বৈরী আবহাওয়া ও যোগাযোগ বিপর্যয়ে পরীক্ষার্থীদের নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার
চট্টগ্রাম বিভাগজুড়ে টানা ভারী বর্ষণ, বন্যা ও যোগাযোগ ব্যবস্থার ব্যাপক বিপর্যয়ের কারণে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের অধীন সব জেলার বুধবারের এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছে। পরীক্ষার্থীদের নিরাপত্তা এবং চলমান দুর্যোগ পরিস্থিতি বিবেচনায় গভীর রাতে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, স্থগিত হওয়া পরীক্ষার নতুন তারিখ পরে ঘোষণা করা হবে।
আন্তশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির জারি করা নির্দেশনায় বলা হয়েছে, চট্টগ্রাম বোর্ডের আওতাধীন জেলার পরীক্ষার্থীরা বর্তমানে প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে চরম ভোগান্তির মধ্যে রয়েছে। ফলে নির্ধারিত সময়ে পরীক্ষা আয়োজন করা সম্ভব নয়। তবে দেশের অন্যান্য শিক্ষা বোর্ডের অধীন আজকের এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা পূর্বঘোষিত সময়সূচি অনুযায়ী অনুষ্ঠিত হবে।
এর আগে পরিস্থিতির অবনতি হওয়ায় পৃথকভাবে চট্টগ্রাম, রাঙামাটি ও কক্সবাজার জেলার পরীক্ষা স্থগিতের ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল। পরবর্তীতে দুর্যোগের বিস্তৃতি এবং সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় পুরো চট্টগ্রাম বোর্ডের আওতাভুক্ত জেলার পরীক্ষাগুলো স্থগিত করা হয়।
গত দুই দিনের অতি ভারী বর্ষণে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার এবং পার্বত্য অঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকা পানির নিচে চলে গেছে। নগর ও গ্রামীণ এলাকার বহু সড়কে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হওয়ায় যান চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। বিভিন্ন স্থানে বাড়িঘর, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ সূত্রে জানা গেছে, গত ২৪ ঘণ্টায় চট্টগ্রাম নগরীতে প্রায় ৩৯৪ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে, যা কয়েক দশকের মধ্যে জুলাই মাসে একদিনের সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাতের অন্যতম ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
অবিরাম বর্ষণের ফলে বিভিন্ন এলাকায় পাহাড়ধস ও দেয়ালধসের ঘটনা ঘটেছে। এসব দুর্ঘটনায় চট্টগ্রাম, রাঙামাটি ও কক্সবাজারে অন্তত ছয়জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। একই সঙ্গে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।
খাগড়াছড়ি-রাঙামাটি সড়কের বিভিন্ন অংশ পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় যান চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। বহু গ্রামীণ সড়ক ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়েছে, ফলে স্থানীয় বাসিন্দাদের চলাচলে চরম দুর্ভোগ সৃষ্টি হয়েছে।
বৈরী আবহাওয়ার সরাসরি প্রভাব পড়েছে বিমান ও রেল যোগাযোগে। চট্টগ্রামের শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে কয়েকটি ফ্লাইট নির্ধারিত সময়ে অবতরণ করতে পারেনি। অন্যদিকে রেললাইনের ওপর পানি জমে যাওয়ায় কক্সবাজারগামী একটি যাত্রীবাহী ট্রেন দীর্ঘ সময় আটকে থাকে, যা শত শত যাত্রীর দুর্ভোগ বাড়িয়ে দেয়।
দুর্যোগে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কক্সবাজার জেলা। জেলার বিভিন্ন উপজেলায় বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। উখিয়ার রোহিঙ্গা শিবিরগুলোতেও অসংখ্য ছোট-বড় পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটেছে। টেকনাফ, রামু, মহেশখালী, চকরিয়া ও পেকুয়াসহ বিভিন্ন এলাকার বহু গ্রাম পানির নিচে চলে যাওয়ায় স্থানীয় জনগণের জীবনযাত্রা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
পরীক্ষা স্থগিত হওয়ায় অনেক শিক্ষার্থী ও অভিভাবকের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি হলেও শিক্ষা সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তাই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। শিক্ষা বোর্ড জানিয়েছে, পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে দ্রুত নতুন সময়সূচি প্রকাশ করা হবে এবং পরীক্ষার্থীদের পর্যাপ্ত প্রস্তুতির সুযোগ নিশ্চিত করা হবে।
চট্টগ্রাম অঞ্চলে চলমান ভারী বর্ষণ ও বন্যা পরিস্থিতি শুধু জনজীবন নয়, শিক্ষা, পরিবহন ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেও বড় ধরনের প্রভাব ফেলছে। দুর্যোগের মধ্যে পরীক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পরীক্ষা স্থগিতের সিদ্ধান্তকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। আবহাওয়ার উন্নতি এবং ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো পুনরুদ্ধারের ওপরই এখন পরিস্থিতির স্বাভাবিকতা অনেকাংশে নির্ভর করছে।
