ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনের তফসিল এখনো ঘোষণা হয়নি। তবে এরই মধ্যে নির্বাচনের প্রস্তুতি শুরু করেছেন বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থীরা। কেন্দ্রীয় নির্দেশনা আসার আগেই বিভিন্ন এলাকায় তাঁরা জনসংযোগ ও প্রচার শুরু করেছেন।
দলীয় ও মাঠপর্যায়ের সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় সব ইউনিয়নেই চেয়ারম্যান পদে বিএনপির একাধিক নেতা প্রার্থিতা জানান দিচ্ছেন। কোনো কোনো ইউনিয়নে তিন থেকে চারজন পর্যন্ত নেতা প্রার্থী হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। ফলে দল-সমর্থিত একক প্রার্থী বাছাই করা এবং অন্য সম্ভাব্য প্রার্থীদের তাঁর পক্ষে ঐক্যবদ্ধ করাই বিএনপির জন্য বড় সাংগঠনিক চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এদিকে নির্বাচন কমিশন (ইসি) বছরের শেষ দিকে ইউপি নির্বাচন দিয়ে স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরু করতে চায়। আগামী সেপ্টেম্বরে তফসিল ঘোষণার পরিকল্পনা রয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকেও চলতি অর্থবছরের মধ্যে স্থানীয় সরকারের পাঁচ স্তরের নির্বাচন শেষ করার কথা বলা হয়েছে।
ফেনী সদর উপজেলার মোটবী ইউনিয়নে চেয়ারম্যান পদে বিএনপির নেতা ও সমর্থকদের মধ্যে অন্তত নয়জন আগ্রহী বা তৎপর রয়েছেন। এর মধ্যে রয়েছেন ইউনিয়ন বিএনপির আহ্বায়ক মীর মোশাররফ হোসেন (মানিক), সদস্যসচিব শাহ আলম, সাবেক সাধারণ সম্পাদক নিজামুদ্দিন, উপজেলা যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক ফখরুল ইসলাম (মাসুক), উপজেলা ছাত্রদলের সাবেক আহ্বায়ক দেলোয়ার হোসেন এবং ইউনিয়ন বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক গোলাম মহিউদ্দিন ভূঁইয়া।
এ ছাড়া বিএনপি ঘরানার দুই প্রবাসী রহমান রাজু ও নুরুল আমিন এবং আবুল কালাম মজুমদারও চেয়ারম্যান পদে আগ্রহী। রাজু ও নুরুল আমিন ইতিমধ্যে এলাকাবাসীকে শুভেচ্ছা জানিয়ে পোস্টার লাগিয়েছেন।
এই ইউনিয়নে আগে দুই দফায় চেয়ারম্যান ছিলেন জেলা বিএনপির নেতা এম এ খালেক। এবার তাঁকে ফেনী জেলা পরিষদের প্রশাসক করা হয়েছে।
বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান স্থানীয় সরকার নির্বাচনে একক প্রার্থীর ওপর জোর দিয়ে আসছেন। জেলা ও মহানগর কমিটির নেতাদের সঙ্গে মতবিনিময় এবং দলের বিভিন্ন ঘরোয়া অনুষ্ঠানে তিনি স্থানীয় সরকার নির্বাচনে একজন দল-সমর্থিত প্রার্থী ঠিক করে সবাইকে তাঁর পক্ষে কাজ করার কথা বলছেন।
সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে বিএনপির সংসদীয় দলের সভায়ও স্থানীয় পর্যায়ের নেতা-কর্মীদের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি না করে ঐক্য বজায় রাখার জন্য সংসদ সদস্যদের প্রতি আহ্বান জানান তারেক রহমান।
তবে বিএনপির নেতারা জানিয়েছেন, সম্ভাব্য প্রার্থীদের বিষয়ে এখনো স্থানীয় পর্যায়ে কোনো আনুষ্ঠানিক সাংগঠনিক নির্দেশনা দেওয়া হয়নি। ফলে অনেক সম্ভাব্য প্রার্থী নিজেদের মতো করে নির্বাচনী প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, প্রার্থিতার বিষয়ে এখন পর্যন্ত স্থানীয় পর্যায়ে কোনো সাংগঠনিক নির্দেশনা দেওয়া হয়নি। তবে তারেক রহমান জেলা ও মহানগর নেতাদের সঙ্গে মতবিনিময়ের সময় দলীয় ঐক্য এবং একক প্রার্থীর পক্ষে থাকার বিষয়ে নির্দেশনা দিচ্ছেন।
বিএনপির নেতারা বলছেন, কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে কেউ প্রার্থী হলে তাঁর বিরুদ্ধে বহিষ্কারসহ সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে। তবে আনুষ্ঠানিক নির্দেশনা আসার আগেই একাধিক নেতা মাঠে নেমে পড়ায় তাঁদের সবাইকে শেষ পর্যন্ত একক প্রার্থীর পক্ষে আনা কঠিন হতে পারে।
প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দীন জানিয়েছেন, বছরের শেষ দিকে ইউপি নির্বাচন শুরুর প্রস্তুতি নিচ্ছে ইসি। প্রায় সাড়ে চার হাজার ইউপির মধ্যে যেগুলো নির্বাচনের উপযোগী, প্রথম ধাপে সেগুলোতে ভোট নেওয়ার প্রস্তুতি চলছে। এ জন্য আগামী সেপ্টেম্বরে তফসিল ঘোষণা করা হতে পারে।
তফসিল ও ভোটের মধ্যে গড়ে দুই মাস সময় রাখার রীতি এবং ইউপির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে ১৮০ দিনের মধ্যে নির্বাচন করার আইনি বাধ্যবাধকতা বিবেচনায় নিয়ে সময়সূচি নির্ধারণ করা হবে।
ইসি সূত্র জানিয়েছে, সিংহভাগ ইউনিয়ন পরিষদের মেয়াদ এ বছর শেষ হচ্ছে। তাই নির্বাচন আগামী বছর পর্যন্ত পিছিয়ে না দিয়ে এ বছরের মধ্যেই শুরু করতে চায় কমিশন।
তবে বন্যা, দুর্গাপূজা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ব্যস্ততা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরীক্ষা এবং আগামী বছরের রমজান ও ঈদসহ বিভিন্ন বিষয় বিবেচনায় নিতে হচ্ছে। এসব কারণে নভেম্বরের শেষ দিকে ইউপি ভোট শুরুর সম্ভাবনাই সামনে রয়েছে। পরীক্ষার সময়সূচি কিছুটা এগিয়ে আনা সম্ভব হলে নভেম্বরের শেষ সপ্তাহে ভোট শুরু করার সুযোগ তৈরি হতে পারে বলে জানিয়েছে ইসি।
স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখে বিএনপির নেতাদের মধ্যে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের সম্ভাব্য অংশগ্রহণ নিয়েও আলোচনা চলছে। স্থানীয় নেতাদের ধারণা, আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা নির্বাচনে থাকার চেষ্টা করতে পারেন। তাঁদের অনেকে এখন পলাতক থাকলেও তফসিল ঘোষণার পর বিভিন্ন এলাকায় ভেতরে-ভেতরে একজন করে প্রার্থী ঠিক করে মাঠে নামতে পারেন।
এমন পরিস্থিতিতে তাঁদের কীভাবে মোকাবিলা করা হবে, সে বিষয়ে বিএনপির কেন্দ্রীয় পর্যায় থেকে এখনো কোনো দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়নি।
অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীর সম্ভাব্য প্রার্থীরা আগে থেকেই মাঠে সক্রিয় রয়েছেন। জাতীয় নাগরিক পার্টিও (এনসিপি) প্রস্তুতি নিচ্ছে। ফলে বিএনপিকে দলের ভেতরের একাধিক প্রার্থী সামলানোর পাশাপাশি অন্য দলের প্রতিদ্বন্দ্বিতার বিষয়টিও বিবেচনায় নিতে হচ্ছে।
বিএনপির নেতারা বলছেন, দল দীর্ঘদিন দলীয়ভাবে ইউপি নির্বাচনে অংশ নেয়নি। এ কারণে এবার স্থানীয় নেতাদের মধ্যে নির্বাচন নিয়ে আগ্রহ ও উৎসাহ তৈরি হয়েছে। তবে এই আগ্রহকে দলীয় শৃঙ্খলার মধ্যে রেখে একক প্রার্থী নিশ্চিত করা নিয়ে শীর্ষ নেতৃত্বের মধ্যে সংশয় রয়েছে।
বিএনপির চট্টগ্রাম বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক ও চট্টগ্রাম জেলা পরিষদের প্রশাসক মাহবুবের রহমান শামীম বলেন, যাঁরা নির্বাচন করবেন, তাঁরা মাঠে কাজ শুরু করে দিয়েছেন। তফসিল ঘোষণার পর দল প্রার্থী বাছাইসহ সার্বিক বিষয়ে নির্দেশনা দেবে এবং সে অনুযায়ী কাজ করা হবে।
বিএনপির সূত্র জানিয়েছে, রংপুর ও রাজশাহী বিভাগের ১২টি জেলা ও মহানগর কমিটির সঙ্গে তারেক রহমান মতবিনিময় করেছেন। গত শনিবার তিনি বগুড়া জেলা কমিটির সঙ্গে মতবিনিময় করেন।
সব মিলিয়ে ইউপি নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার আগেই বিএনপির সামনে গুরুত্বপূর্ণ সাংগঠনিক কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে সম্ভাব্য একাধিক প্রার্থীকে সমঝোতায় এনে একজনের পক্ষে দাঁড় করানো। দলীয় ঐক্য বজায় রেখে একক প্রার্থী নিশ্চিত করতে না পারলে স্থানীয় পর্যায়ে বিরোধ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে দলের নেতারা মনে করছেন।
