অধিকৃত পশ্চিম তীরের জর্ডান উপত্যকায় ইসরায়েলের নতুন ‘ক্রিমসন থ্রেড’ সামরিক বাধা নির্মাণ প্রকল্পকে ঘিরে স্থানীয় ফিলিস্তিনিদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। বাসিন্দাদের অভিযোগ, এই প্রকল্পের ফলে কৃষিজমি, পানির উৎস ও যোগাযোগ ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং বহু পরিবার বাস্তুচ্যুত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়েছে।
উত্তর জর্ডান উপত্যকার রাস আল-আহমার গ্রামের বাসিন্দা থায়ের বিশারাত জানান, আগে মূল সড়ক থেকে তার বাড়িতে পৌঁছাতে ১০ মিনিটেরও কম সময় লাগত। বর্তমানে বিভিন্ন প্রবেশপথ বন্ধ থাকায় সেই পথ পাড়ি দিতে কয়েক ঘণ্টা সময় লাগছে। তার ভাষায়, “আমি এখন সাধারণ কোনো কাজেও বের হতে পারি না। আগে তামুন গ্রাম থেকে এখানে আসতে ১০ মিনিট লাগত, এখন অন্তত এক ঘণ্টা লাগে।”
স্থানীয়দের দাবি, ইসরায়েলি সেনা ও বসতি স্থাপনকারীরা এলাকায় চলাচল নিয়ন্ত্রণ করছে। সম্প্রতি আল-বুকাইয়া সমভূমিতে অভিযান চালিয়ে তিনটি কূপ ধ্বংস করা হয়েছে, যার মধ্যে একটি ছিল বিশারাতের আত্মীয়ের মালিকানাধীন। একই সঙ্গে সেচব্যবস্থা, পাইপলাইন ও কৃষি অবকাঠামোরও ক্ষতি হয়েছে।
২০২৫ সালে ঘোষিত ‘ক্রিমসন থ্রেড’ প্রকল্পের প্রথম ধাপে আইন শিবলি ও তায়াসির চেকপয়েন্টের মধ্যে প্রায় ২২ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি পরিখা ও সামরিক সড়ক নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়। ইসরায়েল বলছে, এর উদ্দেশ্য জর্ডান সীমান্ত দিয়ে অস্ত্র চোরাচালান প্রতিরোধ করা। তবে সমালোচকদের মতে, প্রকল্পটির বড় অংশ অধিকৃত পশ্চিম তীরের অভ্যন্তরে নির্মিত হচ্ছে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, ভবিষ্যতে এই বাধার দৈর্ঘ্য প্রায় ৫০০ কিলোমিটারে উন্নীত হতে পারে। এতে হাজার হাজার হেক্টর ফিলিস্তিনি জমি কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
গত ৮ মার্চ ইসরায়েলি সামরিক কমান্ডার গিলাদ শ্রিকি কয়েকটি ফিলিস্তিনি এলাকায় গিয়ে বাসিন্দাদের এলাকা ছাড়ার সতর্কবার্তা দিয়েছেন বলে স্থানীয়দের দাবি। এরপর গত মাসে ইসরায়েলের সুপ্রিম কোর্ট প্রকল্পটির নির্মাণকাজ চালিয়ে যাওয়ার অনুমোদন দিলে কার্যক্রম আরও জোরদার হয়।
ইসরায়েলি এনজিও কেরেম নাভোটের গবেষক দ্রোর এটকেস বলেন, প্রকল্পটি দীর্ঘদিনের ভূমি নিয়ন্ত্রণ নীতির নতুন ধাপ। তার মতে, চেকপয়েন্ট, বসতি সম্প্রসারণ ও সামরিক অঞ্চল ঘোষণার পাশাপাশি এখন জমি অধিগ্রহণ, সম্পত্তি জব্দ এবং প্রবেশাধিকার সীমিত করার প্রবণতা আরও বেড়েছে।
ওয়াল রেজিস্ট্যান্স কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসেই ৪৯টি সামরিক ভূমি অধিগ্রহণ আদেশ জারি করা হয়েছে, যা ২০২৫ সালের পুরো বছরের ৪৭টি আদেশের সংখ্যাকেও ছাড়িয়ে গেছে।
এটকেসের মতে, এই বাধা একদিকে ফিলিস্তিনিদের কৃষিজমিতে প্রবেশ সীমিত করছে, অন্যদিকে বিদ্যমান ইসরায়েলি বসতিগুলোকে নতুন আউটপোস্টের সঙ্গে সংযুক্ত করছে। তার ধারণা, এতে অতিরিক্ত ৮ থেকে ৯ হাজার ডুনাম কৃষিজমি প্রভাবিত হতে পারে।
আল-মালেহ গ্রাম পরিষদের প্রধান মাহদি দারাঘমেহ বলেন, বসতি স্থাপনকারীদের হামলা ও আতঙ্কের কারণে বহু পরিবার এলাকা ছেড়ে যেতে বাধ্য হয়েছে। তার দাবি, অন্তত ১৩০টি পরিবার ইতোমধ্যে বাস্তুচ্যুত হয়েছে এবং তারা তাদের ঘরবাড়ি, জমি ও জীবিকার উৎস হারিয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, সুপ্রিম কোর্টের রায়ের পর প্রায় প্রতিদিনই পানি সরবরাহ বন্ধ, জলাধার ধ্বংস, ট্রাক্টর ও কৃষি সরঞ্জাম জব্দের মতো ঘটনা ঘটছে। একই সময়ে নতুন বসতি স্থাপনকারীরা রাস আল-আহমারের পূর্বাঞ্চলে অবস্থান নেওয়া শুরু করেছে।
বিশারাত জানান, ১৬ জুন তার বন্ধু বিলাল বানি উদেহর খামারের অবকাঠামো বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। এলাকা ছাড়তে অস্বীকৃতি জানালে পরে তিনি হামলার শিকার হন। বিশারাতের ভাষায়, “সে প্রায় মারা যাচ্ছিল। হামলার পর তারা তার সবকিছু নিয়ে গেছে।”
১৪ জুলাই শুধু একদিনেই আল-বুকাইয়া এলাকায় তিনটি কূপ ধ্বংস করা হয়েছে বলে স্থানীয়দের দাবি। আতুফ গ্রাম পরিষদের হিসাব অনুযায়ী, ওই দিনের ক্ষতির পরিমাণ ৪০ লাখ শেকেলেরও বেশি, যা প্রায় ১৩ লাখ মার্কিন ডলারের সমান।
মাহদি দারাঘমেহ সতর্ক করে বলেন, পরিখার নির্মাণ শেষ হলে গ্রামগুলো একে অপরের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে। হাসপাতাল, জরুরি সেবা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পৌঁছানো কঠিন হয়ে যাবে। তার ভাষায়, “এই পরিখা সম্পূর্ণ হলে এখানকার মানুষ কার্যত একটি কারাগারের মধ্যে বসবাস করবে।”
অন্যদিকে, কয়েক সপ্তাহ ধরে পানি সরবরাহ বন্ধ থাকায় বিশারাতকে এখন একটি পানির ট্যাংকের জন্য ৩০০ শেকেলের বেশি ব্যয় করতে হচ্ছে, যা আগের তুলনায় তিন গুণেরও বেশি। তার দাবি, কৃষি উৎপাদন প্রায় ৯০ শতাংশ কমে গেছে এবং অনেক পরিবার তাদের গবাদিপশুর অর্ধেক হারিয়েছে।
ইসরায়েলের সরকারি যুক্তি নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, “এটি সামরিক সড়ক নয়। সামরিক সড়কের জন্য কেউ আড়াই বা তিন মিটার গভীর পরিখা খনন করে না।”
ফিলিস্তিনিদের প্রতি আচরণ প্রসঙ্গে ক্ষোভ প্রকাশ করে বিশারাত বলেন, “মানবাধিকারও চাই না, অন্তত যেসব প্রাণীর অধিকার নিয়ে এত কথা বলা হয়, সেই অধিকারগুলো আমাদের দিন।”
