২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে হতাহত ব্যক্তিদের ঘটনায় দেশের বিভিন্ন স্থানে দায়ের হওয়া ১ হাজার ৮৬২টি মামলার মধ্যে এখন পর্যন্ত মাত্র ২৫৪টির তদন্ত শেষ করে প্রতিবেদন জমা দিয়েছে পুলিশ। অর্থাৎ প্রায় দুই বছর পরও মোট মামলার ৮৬ দশমিক ৩৬ শতাংশের তদন্ত সম্পন্ন হয়নি। তদন্তে বিলম্বের জন্য ময়নাতদন্ত ছাড়াই মরদেহ দাফন, ঘটনাস্থল নিয়ে অসঙ্গতি, একই ঘটনায় একাধিক মামলা এবং ঢালাওভাবে আসামি করার মতো নানা কারণকে দায়ী করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ৩০ জুন পর্যন্ত তদন্ত শেষ হওয়া ২৫৪ মামলার মধ্যে ১৯৯টিতে অভিযোগপত্র এবং ৫৫টিতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছে। এসব মামলা থানা পুলিশ, পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই), অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি), অ্যান্টিটেররিজম ইউনিট (এটিইউ) এবং গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) তদন্ত করছে।
পুলিশ সদর দপ্তরের উপমহাপরিদর্শক (অপরাধ) মোহাম্মদ আবু সুফিয়ান বলেন, গণ-অভ্যুত্থান-সংক্রান্ত হত্যা মামলাগুলোর তদন্তে ফরেনসিক প্রতিবেদন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু অনেক মরদেহ ময়নাতদন্ত ছাড়াই দাফন করা হয়েছিল। পরে কবর থেকে মরদেহ উত্তোলন করে ময়নাতদন্ত করতে গিয়ে সময় লাগছে এবং অনেক ক্ষেত্রে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নির্ধারণ করাও কঠিন হয়ে পড়ছে। তিনি জানান, পরিচয়হীন মরদেহ, তদন্তগত ত্রুটি এবং ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তথ্যের অভাবও তদন্ত বিলম্বের অন্যতম কারণ।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, গণ-অভ্যুত্থানকে কেন্দ্র করে ৭৯৯টি হত্যা মামলা দায়ের হয়েছে। এসব মামলায় মোট আসামির সংখ্যা ৩ লাখ ২৭ হাজার ৮৪১ জন। এর মধ্যে ৬৫ হাজার ২১০ জন এজাহারভুক্ত এবং ২ লাখ ৬২ হাজার ৬৩১ জন সন্দেহভাজন হিসেবে অন্তর্ভুক্ত।
হত্যা মামলার মধ্যে ৬৩টিতে অভিযোগপত্র এবং ৩৭টিতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়েছে। অভিযোগপত্রভুক্ত আসামির সংখ্যা ৫ হাজার ৭৯৩।
অন্যদিকে আহত হওয়ার ঘটনায় সারা দেশে ১ হাজার ৬৩টি মামলা হয়েছে। এসব মামলায় মোট আসামি ২ লাখ ৮২ হাজার ৮৭৯ জন। এর মধ্যে ৮৯ হাজার ১২১ জন এজাহারভুক্ত এবং ১ লাখ ৯৩ হাজার ৭৫৮ জন সন্দেহভাজন। এসব মামলার মধ্যে ১৫৪টির তদন্ত সম্পন্ন হয়েছে। এর মধ্যে ১৩৬টিতে অভিযোগপত্র এবং ১৮টিতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছে। অভিযোগপত্রভুক্ত আসামির সংখ্যা ১০ হাজার ২০২।
তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, অনেক মামলায় রাজনৈতিক প্রভাব, ব্যক্তিগত শত্রুতা, ব্যবসায়িক বিরোধ, চাঁদাবাজি কিংবা প্রতিপক্ষকে হয়রানির উদ্দেশ্যে নিরীহ ব্যক্তিদের আসামি করা হয়েছে। এতে তদন্ত প্রক্রিয়া আরও জটিল হয়ে উঠেছে।
এ পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে ২০২৪ সালের ১৪ অক্টোবর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় একটি সতর্কীকরণ বিজ্ঞপ্তি জারি করে। একই সঙ্গে পুলিশ সদর দপ্তর মামলাগুলোর তদন্ত তদারকির জন্য বিশেষ মনিটরিং দল গঠন করে।
মিরপুরে কলেজছাত্রী রিতা আক্তারের মৃত্যুর ঘটনায় দায়ের হওয়া একটি মামলার উদাহরণ তুলে ধরে প্রতিবেদনে বলা হয়, সেখানে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, মন্ত্রী, পুলিশ সদস্যসহ ৩৯৫ জনকে আসামি করা হয়েছিল। মামলার বাদী রিতার বাবা আশরাফ আলী দাবি করেন, আসামির তালিকা অন্যরা প্রস্তুত করে তাঁকে শুধু স্বাক্ষর করতে বলেছিল। তিনি বলেন, “বিএনপির লোকেরা থানায় ছিল। তারা আসামির তালিকা ঠিক করে দিয়েছে। আমাকে সই করতে বলেছে, সই করেছি। আসামি কতজন, সঠিক বলতে পারব না।”
পিবিআই সূত্র জানিয়েছে, ওই মামলার কয়েকজন আসামির বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তদন্ত শেষে নির্দোষ ব্যক্তিদের অব্যাহতির সুপারিশ করা হতে পারে।
পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক খোন্দকার রফিকুল ইসলাম বলেন, আগে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত অনেকেই তদন্তে তথ্য দিয়ে সহায়তা করতেন। বর্তমানে অনেকেই কথা বলতে অনাগ্রহী হওয়ায় সাক্ষ্য-প্রমাণ সংগ্রহ কঠিন হয়ে পড়েছে।
তিনি আরও বলেন, একই ব্যক্তির মৃত্যুর ঘটনায় বিভিন্ন থানায় পৃথক মামলা, ভিন্ন ভিন্ন ঘটনাস্থল উল্লেখ এবং নিহত ব্যক্তির আত্মীয় পরিচয়ে মামলা দায়েরের মতো ঘটনাও পাওয়া গেছে। কিছু ক্ষেত্রে বাদীর সঙ্গে নিহত ব্যক্তির কোনো সম্পর্কই পাওয়া যায়নি। এমন অভিযোগের ভিত্তিতে কয়েকটি মামলায় ইতোমধ্যে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছে।
পুলিশের সূত্রগুলো জানায়, অধিকাংশ মামলা ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই এবং ৪ ও ৫ আগস্টের হতাহতের ঘটনাকে কেন্দ্র করে করা হয়। আন্দোলনের উত্তাল সময়ে নিহত ও আহতদের তথ্য, চিকিৎসা নথি এবং দাফনের রেকর্ড অনেক ক্ষেত্রেই সংরক্ষিত হয়নি।
সরকার এখন পর্যন্ত জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে ৮৪৩ জন শহীদের নাম গেজেট আকারে প্রকাশ করেছে। তবে হত্যা মামলা হয়েছে ৭৯৯টি। ফলে সব মৃত্যুর ঘটনায় বিচারিক প্রক্রিয়া কীভাবে সম্পন্ন হবে, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।
মানবাধিকারকর্মী নূর খান অভিযোগ করেন, সে সময় অনেক হতাহত ব্যক্তির তথ্য সংরক্ষণ করা হয়নি। কিছু ক্ষেত্রে ময়নাতদন্ত ছাড়াই মরদেহ দাফন করা হয়েছে এবং হাসপাতালের গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্রও নষ্ট হয়ে গেছে। তাঁর মতে, এসব কারণে তদন্ত আরও জটিল হয়ে উঠেছে।
গণ-অভ্যুত্থানের পর ২০২৪ সালের ১৪ অক্টোবর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল পুনর্গঠন করা হয়। পরে বিচার কার্যক্রম দ্রুততর করতে আরও একটি ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়।
দুটি ট্রাইব্যুনাল গত ১৯ মাসে জুলাইয়ের মানবতাবিরোধী অপরাধসংক্রান্ত ছয়টি মামলার রায় দিয়েছে। এসব রায়ে ৬১ জন দণ্ডিত হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ৪০ জন পলাতক এবং ২১ জন কারাগারে রয়েছেন। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত পুলিশের সাবেক ১১ সদস্যের মধ্যে ৭ জন পলাতক ও ৪ জন কারাবন্দী।
পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আবদুল কাইয়ুম মনে করেন, গণ-অভ্যুত্থান-সংক্রান্ত অনেক মামলায় নিরপরাধ মানুষ হয়রানির শিকার হয়েছেন এবং মামলা-বাণিজ্যের অভিযোগও রয়েছে। তিনি বলেন, মহানগর ও জেলা পর্যায়ে তদারকি কমিটি গঠন করে নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে তদন্ত শেষ করা প্রয়োজন। পাশাপাশি রাজনৈতিক প্রভাব বা তদবিরমুক্ত থেকে কেবল সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে অভিযোগপত্র দেওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
