জুলাই গণ-অভ্যুত্থান কেবল একটি রাজনৈতিক ঘটনা নয়; এটি বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসে জনআকাঙ্ক্ষা, আত্মত্যাগ এবং পরিবর্তনের দাবির এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। তবে আন্দোলনের দুই বছর পর সেই অভ্যুত্থানের উত্তরাধিকার, রাজনৈতিক ব্যাখ্যা এবং বাস্তব অর্জন নিয়ে নতুন করে বিতর্ক ও মূল্যায়ন সামনে এসেছে।
গবেষক ও সাংবাদিক তাহমিদাল জামি তাঁর বিশ্লেষণে বলেছেন, জুলাইয়ের স্মৃতি এখন শুধু শহীদদের আত্মত্যাগে নয়, বরং মানুষের অপূর্ণ প্রত্যাশা ও রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষার মধ্যেও বেঁচে আছে। তাঁর মতে, বিভিন্ন রাজনৈতিক পক্ষ নিজেদের অবস্থান থেকে জুলাইয়ের ব্যাখ্যা দাঁড় করানোর চেষ্টা করায় আন্দোলনের মূল চেতনা অনেকাংশেই বিভক্ত ও বিতর্কিত হয়ে উঠেছে।
লেখকের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, জুলাই গণ-অভ্যুত্থান আকস্মিক কোনো বিস্ফোরণ ছিল না। দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক বৈষম্য, বেকারত্ব, রাজনৈতিক দমন-পীড়ন এবং গণতান্ত্রিক পরিসর সংকুচিত হওয়ার ধারাবাহিক প্রক্রিয়ার ফল হিসেবেই এ আন্দোলনের জন্ম।
তিনি উল্লেখ করেন, গত দেড় দশকে চাকরিহীন প্রবৃদ্ধি, তরুণদের অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং সামাজিক বৈষম্য মানুষের মধ্যে ক্ষোভ জমতে থাকে। একই সময়ে নির্বাচনী ও বিচারিক ব্যবস্থার প্রতি আস্থাহীনতাও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।
বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, শাহবাগ আন্দোলন, হেফাজতের কর্মসূচি, নিরাপদ সড়ক আন্দোলন, শ্রমিকদের দাবি, নারীবাদী আন্দোলনসহ বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক আন্দোলন ক্রমেই জনমনে পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা তৈরি করেছিল। এসব ঘটনার মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার প্রতি মানুষের আস্থার সংকট আরও গভীর হয়।
তাহমিদাল জামির মতে, জুলাই আন্দোলনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল এর বহুমাত্রিক অংশগ্রহণ। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণ, মাদ্রাসার শিক্ষার্থী, শ্রমিক, চাকরিজীবী এবং মধ্যবিত্ত—বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ এতে অংশ নেন।
তিনি বলেন, আন্দোলনটি কোনো একক রাজনৈতিক দলের নেতৃত্বে পরিচালিত হয়নি। বরং এটি অনুভূমিক (Horizontal) অংশগ্রহণের মাধ্যমে বিস্তৃত হয়েছিল।
লেখক মনে করেন, জুলাইয়ের রাজনৈতিক তাৎপর্য বোঝার জন্য কোনো নির্দিষ্ট নেতার বক্তব্যের চেয়ে দেয়ালচিত্র, স্লোগান এবং সাধারণ মানুষের দাবির দিকে নজর দেওয়া প্রয়োজন।
তিনি বিশেষভাবে উল্লেখ করেছেন আন্দোলনের বহুল আলোচিত স্লোগান—“লাখো শহীদের রক্তে কেনা, দেশটা কারও বাপের না।” তাঁর মতে, এই স্লোগান শুধু পরিবারতন্ত্র নয়, বরং ক্ষমতার একচেটিয়া মালিকানার ধারণাকেও প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
বিশ্লেষণে আরও বলা হয়েছে, আন্দোলনের পরই এর ব্যাখ্যা, অংশগ্রহণ এবং উত্তরাধিকারের প্রশ্নে মতভেদ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বিভিন্ন গোষ্ঠী আন্দোলনের কৃতিত্ব দাবি করতে শুরু করে, আবার কেউ কেউ এর অন্তর্ভুক্তির পরিধি সীমিত করারও চেষ্টা করে।
লেখকের দাবি, পরবর্তী সময়ে নারী, জাতিগত ও ধর্মীয় সংখ্যালঘু, বাউল, তরিকতপন্থীসহ বিভিন্ন গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সহিংসতার ঘটনা সামনে আসে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট থেকে ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশের ৯৭টি মাজারে হামলার তথ্য মাকাম সংস্থার জরিপে উঠে এসেছে।
তাহমিদাল জামির মতে, গণ-অভ্যুত্থানের অন্যতম লক্ষ্য ছিল একটি নতুন সামাজিক ও রাজনৈতিক বন্দোবস্ত প্রতিষ্ঠা। কিন্তু পরবর্তী সময়ে সেই ঐকমত্য দুর্বল হয়ে পড়ে এবং সংস্কার, সংবিধান পরিবর্তন ও রাষ্ট্রীয় পুনর্গঠন নিয়ে সমন্বিত রাজনৈতিক অবস্থান গড়ে ওঠেনি।
তিনি প্রশ্ন তোলেন, জুলাই-পরবর্তী সময়ে শ্রমিক, হকার, নিম্নআয়ের মানুষ, উপকূলবাসী, প্রান্তিক জনগোষ্ঠী ও শিক্ষার্থীদের জীবনমান উন্নয়নে কী ধরনের বাস্তব পরিবর্তন এসেছে।
লেখকের মতে, যেকোনো গণ-অভ্যুত্থানের মতো জুলাইয়েরও সম্ভাবনা ছিল এবং সেই সম্ভাবনা আংশিকভাবে অপূর্ণ থেকে গেছে। রাজনৈতিক মেরুকরণ, গোষ্ঠীকেন্দ্রিক সহিংসতা এবং সাংস্কৃতিক আক্রমণের কারণে ভবিষ্যৎমুখী জাতীয় ঐকমত্য দুর্বল হয়েছে।
সবশেষে তিনি বলেন, জুলাইয়ের স্মৃতিকে কেবল আনুষ্ঠানিক স্মরণে সীমাবদ্ধ না রেখে মানুষের দৈনন্দিন জীবন, অধিকার এবং ন্যায়বিচারের প্রশ্নে বাস্তব প্রয়োগের মধ্য দিয়েই এর প্রকৃত তাৎপর্য টিকে থাকবে। তাঁর মতে, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের ভবিষ্যৎ নিহিত রয়েছে মানুষের নিত্যদিনের সংগ্রাম ও বাস্তব জীবনের অনুবাদে, যেখানে জনগণের অধিকার ও মর্যাদাই হবে মূল ভিত্তি।
