বান্দরবানের দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় নিরাপদ পানির সংকট অনেকটাই কমেছে। জেলা পরিষদ ও জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের বিভিন্ন প্রকল্পের আওতায় গভীর নলকূপ, গ্র্যাভিটি ফ্লো সিস্টেম (জিএফএস), রিংওয়েল ও বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ ব্যবস্থাসহ বিভিন্ন প্রযুক্তি স্থাপনের ফলে অন্তত ৫০টি পাড়ার বাসিন্দা এখন বাড়ির কাছেই সুপেয় পানি পাচ্ছেন।
একসময় এসব এলাকার বাসিন্দাদের খাবার, গোসল ও দৈনন্দিন ব্যবহারের পানি সংগ্রহ করতে দুর্গম পাহাড়ি পথ পাড়ি দিতে হতো। কোথাও কোথাও পানি আনতে পাহাড়ের ঢাল বেয়ে প্রায় এক হাজার ফুট নিচে নামতে হতো। বর্ষায় ঝিরি, ঝরনা ও পাহাড়ি ছড়ায় পানি থাকলেও তা অনেক সময় মাটি-কাদা ও ময়লায় দূষিত থাকত। আবার শুষ্ক মৌসুমে দেখা দিত তীব্র পানির সংকট।
এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়তেন নারী ও শিশুরা। পানি সংগ্রহ করতে প্রতিদিন কয়েক ঘণ্টা সময় ব্যয় করার পাশাপাশি পাহাড়ি পথে ভারী কলসি বহনের সময় নানা ঝুঁকিও নিতে হতো।
বান্দরবান শহর থেকে প্রায় চার কিলোমিটার দূরের টিএনটি মারমাপাড়ায়ও এখন পরিস্থিতি বদলেছে। সেখানে বাড়ির পাশেই বসানো পানির কল থেকে বাসিন্দারা পানি সংগ্রহ করছেন।
৬০ বছর বয়সী মাচিং মারমা জানান, আগে খাবার পানি, গোসল ও কাপড় ধোয়ার জন্য পাড়া থেকে প্রায় ৮০০ ফুট নিচে পাহাড়ি পথে যেতে হতো। বয়সের কারণে পাহাড়ের নিচে গিয়ে পানি সংগ্রহ করা তার জন্য অত্যন্ত কষ্টকর ছিল। তার ওপর অনেক সময় সংগৃহীত পানি ময়লা ও কাদাযুক্ত থাকত।
পাড়ার নারী নেত্রী উখ্যাই ম্যা মারমা বলেন, আগে পাহাড়ের নিচ থেকে পানি সংগ্রহ করা গ্রামের নারীদের প্রতিদিনের সংগ্রামের অংশ ছিল। এতে দিনের বড় একটি সময় চলে যেত। এখন পুরো গ্রামের মানুষ পানির সুবিধা পাওয়ায় সেই ভোগান্তি অনেকটাই কমেছে।
উয়ই চিং মারমার ভাষ্য, পানি সহজলভ্য হওয়ায় নারীদের জীবনেই সবচেয়ে বেশি পরিবর্তন এসেছে। আগে পানি সংগ্রহে যে সময় ব্যয় হতো, এখন তা পরিবারের অন্যান্য কাজ, সন্তানদের দেখাশোনা ও আয়মূলক কর্মকাণ্ডে ব্যবহার করা যাচ্ছে।
পাড়ার কারবারি অংবাই মারমা জানান, তাদের এলাকার মানুষের অন্যতম বড় সমস্যা ছিল পানি। জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল বিভাগ গভীর নলকূপ স্থাপনের পাশাপাশি পাইপলাইনের মাধ্যমে পাহাড়ি ও বাঙালি মিলিয়ে প্রায় ৮০টি পরিবারকে পানি সরবরাহের ব্যবস্থা করেছে।
বান্দরবান জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আওতায় নিরাপদ পানি সরবরাহ ও স্যানিটেশন ব্যবস্থার উন্নয়নে প্রকল্প নেওয়া হয়। জেলা পরিষদ ও জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল বিভাগের উদ্যোগে ২০২৪-২৫ ও ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৪৫ কোটি টাকা ব্যয়ে বিভিন্ন কাজ বাস্তবায়ন করা হয়েছে।
এর আওতায় ১২টি পুরোনো গ্র্যাভিটি ফ্লো সিস্টেম (জিএফএস) মেরামতের পাশাপাশি নতুন করে ১০টি জিএফএস নির্মাণ করা হয়েছে। এ ছাড়া ৫৮৩টি রিংওয়েল, ১৪০টি বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ ব্যবস্থা এবং ৫০টি গভীর নলকূপ স্থাপন করা হয়েছে।
পাড়াভিত্তিক পানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে স্থাপন করা হয়েছে ৫০টি প্রোডাকশন টিউবওয়েল। পাশাপাশি স্যানিটেশন সুবিধা বাড়াতে বিভিন্ন এলাকায় ৩০টি স্বাস্থ্যসম্মত শৌচাগার নির্মাণ করা হয়েছে।
বান্দরবান জনস্বাস্থ্য উপসহকারী প্রকৌশলী সাইদুল ইসলাম জানান, স্থানীয় বাসিন্দাদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে জেলার অন্তত ৫০টি পাড়ায় নিরাপদ পানির ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়েছে।
জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের বান্দরবান বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী অনুপম দে বলেন, ৪৫ কোটি টাকা ব্যয়ে দুর্গম এলাকায় পুরোনো জিএফএস মেরামতের পাশাপাশি নতুন জিএফএস, রিংওয়েল, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ ব্যবস্থা, গভীর নলকূপ ও পাড়াভিত্তিক পানি সরবরাহ ব্যবস্থা স্থাপন করা হয়েছে। এতে অন্তত ৫০টি পাড়ার মানুষ সরাসরি সুবিধা পাচ্ছেন।
তিনি আরও জানান, টানা বৃষ্টি ও সাম্প্রতিক বন্যার কারণে কয়েকটি স্থাপনার প্লাস্টার ও রঙের কাজ বাকি রয়েছে। তবে প্রকল্পের মূল কার্যক্রম ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে।
