নেপালে গত সপ্তাহের আকস্মিক ও ভয়াবহ পাহাড়ি ঢলে ব্যাপক প্রাণহানি ও ধ্বংসযজ্ঞের পর উদ্ধার অভিযান চলছে। দেশটির সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম প্রাণঘাতী এই দুর্যোগে নিহতের সংখ্যা এক হাজার ছাড়িয়েছে এবং নিখোঁজ রয়েছেন চার হাজারের বেশি মানুষ। নিখোঁজদের মধ্যে জলবিদ্যুৎকেন্দ্রের বিভিন্ন সুড়ঙ্গে আটকে পড়া কয়েক শ শ্রমিকও রয়েছেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
এমন পরিস্থিতিতে স্বজন হারানো ও ঘরবাড়ি ধ্বংস হয়ে যাওয়া মানুষদের সামনে এখন অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ। তাঁদের একজন পেমবা দুনদু তামাং। ভয়াবহ ঢল থেকে প্রাণে বেঁচে গেলেও পরিবারের ছয় সদস্যকে হারিয়েছেন তিনি।
তামাং নেপালের ত্রিশূলী নদীর ওপর নির্মাণাধীন ‘আপার ত্রিশূলী ৩বি’ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের সুড়ঙ্গে কাজ করছিলেন। ঘটনার সময় প্রায় ৩০ জনের একটি দল সুড়ঙ্গের ভেতরে কংক্রিটের আস্তর দেওয়ার কাজে নিয়োজিত ছিল।
হঠাৎ প্রবল বাতাসের ঝাপটা এসে সেখানে রাখা প্লাইউডের পাত উড়িয়ে নেয়। ভারী যন্ত্রপাতিও নড়তে শুরু করে। এর কিছুক্ষণ পরই দ্রুত পানি ঢুকতে শুরু করে সুড়ঙ্গে।
বিবিসিকে তামাং বলেন, বিপদ বুঝতে পেরে তিনি সুড়ঙ্গের প্রবেশমুখের দিকে দৌড়াতে শুরু করেন। তাঁর পেছনে তখন ঢলের পানি ধেয়ে আসছিল।
প্রায় ২০ মিনিট দৌড়ে তিনি পাহাড়ের দিকে উঠে প্রাণ বাঁচান। তবে দৌড়ানোর সময় তিনি আহত হন এবং একপর্যায়ে প্রায় অচেতন হয়ে পড়েন।
ঢলের সময় তামাংয়ের পরিবারের সদস্যরা নদীর তীরে তাঁদের বাড়িতে ছিলেন। দুর্যোগে তাঁর মা, বড় ভাই, ভাবি এবং ভাইয়ের তিন সন্তান মারা যান।
তবে তামাংয়ের স্ত্রী, ছেলে ও এক ভাতিজা বেঁচে গেছেন।
নিজের বাড়ির জায়গায় ফিরে গিয়ে তিনি দেখেন, সেখানে আর কোনো ঘর নেই। তামাং বলেন, ‘আমাদের বাড়ি যেখানে থাকার কথা, সেখানে তাকিয়ে দেখি, কিছুই নেই। বুঝলাম, সব শেষ হয়ে গেছে।’
স্বজন ও ঘরবাড়ি হারানোর পর তাঁর কাছে জীবন অর্থহীন মনে হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘বেঁচে থাকাটাই কষ্টের। কোথায় খাব, কোথায় যাব, কিছু জানি না।’
তামাংয়ের সহকর্মী ইথা ঘালেও ওই ঢল থেকে প্রাণে বেঁচেছেন। তাঁর পরিবারের আট সদস্য মারা গেছেন। তাঁদের মধ্যে তাঁর মা ও বড় মেয়েও রয়েছেন।
ঘালে জানান, ঢল থেকে পালানোর সময় প্রবল বাতাস তাঁদের প্রায় উড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছিল। তাঁর স্ত্রী ও তিন ছেলে অবশ্য বেঁচে গেছেন।
তামাং ও ঘালে দুজনই ‘আপার ত্রিশূলী ৩বি’ প্রকল্পের সুড়ঙ্গ নির্মাণকাজে যুক্ত ছিলেন। প্রকল্পটি আগামী বছর চালু হওয়ার কথা ছিল। উজানে থাকা একটি জলবিদ্যুৎকেন্দ্রের ব্যবহৃত পানি কাজে লাগিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে তা জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করার পরিকল্পনা ছিল।
নেপালে উৎপাদিত বিদ্যুতের ৯৯ শতাংশের বেশি জলবিদ্যুৎ থেকে আসে। ফলে দুর্যোগে জলবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলোর ক্ষয়ক্ষতি দেশটির জন্য বড় উদ্বেগ তৈরি করেছে।
নিখোঁজ ব্যক্তিদের মধ্যে বিভিন্ন জলবিদ্যুৎকেন্দ্রের সুড়ঙ্গে আটকে পড়া কয়েক শ শ্রমিক রয়েছেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এসব সুড়ঙ্গে আটকে পড়া শ্রমিকদের উদ্ধারে অভিযান চালাচ্ছেন উদ্ধারকর্মীরা।
নেপালের সেনাবাহিনীর মুখপাত্র রাজা রাম বাসনেত বলেন, সুড়ঙ্গগুলোয় অনুসন্ধান ও উদ্ধারকাজে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি সেনারা মরদেহ উদ্ধার এবং রোগের বিস্তার ঠেকাতেও কাজ করছে।
সেনাবাহিনী জানিয়েছে, মঙ্গলবার ১১৯ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে।
উদ্ধারকাজে চীন, নেপাল ও ভারতের বিশেষজ্ঞরা একসঙ্গে কাজ করছেন। তাঁরা খননযন্ত্র ও ভারী সরঞ্জাম ব্যবহার করে জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের ধ্বংসাবশেষ সরিয়ে সুড়ঙ্গে আটকে থাকা শ্রমিকদের কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা করছেন। প্রকৌশলীরা সুড়ঙ্গের ভেতরে বাতাস সরবরাহের ব্যবস্থাও করছেন।
তামাংয়ের ধারণা, তাঁর সঙ্গে প্রায় ৫০ থেকে ৬০ জন সুড়ঙ্গ থেকে বের হতে পেরেছিলেন। বাকিরা হয়তো ভেতরে আটকা পড়ে আছেন।
তাঁর মতে, প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ও নিরাপত্তাব্যবস্থা আগে থেকে থাকলে আরও অনেক মানুষকে বাঁচানো সম্ভব হতো।
তামাংয়ের পরিচিত অনেক শ্রমিক এখনো সুড়ঙ্গের ভেতরে আটকা পড়ে আছেন। তাঁদের দ্রুত উদ্ধারের প্রত্যাশা করছেন তিনি।
তিনি বলেন, ‘সুড়ঙ্গের ভেতরে আটকা পড়া অনেককেই আমি চিনি। তাঁদের কেউ কেউ হয়তো এখনো বেঁচে আছেন। তাঁদের দ্রুত উদ্ধার করা গেলে আমি খুশি হব।’
একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভয়াবহ ঢলের কয়েক দিন আগেই হিমবাহের আশপাশে কিছু অস্বাভাবিক পরিবর্তনের লক্ষণ দেখা গিয়েছিল।
স্যাটেলাইটে তোলা ছবিতে হিমবাহের ওপরের অংশ দ্রুত সরে যাওয়ার চিত্র দেখা যায়। বরফ গলে জমা পানি ধীরে ধীরে বাদামি হয়ে উঠছিল। আশপাশের পাহাড়ি পাথরেও ফাটল তৈরি হয়েছিল।
এশিয়ান মাউন্টেন একাডেমিক অ্যালায়েন্স, স্টিমসন সেন্টার এবং চীনের ইনস্টিটিউট অব মাউন্টেন হ্যাজার্ডস অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টের বিশেষজ্ঞরা এসব তথ্য জানিয়েছেন।
তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, ঢলটি এত দ্রুত ও তীব্র গতিতে নিচের দিকে নেমে এসেছিল যে কাছাকাছি থাকা মানুষদের প্রচলিত সতর্কব্যবস্থার মাধ্যমে সময়মতো সতর্ক করা সম্ভব হয়নি।
ভাটির দিকে পরিস্থিতি কিছুটা আলাদা ছিল। সেখানে ঢলের পানি পৌঁছাতে ১০ মিনিট বা তার বেশি সময় লেগেছিল।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব এলাকায় সমন্বিত আগাম সতর্কব্যবস্থা থাকলে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক মানুষের প্রাণ রক্ষা করা সম্ভব হতে পারত।
এদিকে উদ্ধারকাজ অব্যাহত রয়েছে। ভারী যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে ধ্বংসাবশেষ সরিয়ে সুড়ঙ্গে আটকে থাকা শ্রমিকদের কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা চলছে।
দুর্যোগে বাড়িঘর ও পরিবারের সদস্যদের হারানোর পাশাপাশি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলো বন্ধ হয়ে গেলে জীবিকা কীভাবে চলবে, তা নিয়েও উদ্বিগ্ন তামাং।
দুই দিন শান্তিবাজার নামে একটি গ্রামে আশ্রয় নেওয়ার পর সেনাবাহিনী তাঁকে উদ্ধার করে। এখন স্বজন হারানোর শোকের পাশাপাশি ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা তাঁকে ঘিরে ধরেছে।
তামাংয়ের কথায় সেই হতাশাই স্পষ্ট: ‘এভাবে চলতে থাকলে আমাদের না খেয়ে থাকতে হবে। কখনো কখনো মনে হয়, বেঁচে না থাকলেই হয়তো ভালো হতো।’
নেপালে উদ্ধার অভিযান যত এগোচ্ছে, ততই সুড়ঙ্গে আটকে থাকা শ্রমিকদের জীবিত উদ্ধারের প্রত্যাশা বাড়ছে। একই সঙ্গে ভয়াবহ এই দুর্যোগে আগাম সতর্কতা ও নিরাপত্তাব্যবস্থার ঘাটতি নিয়ে প্রশ্নও সামনে এসেছে।
