২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের নেতৃত্ব নিয়ে পর্দার আড়ালে নানা আলোচনা ও মতপার্থক্য ছিল বলে জানিয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক এবং অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক আইন উপদেষ্টা অধ্যাপক আসিফ নজরুল। তাঁর দাবি, ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে বাদ দিয়ে অন্য কাউকে প্রধান উপদেষ্টা করার চেষ্টা হলেও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতারা সে প্রস্তাবে অনড়ভাবে আপত্তি জানান।
প্রথম আলোর সঙ্গে এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে আসিফ নজরুল বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের শুরু থেকেই তিনি আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। আওয়ামী লীগ সরকারের সমালোচক হিসেবে দীর্ঘদিন লেখালেখি, টকশো ও আন্দোলনে অংশ নেওয়ার পাশাপাশি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হওয়ায় শিক্ষার্থীদের সঙ্গে তাঁর নিয়মিত যোগাযোগ ছিল।
তিনি জানান, আন্দোলনের শেষ পর্যায়ে এসে তাঁর বিশ্বাস জন্মায় যে সরকার আর ক্ষমতায় টিকে থাকতে পারবে না। বিশেষ করে সেনাবাহিনী জনগণের বিরুদ্ধে অস্ত্র ব্যবহার করবে না—এমন বার্তা পাওয়ার পর পরিস্থিতি দ্রুত পরিবর্তনের দিকে যায়।
সাক্ষাৎকারে আসিফ নজরুল বলেন, জুলাইয়ের শেষ সপ্তাহে এক ব্যক্তি সেনাবাহিনীর পরিচয়ে গভীর রাতে তাঁর সঙ্গে দেখা করে সম্ভাব্য স্নাইপার হামলা ও গ্রেপ্তারের বিষয়ে সতর্ক করেছিলেন। পরে ৪ আগস্ট রাতে আরেক ব্যক্তি তাঁকে বাসায় না থাকার অনুরোধ জানান এবং দাবি করেন, তাঁকে ও বুয়েটের অধ্যাপক হাসিব চৌধুরীকে হত্যার পরিকল্পনা রয়েছে। সে রাতে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মোস্তফা আল মামুনের বাসায় অবস্থান করেন।
সরকার পতনের দিন ৫ আগস্ট সেনা সদর দপ্তরে অনুষ্ঠিত রাজনৈতিক দলগুলোর বৈঠকে তিনি একমাত্র নাগরিক প্রতিনিধি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বলে জানান।
তিনি বলেন, সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান তাঁকে সংসদ ভেঙে দেওয়ার বিষয়ে মতামত জানতে চাইলে তিনি স্পষ্টভাবে বলেন, বিতর্কিত নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত সংসদ ভেঙে দেওয়াই উচিত।
সেই বৈঠকেই শেখ হাসিনার দেশত্যাগের বিষয়টি টেলিভিশনের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়ার কথা উল্লেখ করেন তিনি। পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জনগণকে শান্ত থাকার আহ্বান জানিয়ে বড় সুখবর আসছে বলে একটি বার্তাও দেন।
বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে বৈঠকে সংসদ বিলুপ্ত করা, রাজনৈতিক বন্দিদের মুক্তি, বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মুক্তি এবং অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের বিষয়ে আলোচনা হয় বলে জানান আসিফ নজরুল।
তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, বৈঠকে উপস্থিত অধিকাংশ রাজনৈতিক নেতা একমত হন যে ভবিষ্যৎ সিদ্ধান্ত গ্রহণে ছাত্রনেতাদের মতামতকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।
৫ আগস্ট রাতেই কার্জন হলে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতাদের সঙ্গে তাঁর দীর্ঘ বৈঠক হয়।
সেখানে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান হিসেবে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নাম প্রথম উঠে আসে বলে জানান তিনি। প্রথমে ড. ইউনূস দায়িত্ব নিতে রাজি হবেন না বলে তাঁর ধারণা থাকলেও ছাত্রনেতারা জানান, এ বিষয়ে তাঁদের ইতোমধ্যে আলোচনা হয়েছে এবং ইতিবাচক সম্মতি মিলেছে।
আসিফ নজরুল বলেন, এ খবর শুনে তিনি অত্যন্ত আনন্দিত হন এবং এটিকে দেশের জন্য সর্বোত্তম সিদ্ধান্ত বলে মনে করেন।
৬ আগস্ট সকালে সেনাপ্রধানের সঙ্গে আলাদা বৈঠকের কথাও তুলে ধরেন আসিফ নজরুল।
তিনি জানান, ওই বৈঠকে তিনি ড. ইউনূসের আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা, নোবেল বিজয়ী হিসেবে তাঁর মর্যাদা এবং দেশের জন্য তাঁর গ্রহণযোগ্যতার বিষয়গুলো তুলে ধরেন। তাঁর মতে, সেনাপ্রধান প্রথমে বিষয়টি মেনে নিলেও পরে পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটে।
সন্ধ্যায় বঙ্গভবনের বৈঠকের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, সেখানে ছাত্রনেতাদের সঙ্গে আলাদা বৈঠক হয় এবং পরে তিনি জানতে পারেন, ড. ইউনূসের পরিবর্তে অন্য কাউকে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। এমনকি ছাত্রনেতাদের মধ্য থেকেই কাউকে নেতৃত্ব নেওয়ার প্রস্তাবও ছিল।
তবে ছাত্রনেতারা ড. ইউনূসের বিকল্প মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানান। শেষ পর্যন্ত তাঁদের অবস্থানই গৃহীত হয় এবং ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে প্রধান উপদেষ্টা করার সিদ্ধান্ত বহাল থাকে।
আসিফ নজরুল বলেন, উপদেষ্টা পরিষদের প্রাথমিক তালিকা তৈরিতে তিনি সরাসরি যুক্ত ছিলেন না। পরে ছাত্রনেতারা তাঁর সঙ্গে আলোচনা করলে তিনি সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান, সালেহউদ্দিন আহমেদ ও সাবেক পররাষ্ট্রসচিব মো. তৌহিদ হোসেনের মতো কয়েকটি নাম প্রস্তাব করেন।
তাঁর দাবি, চূড়ান্ত তালিকা ছাত্রনেতারা বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আলোচনা এবং ড. ইউনূসের সম্মতির ভিত্তিতেই নির্ধারণ করেন।
দুই বছর পর অন্তর্বর্তী সরকারের মূল্যায়ন করতে গিয়ে আসিফ নজরুল বলেন, ভোটাধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠা, গুম-খুনের বিচারপ্রক্রিয়া শুরু, আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা এবং জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের স্মৃতি সংরক্ষণ সরকারের উল্লেখযোগ্য অর্জন।
তবে তিনি স্বীকার করেন, জনতা কর্তৃক সহিংসতা (মব), মামলায় ভুয়া আসামি অন্তর্ভুক্তির সংস্কৃতি, গণমাধ্যমে হামলা প্রতিরোধ এবং কিছু প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে সরকার কাঙ্ক্ষিত সাফল্য দেখাতে পারেনি।
সাক্ষাৎকারের শেষাংশে তিনি বলেন, গণ-অভ্যুত্থানের প্রধান অর্জন ছিল শেখ হাসিনার সরকারের পতন এবং মানুষের ভোটাধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠা। তবে এসব অর্জনকে টেকসই করতে আরও কার্যকর সংস্কার ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন।
