রাজধানী ঢাকার আশপাশের কেরানীগঞ্জ, রূপগঞ্জ, সাভার, আশুলিয়া, ধামরাই ও গাজীপুর এলাকায় অন্তত ৭৫০টি অবৈধ ইটভাটা রয়েছে। পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র, জেলা প্রশাসনের অনুমোদন এবং আইন নির্ধারিত দূরত্বের বিধান উপেক্ষা করেই বছরের পর বছর এসব ভাটা পরিচালিত হচ্ছে। এমনকি ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের দেয়াল ঘেঁষেও পাঁচটি অবৈধ ইটভাটা রয়েছে বলে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে।
পরিবেশ অধিদপ্তরের গবেষণা অনুযায়ী, শুষ্ক মৌসুমে রাজধানীর বায়ুদূষণের প্রায় ৫৮ শতাংশের জন্য ইটভাটা দায়ী। ঢাকা, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জে অনুসন্ধানে দেখা গেছে, একাধিক অভিযান ও আদালতের নির্দেশের পরও অনেক ভাটা আবার চালু হয়ে যাচ্ছে।
পরিবেশ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, নারায়ণগঞ্জে মোট ২৪১টি ইটভাটার মধ্যে বৈধ ৯৪টি। বাকি ১৪৭টি অবৈধ। বুড়িগঙ্গা ও ধলেশ্বরী নদীর দুই তীরেও শতাধিক ইটভাটা গড়ে উঠেছে।
রূপগঞ্জে ৭৪টি ভাটার মধ্যে ৭০টিই অবৈধ বলে জানিয়েছে পরিবেশ অধিদপ্তর। সাভার, আশুলিয়া ও ধামরাইয়ে অনুমোদনহীন ভাটার সংখ্যা ৩৫৪টি। এর মধ্যে ধামরাইয়ে ১৬৭, সাভারে ১১৭ এবং আশুলিয়ায় ৭০টি।
এসব ভাটায় বছরে প্রায় সোয়া কোটি থেকে দেড় কোটি ইট উৎপাদিত হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। কেরানীগঞ্জের রাজেন্দ্রপুর, দোলেশ্বর, জাজিরা ও মোল্লাবাজার এলাকায় অর্ধশতাধিক অবৈধ ভাটা রয়েছে। শুধু ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের আশপাশেই রয়েছে পাঁচটি।
গাজীপুরে পরিবেশ ছাড়পত্রপ্রাপ্ত ইটভাটার সংখ্যা প্রায় ১৩০টি। এর মধ্যে অভিযান চালিয়ে ১৫ থেকে ১৮টি ভেঙে দেওয়া হয়েছে। গাজীপুর সিটি করপোরেশন এলাকায় বর্তমানে কোনো ইটভাটা নেই।
দেশে চালু প্রায় ৭ হাজার ৮৬টি ইটভাটার মধ্যে ৪ হাজার ৫৫০টির পরিবেশ ছাড়পত্র নেই বলে পরিবেশ অধিদপ্তরের হিসাব। এসবের বড় একটি অংশ রাজধানীর আশপাশে অবস্থিত।
বন, পরিবেশ ও জলবায়ুবিষয়ক মন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টু বলেন, ইটভাটার বিষয়টি নিয়ে মন্ত্রণালয় কাজ করছে। এ নিয়ে বৃহস্পতিবারও বৈঠক হয়েছে এবং শিগগির সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
গাজীপুরের কাপাসিয়া, শ্রীপুর, কালিয়াকৈর, কালীগঞ্জ এবং সদর উপজেলার মির্জাপুর ও পিরুজালীসহ বিভিন্ন এলাকায় ইটভাটা রয়েছে। অনেক ভাটা আবাসিক স্থাপনা, ফসলি জমি ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাশে গড়ে উঠেছে।
আইন অনুযায়ী স্কুল-কলেজ, হাসপাতাল ও সরকারি বনভূমির এক কিলোমিটারের মধ্যে ইটভাটা স্থাপন করা নিষিদ্ধ। স্থানীয়দের ভাষ্য, এসব বিধিনিষেধ উপেক্ষা করে অনেক ভাটা পরিচালিত হচ্ছে। কিছু ভাটা ইতোমধ্যে পরিবেশ অধিদপ্তর ও জেলা প্রশাসনের অভিযানে বন্ধও করা হয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, ইট তৈরির জন্য কৃষিজমির উপরিভাগের মাটি কেটে নেওয়া হচ্ছে। গাজীপুরের ইটভাটাগুলোতে মূলত কয়লা ব্যবহার করে ইট পোড়ানো হয়। কাঠ শুধু কয়লায় আগুন ধরানোর সময় ব্যবহার করা হয় বলে ভাটা-সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
অনুসন্ধানে কেরানীগঞ্জের কয়েকটি ইটভাটার মালিকের নামও উঠে এসেছে। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, মালিকদের অনেকেই স্থানীয়ভাবে প্রভাবশালী ব্যবসায়ী এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে তাদের যোগাযোগ রয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন ভাটা-মালিক দাবি করেন, বিএনপি, আওয়ামী লীগসহ বিভিন্ন দলের লোকজন এ ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত। তবে তারা দলীয় পরিচয়ের চেয়ে ব্যবসায়ী পরিচয়েই বেশি সক্রিয় এবং ক্ষমতায় থাকা দলের সঙ্গে সম্পর্ক রেখে ব্যবসা চালান বলে তাদের বক্তব্য।
সাভার পৌর এলাকায় স্থানীয় এক রাজনৈতিক নেতার নামে শতাধিক ইটভাটা থাকার দাবি করা হয়েছে। কোন্ডা ইউনিয়নেও ২৫টির বেশি ভাটা রয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, প্রশাসনের একাধিক অভিযানে ভাটা ভেঙে দেওয়ার পরও প্রভাবশালী মালিকেরা আবার সেগুলো চালু করেছেন।
একজন সরকারি কর্মকর্তা জানান, ভাটার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হলে বিভিন্ন রাজনৈতিক মহল থেকে তদবির আসে। এতে অভিযান পরিচালনা কঠিন হয়ে পড়ে।
অনুসন্ধানে অভিযোগ পাওয়া গেছে, পরিবেশ অধিদপ্তরের অভিযান শুরু হলে অর্থ লেনদেনের মাধ্যমে বিষয়টি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। ফলে কোনো কোনো ক্ষেত্রে অভিযান কার্যকর না হয়ে লোকদেখানো হয়ে থাকে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।
সাভারের একজন ভাটা-মালিক ভাড়া দেওয়া এবং পরিবেশ অধিদপ্তরের নাম করে বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে লেনদেনের কথা স্বীকার করেছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে চিমনি ভেঙে ভাটা বন্ধ করে দেওয়া হলেও কয়েক দিনের মধ্যে টিনের অস্থায়ী চিমনি তৈরি করে আবার উৎপাদন শুরু করার ঘটনাও ঘটছে। সাভার ও আশুলিয়ায় এমন ঘটনা একাধিকবার ঘটেছে বলে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে।
ইট তৈরির মাটি সংগ্রহের ক্ষেত্রেও অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, অনেক সময় রাতের বেলায় ফসলি জমির টপ সয়েল কেটে ভাটায় সরবরাহ করা হয়।
স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের ছত্রচ্ছায়ায় গড়ে ওঠা সিন্ডিকেট ভেকু দিয়ে মাটি কাটে এবং ট্রাকে করে তা ভাটায় পৌঁছে দেয় বলে অভিযোগ রয়েছে। প্রতি ট্রাক মাটি ১০ থেকে ১২ হাজার টাকায় বিক্রি হয়। নদীতীরবর্তী এলাকা থেকে ইঞ্জিনচালিত ট্রলার বা নৌযানে মাটি আনা হলে প্রতি বোট ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকায় বিক্রি হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ধামরাই থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ইটভাটার আয়ের একটি অংশ স্থানীয় পর্যায় থেকে কেন্দ্রীয় পর্যায়ের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের কাছে যায় বলেও অভিযোগ রয়েছে।
ইট পোড়ানোর ক্ষেত্রে কাঠ ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা থাকলেও বাস্তবে কোথাও কোথাও কাঠ পোড়ানো হচ্ছে বলে প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। এমনকি খরচ কমাতে পুরোনো প্লাস্টিকজাতীয় পণ্য ও নষ্ট বৈদ্যুতিক তারের প্লাস্টিক পোড়ানোর অভিযোগও রয়েছে।
আইন অনুযায়ী পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র ছাড়া জেলা প্রশাসনের অনুমোদন দেওয়ার কথা নয়। কিন্তু কোনো কোনো ভাটার ট্রেড লাইসেন্স থাকলেও পরিবেশ ছাড়পত্র নেই, আবার কোথাও পরিবেশ ছাড়পত্র থাকলেও লাইসেন্স নবায়ন করা হয়নি—এমন পরিস্থিতির সুযোগে ভাটাগুলো চালু রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্রিকস ম্যানুফ্যাকচারিং অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ফিরোজ হায়দার খান অবশ্য ঢাকার আশপাশে অবৈধ ইটভাটার সংখ্যা বেশি নয় বলে দাবি করেন। তার মতে, কিছু ভাটার লাইসেন্সের মেয়াদ শেষ হলেও তা নবায়ন হয়নি। আমিনবাজারের কিছু ভাটা পুরোনো পদ্ধতিতে উৎপাদন করছে বলেও তিনি জানান।
তার ভাষ্য, ২০১৯ সালের আইন অনুযায়ী স্কুল-কলেজের দূরত্বের কারণে কিছু ভাটাকে অবৈধ বলা হলেও বাস্তব পরিস্থিতি ভিন্ন। সারা দেশে প্রায় ৩ হাজার ভাটা পুরোনো পদ্ধতিতে উৎপাদন করে এবং সেগুলো বন্ধ করতে সরকারের উদ্যোগ প্রয়োজন। তবে দ্রুত ব্যবস্থা নিলে বছরে প্রায় ৬ কোটি ইটের চাহিদা পূরণে সংকট তৈরি হয়ে দাম বেড়ে যেতে পারে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন।
২০১৩ সালের ইট প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপন (নিয়ন্ত্রণ) আইনে আবাসিক এলাকা, সংরক্ষিত এলাকা ও সরকারি স্থাপনার এক কিলোমিটারের মধ্যে ইটভাটা স্থাপন নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ২০১৯ সালের সংশোধনীতে লাইসেন্স ছাড়া ভাটা পরিচালনার জন্য দুই বছরের কারাদণ্ড ও ২০ লাখ টাকা জরিমানার বিধান যুক্ত করা হয়।
২০১৯ সালে হাই কোর্টের একটি রিটের আদেশে বুড়িগঙ্গা নদীদূষণকারী কারখানা এবং রাজধানীর আশপাশের ইটভাটার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। তবে কয়েক বছর পরও কেরানীগঞ্জের অনেক ভাটা চালু রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
কেরানীগঞ্জের বাসিন্দা আবদুল হক বলেন, কোন্ডা ইউনিয়নের ২৫টির বেশি ইটভাটার কারণে পরিবেশ দূষিত হচ্ছে, কৃষি উৎপাদন কমছে এবং মানুষ নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছে।
রূপগঞ্জের গোলাকান্দাইল এলাকার বাসিন্দা জাহাঙ্গীর আলমের অভিযোগ, ইটভাটার ধোঁয়ায় বাড়ির টিনের চাল দ্রুত নষ্ট হচ্ছে এবং স্থানীয় বাসিন্দারা শ্বাসকষ্টসহ বিভিন্ন সমস্যায় ভুগছেন।
নারায়ণগঞ্জ প্রকৃতি ও পরিবেশ রক্ষা আন্দোলনের সমন্বয়ক সাবেরা সুলতানা বলেন, বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের সঙ্গে যোগাযোগ করেও তারা কার্যকর ভূমিকা দেখতে পাননি।
রূপগঞ্জের কর্ণগোপ এলাকার বাসিন্দা নাজমুল হুদা বলেন, ভাটার ধোঁয়ার কারণে আম, নারিকেলসহ বিভিন্ন গাছে ফলন কমে গেছে। ধোঁয়ার কারণে বাড়িতে ভাড়াটিয়াও থাকতে চান না বলে দাবি করেন তিনি।
নারায়ণগঞ্জ জেলা পরিবেশ অধিদপ্তরের উপপরিচালক এ এইচ এম রাশেদ বলেন, অবৈধ ইটভাটার বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতিতে নিয়মিত মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হচ্ছে।
গাজীপুর পরিবেশ অধিদপ্তরের উপপরিচালক আরেফিন বাদল বলেন, ইটের প্রয়োজন থাকলেও ইটভাটার দূষণে মানুষের শ্বাসকষ্টসহ বিভিন্ন ক্ষতি হতে পারে। ইট তৈরিতে আধুনিক ও পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি ব্যবহারের ওপর তিনি গুরুত্ব দেন।
কেরানীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা উমর ফারুক জানান, ঢাকা জেলা প্রশাসন ও পরিবেশ অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের নিয়ে সমন্বিত দল গঠন করে সব ইটভাটার তথ্য সংগ্রহের কাজ চলছে। গাজীপুরের জেলা প্রশাসক মো. নূরুল করিম ভূঁইয়া জানান, পোড়া ইটের পরিবর্তে পরিবেশবান্ধব ব্লক ইট ব্যবহারে উৎসাহ দেওয়া হচ্ছে।
বাংলাদেশ রিভার ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান মো. মনির হোসেন মনে করেন, বিচ্ছিন্নভাবে উচ্ছেদ অভিযান চালিয়ে এ সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। পরিবেশবান্ধব ব্লক ইটের ব্যবহার বাধ্যতামূলক করার পাশাপাশি সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও সাধারণ মানুষের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন বলে তিনি মত দেন।
ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের পরিবেশবিজ্ঞান ও ব্যবস্থাপনা বিভাগের শিক্ষক ড. মো. আবদুল খালেক বলেন, রাজধানীর আশপাশের অবৈধ ইটভাটাগুলো পরিবেশের ওপর বড় ধরনের প্রভাব ফেলছে। পুরোনো পদ্ধতিতে উৎপাদনের কারণে ধুলা ও দূষণ ছড়িয়ে পড়ছে এবং ঢাকার বায়ুদূষণের অন্যতম কারণ এসব ভাটা বলে তিনি মনে করেন।
