লেনের সড়ক নির্মাণ করা হলে তা অনুমোদনের পরিধির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে না।
লেখাটিতে ২০১৯ সালের ৯ ডিসেম্বর হাইকোর্টের একটি নির্দেশনার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে কক্সবাজারের ১২০ কিলোমিটার সমুদ্রসৈকত থেকে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের পাশাপাশি পৌর এলাকায় উচ্চ জোয়ারের রেখা থেকে ৩০০ মিটারের মধ্যে অবকাঠামো নির্মাণে নিষেধাজ্ঞার কথা বলা হয়েছে।
এ ছাড়া ২০১৩ সালের কক্সবাজার মাস্টারপ্ল্যানে আন্তঃজোয়ার অঞ্চল থেকে প্রথম ৩০০ মিটার এলাকাকে ‘নো ডেভেলপমেন্ট জোন’ হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছিল বলে লেখাটিতে উল্লেখ করা হয়েছে। লেখকদের দাবি, সুগন্ধা সৈকতে নির্মাণকাজটি উচ্চ জোয়ারের রেখা থেকে মাত্র ৪০ থেকে ৫০ ফুট দূরে হওয়ায় এসব নির্দেশনা ও পরিকল্পনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
লেখকদের মতে, কালাতলীর পেছনে বিদ্যমান একটি সড়ক প্রশস্ত করার সুযোগ ছিল। বাতিল হওয়া সরকারি জমি রাষ্ট্রের খাস জমি হিসেবে ফিরে আসার পর সেগুলো ব্যবহার করে ওই সড়ক সম্প্রসারণ করা যেত বলেও তাঁরা উল্লেখ করেছেন।
তাঁদের প্রশ্ন, তুলনামূলক কম ব্যয় ও পরিবেশগত ক্ষতির সম্ভাবনাযুক্ত এই বিকল্প বাদ দিয়ে সক্রিয় সৈকতের ওপর ব্যয়বহুল অবকাঠামো নির্মাণের সিদ্ধান্ত কেন নেওয়া হলো।
লেখাটিতে যুক্তরাষ্ট্র, নেদারল্যান্ডস ও নিউজিল্যান্ডে বালিয়াড়ি পুনর্গঠন এবং উপকূল রক্ষায় প্রাকৃতিক পদ্ধতি ব্যবহারের উদাহরণও তুলে ধরা হয়েছে। শ্রীলঙ্কায় উপকূল থেকে অবকাঠামো নির্মাণের দূরত্ব নির্ধারণে নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থা থাকার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
লেখকেরা মনে করেন, উপকূল রক্ষা ও উন্নয়নকে পরস্পরবিরোধী হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। তাঁদের মতে, দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের জন্য উপকূলের প্রাকৃতিক ব্যবস্থা সংরক্ষণ করা জরুরি।
তাঁরা সুগন্ধা-কালাতলী সৈকত সড়কের নির্মাণকাজ অবিলম্বে বন্ধ করা, সমতল করা বালিয়াড়ি পুনরুদ্ধার এবং সাগরলতাসহ স্থানীয় উপকূলীয় উদ্ভিদ পুনরায় রোপণের আহ্বান জানিয়েছেন।
লেখাটিতে বাংলাদেশের সংবিধানের ১৮(ক) অনুচ্ছেদের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। লেখকদের মতে, পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য, জলাভূমি, বন ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে রাষ্ট্রের সাংবিধানিক দায়িত্ব রয়েছে। তাঁদের বক্তব্য, কক্সবাজারের উপকূলকে জীবন্ত প্রাকৃতিক ব্যবস্থা হিসেবে সংরক্ষণ করেই উন্নয়ন পরিকল্পনা করা প্রয়োজন।
