চট্টগ্রামের আনোয়ারায় ৭৮৩ একর জমিতে নির্মিতব্য চীনা অর্থনৈতিক ও শিল্পাঞ্চলে প্রায় ১৩০ কোটি মার্কিন ডলারের বিনিয়োগ এবং প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে এক লাখের বেশি মানুষের কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। তবে এ সম্ভাবনা বাস্তবায়নে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানি, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং দ্রুত বিনিয়োগসেবা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা।
প্রস্তাবিত শিল্পাঞ্চলটি চট্টগ্রাম বন্দর, কর্ণফুলী টানেল, শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এবং নির্মাণাধীন মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরের মধ্যবর্তী কৌশলগত অবস্থানে গড়ে তোলা হচ্ছে। বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) তথ্য অনুযায়ী, এই প্রকল্পে মোট ১৩০ কোটি মার্কিন ডলার বা প্রায় ১৬ হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ আসতে পারে।
দীর্ঘ প্রায় এক দশক পর গত সোমবার আনুষ্ঠানিকভাবে শিল্পাঞ্চলটির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়েছে। যদিও প্রকল্পের নির্ধারিত বাস্তবায়নকাল শুরু হবে আগামী বছরের জানুয়ারি থেকে। অবকাঠামো নির্মাণের কাজ ২০৩১ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে শেষ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
বাংলাদেশ ও চীন সরকার ২০১৬ সালে চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের ঢাকা সফরের সময় এ অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার বিষয়ে সমঝোতায় পৌঁছায়। তবে ডেভেলপার নির্বাচন, অর্থায়ন এবং চুক্তির বিভিন্ন শর্ত নিয়ে জটিলতার কারণে প্রকল্পটি দীর্ঘদিন অগ্রগতি পায়নি।
প্রাথমিকভাবে চায়না হারবার ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানিকে ডেভেলপার হিসেবে বিবেচনা করা হলেও সেই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হয়নি। পরে ২০২২ সালে চায়না রোড অ্যান্ড ব্রিজ করপোরেশন (সিআরবিসি) নতুন ডেভেলপার হিসেবে মনোনীত হয়। গত জুনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরের সময় বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা) ও সিআরবিসির মধ্যে ডেভেলপার চুক্তি বিনিময় করা হয়।
এর আগে ১৬ জুন জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) প্রকল্পটির সহায়ক অবকাঠামো নির্মাণে ৪ হাজার ১৮৯ কোটি ৪৬ লাখ টাকার প্রকল্প অনুমোদন দেয়। এর মধ্যে ১ হাজার ৭২২ কোটি টাকা সরকার বহন করবে এবং অবশিষ্ট ২ হাজার ৪৬৭ কোটি টাকা বিদেশি ঋণসহায়তার মাধ্যমে সংগ্রহ করা হবে।
নতুন শিল্পাঞ্চলের অন্যতম প্রধান সুবিধা এর ভৌগোলিক অবস্থান। কর্ণফুলী টানেলের মাধ্যমে এটি সরাসরি চট্টগ্রাম বন্দরের সঙ্গে যুক্ত। পাশাপাশি আনোয়ারা থেকে বাঁশখালী, পেকুয়া হয়ে মাতারবাড়ী পর্যন্ত নতুন সড়ক নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। সড়কটি সম্পন্ন হলে শিল্পাঞ্চলটি ভবিষ্যতের মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর এবং চট্টগ্রাম বন্দরের সঙ্গে সমন্বিত শিল্প ও পণ্য পরিবহনব্যবস্থার অংশ হয়ে উঠবে।
তবে ব্যবসায়ীরা মনে করছেন, কেবল অনুকূল অবস্থানই যথেষ্ট নয়। একই সঙ্গে সড়ক যোগাযোগ, গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানি সরবরাহ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং দ্রুত বিনিয়োগসেবা নিশ্চিত করতে না পারলে প্রকল্পটির পূর্ণ সম্ভাবনা কাজে লাগানো সম্ভব হবে না।
প্রকল্পের আওতায় ২০ হাজার ডেডওয়েট টন ধারণক্ষমতার জাহাজ ভিড়তে পারে—এমন একটি বহুমুখী জেটি নির্মাণ করা হবে। পাশাপাশি ১ হাজার ২৩৫ মিটার দীর্ঘ জেটি সংযোগ সড়ক, একটি সেতু এবং ১ হাজার ১৮১ মিটার দীর্ঘ চার লেনের সড়ক নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে।
এ ছাড়া প্রতিদিন ২ কোটি ৫০ লাখ লিটার তরল বর্জ্য শোধনের সক্ষমতাসম্পন্ন কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার (সিইটিপি), গ্যাস সঞ্চালন লাইন, দুটি বিদ্যুৎ উপকেন্দ্র, পানি সংরক্ষণাগার, কঠিন বর্জ্য সংগ্রহ কেন্দ্র এবং প্রায় ১২ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমানাপ্রাচীর নির্মাণ করা হবে।
বেজার লক্ষ্য, প্রথম তিন বছরের মধ্যেই শিল্পাঞ্চলের অন্তত ৬০ শতাংশ প্লট কারখানা নির্মাণের উপযোগী করে তোলা, যাতে ২০৩০ সালের মধ্যে উল্লেখযোগ্য অংশে শিল্পকারখানা স্থাপন সম্ভব হয়।
কর্ণফুলী টানেল চালুর পর মিরসরাই থেকে আনোয়ারা হয়ে কক্সবাজার পর্যন্ত উপকূলীয় অঞ্চলে একটি নতুন শিল্প করিডর গড়ে ওঠার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। ইতোমধ্যে আনোয়ারা-চন্দনাইশ সড়ক চার লেনে উন্নীত করার প্রকল্প অনুমোদন পেয়েছে। পাশাপাশি কালাবিবির দিঘি থেকে বাঁশখালী, পেকুয়ার টইটং হয়ে মাতামুহুরী পর্যন্ত ৫৮ কিলোমিটার আঞ্চলিক মহাসড়ক প্রশস্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যা মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরের সঙ্গে যোগাযোগ আরও সহজ করবে।
২০৩০ সালের মধ্যে মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর চালু এবং ২০৩১ সালে চীনা অর্থনৈতিক অঞ্চলের অবকাঠামো নির্মাণ শেষ হলে বন্দর, সড়ক ও শিল্পাঞ্চলের মধ্যে সমন্বিত যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে ওঠার সুযোগ সৃষ্টি হবে।
কর্ণফুলী টানেল চালুর আগে ধারণা করা হয়েছিল, দক্ষিণ চট্টগ্রামে শিল্পায়ন বাড়লে টানেলটি পণ্য পরিবহনের একটি গুরুত্বপূর্ণ রুটে পরিণত হবে। বর্তমানে প্রত্যাশিত যানবাহন চলাচল না হলেও শিল্পাঞ্চলের কারখানাগুলো চালু হলে কাঁচামাল ও প্রস্তুত পণ্য পরিবহনে টানেলটির ব্যবহার উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে। তবে এ জন্য অবকাঠামো নির্মাণ ও শিল্প উৎপাদন শুরু হওয়া পর্যন্ত আরও কয়েক বছর অপেক্ষা করতে হবে।
ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন অনুষ্ঠানে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন,
“আনোয়ারার এই শিল্পাঞ্চলে শেষ পর্যন্ত ১০০ কোটি ডলারের বেশি বিনিয়োগ হবে। এর প্রভাব শুধু আনোয়ারায় সীমাবদ্ধ থাকবে না, পুরো দক্ষিণ চট্টগ্রামের অর্থনীতিতে পড়বে।”
চট্টগ্রাম চেম্বারের সভাপতি আমিরুল হক বলেন,
“এই শিল্পাঞ্চলের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো বন্দরের কাছাকাছি অবস্থান। তবে শুরুতে এমন শিল্প স্থাপনে উৎসাহ দেওয়া দরকার, যেগুলোর জন্য গ্যাসের প্রয়োজন হয় না। সময়মতো অবকাঠামো ও সেবা নিশ্চিত করা গেলে এটি চট্টগ্রাম বন্দর, কর্ণফুলী টানেল ও মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরকে ঘিরে গড়ে ওঠা সম্ভাব্য শিল্প করিডরের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে।”
