বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার মধ্যেও এক বছরে বিদেশি বিনিয়োগ বেড়েছে প্রায় ৪৫ শতাংশ
প্রত্যক্ষ বৈদেশিক বিনিয়োগ (এফডিআই) প্রবৃদ্ধিতে ২০২৫ সালে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে শীর্ষ অবস্থান অর্জন করেছে বাংলাদেশ। জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়নবিষয়ক সংস্থা আঙ্কটাডের সর্বশেষ ‘ওয়ার্ল্ড ইনভেস্টমেন্ট রিপোর্ট ২০২৬’ অনুযায়ী, ২০২৪ সালের তুলনায় দেশে বিদেশি বিনিয়োগ প্রায় ৪৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ১ দশমিক ৭৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে। বৈশ্বিক অর্থনীতিতে নানা চ্যালেঞ্জ থাকা সত্ত্বেও এই প্রবৃদ্ধি আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের কাছে বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান গ্রহণযোগ্যতার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বাংলাদেশে এফডিআই প্রবাহ ছিল ১ দশমিক ২৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। মাত্র এক বছরের ব্যবধানে তা বেড়ে ১ দশমিক ৭৮ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছে।
বিশ্বজুড়ে ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা, সরবরাহ শৃঙ্খলের চাপ, উচ্চ সুদের হার এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য অনিশ্চয়তার কারণে অনেক দেশ বিনিয়োগ আকর্ষণে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়লেও বাংলাদেশ এ সময়ে তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী অবস্থান ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, বাংলাদেশের বৃহৎ ভোক্তা বাজার, উৎপাদন খাতে সক্ষমতা, তুলনামূলক কম শ্রমব্যয় এবং দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সংযোগস্থলে অবস্থান বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করছে।
এ ছাড়া অবকাঠামো উন্নয়ন, বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠা, ডিজিটাল রূপান্তর এবং শিল্পায়নকেন্দ্রিক সরকারি নীতিও বিনিয়োগ বৃদ্ধিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে।
আঙ্কটাডের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উন্নয়নশীল এশিয়া ২০২৫ সালেও বিশ্বের অন্যতম প্রধান বিনিয়োগ গন্তব্য হিসেবে অবস্থান ধরে রেখেছে। এ অঞ্চলে মোট ৬৪৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বিদেশি বিনিয়োগ প্রবাহিত হয়েছে।
বাংলাদেশের অর্জনকে এই বৃহত্তর আঞ্চলিক প্রবণতার অংশ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, যেখানে বিনিয়োগকারীরা উৎপাদন, প্রযুক্তি, সেবা এবং অবকাঠামো খাতে নতুন সুযোগ খুঁজছেন।
প্রতিবেদনে বাংলাদেশের উৎপাদনশিল্প, প্রযুক্তি, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং সেবা খাতে আরও বেশি বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, দেশের জিডিপির আকার বৃদ্ধি, রপ্তানি সক্ষমতার সম্প্রসারণ এবং আঞ্চলিক সংযোগ জোরদারের ফলে বাংলাদেশ দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের জন্য আরও আকর্ষণীয় গন্তব্যে পরিণত হচ্ছে।
তারা মনে করেন, নীতিগত স্থিতিশীলতা, ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ এবং প্রশাসনিক প্রক্রিয়া আরও সহজ করা গেলে ভবিষ্যতে এফডিআই প্রবাহ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, টানা দুই বছর নিম্নমুখী প্রবণতার পর ২০২৫ সালে বৈশ্বিক এফডিআই প্রবাহ ৬ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে প্রায় ১ দশমিক ৬ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে।
ডিজিটাল অবকাঠামো, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদন এবং কৌশলগত শিল্পে বিনিয়োগ বৃদ্ধিই এ পুনরুদ্ধারের প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করেছে।
বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধি নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি, প্রযুক্তি স্থানান্তর, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি এবং রপ্তানি সক্ষমতা সম্প্রসারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। পাশাপাশি এটি বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী করা এবং দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি টেকসই করতেও সহায়ক হবে।
অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, বিদেশি বিনিয়োগের পাশাপাশি দেশীয় বিনিয়োগের গতি অব্যাহত থাকলে বাংলাদেশ আগামী বছরগুলোতে শিল্পায়ন ও অর্থনৈতিক রূপান্তরের নতুন ধাপে প্রবেশ করতে পারে।
দক্ষিণ এশিয়ায় এফডিআই প্রবৃদ্ধিতে শীর্ষ অবস্থান অর্জন বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য একটি ইতিবাচক বার্তা। বৈশ্বিক বিনিয়োগ পরিবেশ অনিশ্চিত থাকা সত্ত্বেও বিদেশি বিনিয়োগে এই অগ্রগতি আন্তর্জাতিক বাজারে দেশের প্রতি আস্থার প্রতিফলন। যথাযথ নীতি সহায়তা ও সংস্কার অব্যাহত থাকলে বাংলাদেশ ভবিষ্যতে আঞ্চলিক বিনিয়োগ কেন্দ্র হিসেবে আরও শক্ত অবস্থান তৈরি করতে সক্ষম হবে।
