বিদ্যুৎ বিভ্রাট, সড়ক ক্ষতি ও জলাবদ্ধতায় বিপর্যস্ত জনজীবন; সতর্ক অবস্থানে প্রশাসন
বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলায় কয়েক দিনের টানা ভারী বর্ষণে জনজীবন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। উপজেলার বিভিন্ন নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হওয়ায় হাজারো মানুষ দুর্ভোগে পড়েছেন। একই সঙ্গে পাহাড়ধসের ঝুঁকি, সড়ক ক্ষয়, দীর্ঘস্থায়ী বিদ্যুৎ বিভ্রাট এবং একটি শিশুর মৃত্যুর ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রশাসন সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে বিশেষ নজরদারি চালানো হচ্ছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, অব্যাহত বৃষ্টির কারণে উপজেলার সদর, বাইশারী, ঘুমধুম, দোছড়ি ও সোনাইছড়ি ইউনিয়নের বিভিন্ন নিচু এলাকা পানির নিচে চলে গেছে। বসতবাড়ি, স্থানীয় সড়ক ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে।
গত সোমবার দুপুরে উপজেলা সদরের আদর্শগ্রাম এলাকায় একটি গাছ ভেঙে বিদ্যুৎ লাইনের ওপর পড়ে। এতে বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। প্রায় একদিন পর বিদ্যুৎ সংযোগ আংশিকভাবে স্বাভাবিক হলেও মঙ্গলবার সকাল থেকে আবারও বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে বেশ কয়েকটি এলাকা।
দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় মোবাইল ফোন চার্জ দেওয়া, বিশুদ্ধ পানি সংগ্রহ, ব্যবসা পরিচালনা এবং দৈনন্দিন নানা কাজ ব্যাহত হচ্ছে। পাশাপাশি ফ্রিজে সংরক্ষিত খাদ্যদ্রব্য নষ্ট হওয়ার আশঙ্কায় উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন সাধারণ মানুষ।
অবিরাম বৃষ্টির কারণে রামু-নাইক্ষ্যংছড়ি সড়কসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়কের অবস্থা নাজুক হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে বাইশারী ইউনিয়ন পরিষদ সংলগ্ন এলাকায় চলাচল ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
স্কুল-কলেজগামী শিক্ষার্থী, রোগী, ব্যবসায়ী ও সাধারণ যাত্রীদের দুর্ভোগ সবচেয়ে বেশি বেড়েছে। অনেক স্থানে কাদা ও ভাঙনের কারণে যানবাহন চলাচল ব্যাহত হচ্ছে।
এদিকে চলমান সড়ক সংস্কারকাজ নির্ধারিত সময়ে শেষ না হওয়ায় বৃষ্টিতে ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা আরও বেড়েছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
ঘুমধুম ইউনিয়নের তুমব্রু সীমান্ত এলাকার কয়েকটি বাড়িতে ইতোমধ্যে পানি প্রবেশ করেছে। পাশাপাশি সোনাইছড়ি, দোছড়ি ও সদর ইউনিয়নের পাহাড়ঘেরা এলাকাগুলোতে বসবাসকারী মানুষ পাহাড়ধসের আশঙ্কায় উৎকণ্ঠার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।
স্থানীয় খালগুলোতে প্রবল স্রোতের কারণে বিভিন্ন স্থানে রাস্তা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। যদিও এখনো যোগাযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়নি, তবে ঝুঁকি নিয়েই চলাচল করতে হচ্ছে এলাকাবাসীকে।
উপজেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত বড় ধরনের পাহাড়ধস বা ব্যাপক প্রাণহানির ঘটনা ঘটেনি। তবে একটি শিশুর মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে।
নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এনামুল হাসান জানিয়েছেন, পাহাড়ধসপ্রবণ এলাকাগুলোতে মাইকিং করে জনগণকে সতর্ক করা হচ্ছে। ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে অপ্রয়োজনে অবস্থান বা চলাচল না করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
তিনি জানান, প্রয়োজন হলে স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয়গুলোকে অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করা হবে। আশ্রয় গ্রহণকারীদের জন্য পর্যাপ্ত খাদ্য ও জরুরি সহায়তার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।
এ ছাড়া প্রতিটি ইউনিয়নে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছে এবং কন্ট্রোল রুম থেকে সার্বক্ষণিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। বিদ্যুৎ বিভাগও দ্রুত সংযোগ পুনরুদ্ধারে কাজ করছে বলে প্রশাসন জানিয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, দুর্যোগকালে দ্রুত বিদ্যুৎ সরবরাহ পুনঃস্থাপন, ক্ষতিগ্রস্ত সড়কের জরুরি সংস্কার এবং পাহাড়ধস ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় নিরাপত্তা জোরদার করা গেলে জনদুর্ভোগ অনেকাংশে কমানো সম্ভব হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পাহাড়ি অঞ্চলে অতিবর্ষণের সময় ঝুঁকিপূর্ণ ঢাল ও বসতিগুলোতে নিয়মিত নজরদারি এবং আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা শক্তিশালী করা জরুরি। এতে প্রাণহানি ও সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি কমানো সম্ভব হবে।
প্রতি বর্ষা মৌসুমেই বান্দরবানের পাহাড়ি এলাকাগুলোতে ভূমিধস ও জলাবদ্ধতার ঝুঁকি দেখা দেয়। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ভারী বৃষ্টিপাতের মাত্রা বাড়ায় সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এ ধরনের দুর্যোগের ঝুঁকিও বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে টেকসই অবকাঠামো নির্মাণ ও দুর্যোগ প্রস্তুতি এখন সময়ের দাবি হয়ে উঠেছে।
নাইক্ষ্যংছড়িতে চলমান ভারী বর্ষণ জনজীবনে বড় ধরনের প্রভাব ফেলেছে। প্রশাসন সতর্ক অবস্থানে থাকলেও আবহাওয়ার পরিস্থিতি উন্নত না হলে ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে। তাই জনগণকে সতর্ক থাকার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা মেনে চলার আহ্বান জানানো হয়েছে।
