কর্মীদের কর্মঘণ্টা ও উৎপাদনশীলতা পর্যবেক্ষণে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ছে। এতে শুধু কাজের ফল নয়, কিবোর্ডে চাপ দেওয়ার সংখ্যা, মাউসের নড়াচড়া, কম্পিউটার সক্রিয় থাকার সময় কিংবা এআই ব্যবহারের মাত্রাও অনেক ক্ষেত্রে বিবেচনায় আসছে। ফলে কর্মীদের সামনে ভালো কাজ করার পাশাপাশি সেই কাজটি নজরদারি ব্যবস্থায় কীভাবে প্রতিফলিত হচ্ছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
ওয়ার্ল্ড স্ট্রিট জার্নালের ২০ আগস্টের প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে জানা যায়, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোতে কর্মী নজরদারি ব্যবস্থা বিশেষভাবে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। অন্যান্য সাদা-কলারের প্রতিষ্ঠানও কর্মীরা অফিসের সময় কীভাবে ব্যয় করছেন, তা বিশ্লেষণে এ ধরনের প্রযুক্তি ব্যবহার করছে। কিছু অঙ্গরাজ্যে কর্মীদের নজরদারির বিষয়টি জানানোও বাধ্যতামূলক নয়।
বাড়ি থেকে কাজের সময় কর্মীদের ওপর নজরদারি শুরু হলেও বর্তমানে এ প্রযুক্তির ব্যবহার অফিসকেন্দ্রিক কাজেও বিস্তৃত হয়েছে। আগে যেখানে ব্যবস্থাপক সরাসরি কর্মীদের পর্যবেক্ষণ করতেন, এখন অনেক ক্ষেত্রে সেই দায়িত্ব পালন করছে অ্যালগরিদম।
মেটার সাবেক কয়েকজন কর্মী একটি মামলায় অভিযোগ করেছেন, মে মাসে প্রতিষ্ঠানটি প্রায় ১০ শতাংশ কর্মী ছাঁটাইয়ের প্রক্রিয়ায় এআইভিত্তিক অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থার একটি সমন্বিত নেটওয়ার্ক ব্যবহার করেছিল। তবে মেটার দাবি, ছাঁটাইয়ের সিদ্ধান্ত মানুষই নিয়েছে।
এ পরিস্থিতিতে কর্মীরা কতটা মনোযোগ দিয়ে কাজ করছেন, তা পরিমাপের জন্য বিভিন্ন ডিজিটাল সূচকের ওপর নির্ভরতা বাড়ছে। ফলে একজন কর্মীর প্রকৃত উৎপাদনশীলতার পাশাপাশি তার ‘অ্যাক্টিভিটি’ও প্রতিষ্ঠানের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
নজরদারি ব্যবস্থার ভুল ব্যাখ্যা এড়াতে কর্মীদের নিয়মিত ক্যালেন্ডারে বৈঠক, ফোনকল ও অন্যান্য কাজের তথ্য রাখার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
কোনো কর্মী সরাসরি বৈঠকে থাকলে বা ফোনে কথা বললে তার অনলাইন স্ট্যাটাস নিষ্ক্রিয় দেখাতে পারে। কিন্তু সেই কার্যক্রম ক্যালেন্ডারে উল্লেখ থাকলে কর্মী নজরদারি ব্যবস্থা বুঝতে পারে যে ওই সময় তিনি কাজেই ব্যস্ত ছিলেন। বিপরীতে, কোনো কার্যক্রমের তথ্য না থাকলে একই সময়কে নিষ্ক্রিয়তা হিসেবে গণ্য করা হতে পারে।
কর্মীদের পুরো কর্মদিবস কম্পিউটারে সক্রিয় থাকার প্রয়োজন নেই। ইনসাইটফুলের প্রধান নির্বাহী ইভান পেত্রোভিচের মতে, প্রতিষ্ঠানগুলো সাধারণত কর্মীদের দিনের ৬০ থেকে ৮০ শতাংশ সময় কাজের সঙ্গে যুক্ত থাকার প্রত্যাশা করে।
অর্থাৎ কাজের ফাঁকে স্বাভাবিক বিরতি নেওয়া অস্বাভাবিক নয়। বরং কৃত্রিমভাবে সক্রিয়তার হার বাড়ানোর চেষ্টা করলে উল্টো সন্দেহ তৈরি হতে পারে।
কর্মীদের কেউ কেউ মাউস জিগলার বা এ ধরনের সফটওয়্যার ব্যবহার করে কম্পিউটারে কৃত্রিমভাবে মাউসের নড়াচড়া বজায় রাখেন। এর ফলে কর্মী ডেস্কে না থাকলেও কম্পিউটার সক্রিয় বলে মনে হতে পারে।
তবে করপোরেট সাইবার নিরাপত্তা ব্যবস্থা ক্রমেই এ ধরনের সফটওয়্যার ও ডিভাইস শনাক্ত ও ব্লক করতে সক্ষম হচ্ছে। কর্মী নজরদারি ব্যবস্থাও এগুলো শনাক্ত করতে পারে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
কর্মীদের উৎপাদনশীলতা মূল্যায়নে এআই ব্যবহারের পরিমাণও একটি নতুন সূচক হয়ে উঠছে। প্রতিষ্ঠানের কাছে নতুন প্রযুক্তি গ্রহণে কর্মীর আগ্রহ গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় কেউ কেউ নিজেদের এআই ব্যবহারের মাত্রা বাড়িয়ে উপস্থাপন করছেন।
ভিজিয়েরের প্রধান গবেষক আন্দ্রেয়া ডারলার বলেন, কর্মীদের মধ্যে নিজেদের প্রতিষ্ঠানের কাছে প্রাসঙ্গিক হিসেবে তুলে ধরতে এআই ব্যবহারের মাত্রা বাড়িয়ে বলার প্রবণতা রয়েছে। ভিজিয়েরের এক হাজার মার্কিন কর্মীর ওপর করা সাম্প্রতিক জরিপে ৪৮ শতাংশ কর্মী স্বীকার করেছেন, তারা নিজেদের এআই ব্যবহারের মাত্রা বাড়িয়ে বলেছেন।
তবে অতিরিক্ত এআই ব্যবহারও এখন সবসময় ইতিবাচক হিসেবে দেখা হচ্ছে না। প্রতিষ্ঠানগুলো এআই ব্যবহারের খরচ ও টোকেন ব্যবহারের দিকেও নজর দিচ্ছে। ফলে প্রয়োজন ছাড়া এআই ব্যবহার করলে সেটি উৎপাদনশীলতার বদলে অপচয় হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
কর্মক্ষেত্রে নিজের ব্যস্ততা প্রদর্শনের সংস্কৃতি নতুন নয়। আগে কর্মীর ব্যস্ততা মূল্যায়ন করতেন ব্যবস্থাপক; এখন সেই মূল্যায়নের একটি বড় অংশ চলে যাচ্ছে প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থার হাতে।
কিবোর্ডে কতবার চাপ দেওয়া হচ্ছে, মাউস কতটা নড়ছে, কম্পিউটার কতক্ষণ সক্রিয় থাকছে কিংবা এআই কতটা ব্যবহার করা হচ্ছে—এ ধরনের তথ্যের ভিত্তিতে কর্মীর কাজের একটি চিত্র তৈরি হচ্ছে।
ফলে কর্মীদের জন্য চ্যালেঞ্জ এখন শুধু ভালো কাজ করা নয়; তাদের কাজ যেন নজরদারি ব্যবস্থার কাছেও যথাযথভাবে প্রতিফলিত হয়, সেটিও বিবেচনায় রাখতে হচ্ছে।
