এলসি ছাড়াই আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্য বিক্রির সুযোগ, উপকৃত হবেন কৃষক ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা
বাংলাদেশকে বৈশ্বিক ডিজিটাল বাণিজ্যের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত করতে আন্তসীমান্ত বা ক্রস-বর্ডার ডিজিটাল বাণিজ্য নীতিমালা প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। নীতিমালাটি অনুমোদন পেলে দেশের কৃষক, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ীরা ব্যাংকিং জটিলতা এবং মধ্যস্বত্বভোগী ছাড়াই বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ক্রেতাদের কাছে সরাসরি পণ্য বিক্রির সুযোগ পাবেন।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ‘ক্রস-বর্ডার ডিজিটাল বাণিজ্য নীতিমালা-২০২৬’-এর খসড়া ইতোমধ্যে প্রস্তুত করা হয়েছে। প্রয়োজনীয় পর্যালোচনা ও সংশোধনের পর এটি চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হবে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই নীতিমালা কার্যকর হলে বাংলাদেশের ডিজিটাল অর্থনীতি এবং রপ্তানি খাতের জন্য নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হবে।
বর্তমানে আন্তর্জাতিক ই-কমার্স বাজার দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে। বিশ্বের বিপুলসংখ্যক মানুষ অনলাইনে কেনাকাটা করছেন এবং খুচরা বাণিজ্যের একটি বড় অংশ ডিজিটাল মাধ্যমে সম্পন্ন হচ্ছে।
নতুন নীতিমালার আওতায় বাংলাদেশের উদ্যোক্তারা নিজেদের উৎপাদিত পণ্য সরাসরি বিদেশি ক্রেতার কাছে বিক্রি করতে পারবেন। একইভাবে বিদেশি ভোক্তারাও বাংলাদেশি পণ্য অনলাইনের মাধ্যমে অর্ডার করার সুযোগ পাবেন।
ফলে আম, কাঁঠাল, পেয়ারা, জামদানি, হস্তশিল্প, পোশাক এবং অন্যান্য দেশীয় পণ্যের আন্তর্জাতিক বাজার সম্প্রসারণের সম্ভাবনা তৈরি হবে।
বর্তমানে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা বিদেশে ছোট পরিসরে পণ্য পাঠাতে গিয়ে নানা জটিলতার মুখোমুখি হন। অনেক ক্ষেত্রে প্রচলিত ব্যাংকিং ব্যবস্থার বাইরে অর্থ লেনদেন সম্পন্ন হয়, যা আনুষ্ঠানিক অর্থনীতির জন্য চ্যালেঞ্জ তৈরি করে।
অন্যদিকে বাংলাদেশের ভোক্তারাও আন্তর্জাতিক ই-কমার্স প্ল্যাটফর্ম থেকে সরাসরি পণ্য কেনার ক্ষেত্রে অর্থ পরিশোধ ও অন্যান্য প্রক্রিয়াগত সমস্যার সম্মুখীন হন। নতুন নীতিমালার মাধ্যমে এসব সীমাবদ্ধতা দূর করার লক্ষ্য নিয়েছে সরকার।
খসড়া নীতিমালায় অনলাইন লেনদেন নিরাপদ করতে ক্রস-বর্ডার এস্ক্রো সার্ভিস চালুর প্রস্তাব রাখা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে এই ব্যবস্থা পরিচালিত হবে।
এ ছাড়া দেশীয় পণ্যের রপ্তানি বাড়াতে বিভিন্ন ধরনের নীতিগত সহায়তা, বিদেশে প্রসেসিং সেন্টার ও গুদাম স্থাপনের সুযোগ এবং আন্তর্জাতিক বিপণন সুবিধা দেওয়ার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
নীতিমালায় নকল ও ভেজাল পণ্যের বাণিজ্য, অনলাইন জুয়া, বেটিং এবং অনুমোদনহীন ডিজিটাল অর্থভিত্তিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ করার প্রস্তাব রাখা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই নীতিমালা কার্যকর হলে অ্যামাজন, আলিবাবা, বেস্টবাইসহ আন্তর্জাতিক ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মে বাংলাদেশি পণ্যের প্রবেশ সহজ হবে।
একই সঙ্গে দেশীয় ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানগুলোও বিদেশি বাজারে ব্যবসা সম্প্রসারণের সুযোগ পাবে। এতে ‘মেইড ইন বাংলাদেশ’ ব্র্যান্ডের পরিচিতি ও গ্রহণযোগ্যতা বাড়বে।
বিশেষ করে জামদানি, হস্তশিল্প, চামড়াজাত পণ্য, কৃষিপণ্য এবং ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের উৎপাদিত পণ্যের আন্তর্জাতিক বাজার সম্প্রসারণে ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, আন্তসীমান্ত ডিজিটাল বাণিজ্য চালু হলে রপ্তানি বহুমুখীকরণে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে। ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা বৈশ্বিক বাজারে প্রবেশের সুযোগ পাবেন এবং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের নতুন খাত তৈরি হবে।
এ ছাড়া গ্রামীণ পর্যায়ের কৃষক ও উৎপাদকরা সরাসরি আন্তর্জাতিক ক্রেতার সঙ্গে যুক্ত হতে পারলে মধ্যস্বত্বভোগীর ওপর নির্ভরতা কমবে এবং ন্যায্য মূল্য পাওয়ার সম্ভাবনা বাড়বে।
বাণিজ্য খাতের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করছেন, নীতিমালাটি বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের ডিজিটাল বাণিজ্য খাতে একটি বড় পরিবর্তন আসবে। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য এটি নতুন বাজার সৃষ্টির সুযোগ এনে দেবে।
তাদের মতে, আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কাছে সরাসরি পৌঁছানোর সুযোগ তৈরি হলে দেশীয় পণ্যের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়বে এবং রপ্তানি আয় বৃদ্ধিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।
ডিজিটাল অর্থনীতির যুগে বৈশ্বিক ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মে সক্রিয় অংশগ্রহণ বাংলাদেশের জন্য সময়োপযোগী পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। প্রস্তাবিত ক্রস-বর্ডার ডিজিটাল বাণিজ্য নীতিমালা অনুমোদিত হলে দেশের কৃষক, উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ীদের জন্য আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে এবং ডিজিটাল বাণিজ্যে বাংলাদেশের অবস্থান আরও শক্তিশালী হবে।
