সিলেটে ১১ দলীয় জোটের বিভাগীয় সমাবেশে গণভোটের রায় ও ‘জুলাই সনদ’ বাস্তবায়নের দাবি জানিয়ে সরকারকে সতর্ক করেছেন জোটের শীর্ষ নেতারা। তারা অভিযোগ করেন, সংস্কার ও গণভোটের অঙ্গীকার বাস্তবায়নে সরকার কার্যকর পদক্ষেপ নিচ্ছে না। একই সঙ্গে দাবি পূরণ না হলে আরও কঠোর আন্দোলনের কর্মসূচি ঘোষণার হুঁশিয়ারিও দেন তারা।
সিলেটের ঐতিহাসিক সরকারি আলীয়া মাদরাসা মাঠে অনুষ্ঠিত ১১ দলীয় জোটের বিভাগীয় সমাবেশে গণভোটের রায় বাস্তবায়ন, সংবিধান সংস্কার এবং রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন খাতে সংস্কারের দাবিতে একাধিক রাজনৈতিক নেতা বক্তব্য দেন। শনিবার (২৫ জুলাই) বিকেলে অনুষ্ঠিত এ সমাবেশে অংশ নিয়ে তারা সরকারের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করেন এবং দাবি আদায়ে আন্দোলন জোরদারের ঘোষণা দেন।
সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে বিরোধীদলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেন, দেশের মানুষ পরিবর্তন ও সংস্কারের প্রত্যাশায় গণভোটে সমর্থন জানিয়েছে। তার ভাষায়, প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষের দেওয়া সেই রায় বাস্তবায়ন করতে হবে এবং তা উপেক্ষা করা হলে জনগণের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করা হবে।
তিনি অভিযোগ করেন, বিএনপি আওয়ামী লীগের শাসনামলের মতো দলীয়করণ ও দুর্নীতির পথে হাঁটছে। একই সঙ্গে তিনি বলেন, জনগণের প্রত্যাশার বিপরীতে কোনো ধরনের কর্তৃত্ববাদী শাসন প্রতিষ্ঠার চেষ্টা হলে তারও প্রতিরোধ গড়ে তোলা হবে।
সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, গণভোটের রায় ও জুলাই আন্দোলনের চেতনা বাস্তবায়নে বিলম্ব না করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া উচিত। প্রয়োজনে জীবন দিয়েও এ দাবির পক্ষে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার কথাও উল্লেখ করেন তিনি।
ডা. শফিকুর রহমান সিলেট অঞ্চলের বিভিন্ন অবকাঠামোগত দাবির কথাও তুলে ধরেন। তিনি এম এ জি ওসমানী বিমানবন্দরকে পূর্ণাঙ্গ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে উন্নীত করা, ছয় লেন সড়ক নির্মাণ দ্রুত শেষ করা, প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা এবং মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রম সম্প্রসারণের দাবি জানান।
সমাবেশে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম এমপি বলেন, জুলাই আন্দোলনের মাধ্যমে যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, সরকার তা পূরণে ব্যর্থ হচ্ছে। তিনি অভিযোগ করেন, গণভোটের রায় বাস্তবায়নের পরিবর্তে তা উপেক্ষা করা হচ্ছে।
তার বক্তব্যে তিনি বলেন, সংস্কার কার্যক্রম উপেক্ষা করে কেবল সংবিধান সংশোধনের আলোচনায় সীমাবদ্ধ থাকা যথেষ্ট নয়। জনগণের রায় বাস্তবায়িত না হলে সরকারের প্রতি জনসমর্থন কমে যাবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক বলেন, ১১ দলীয় ঐক্য ক্ষমতার ভাগাভাগির জন্য নয়; বরং জুলাই আন্দোলনের লক্ষ্য বাস্তবায়নের উদ্দেশ্যেই এই জোট গঠিত হয়েছে।
তিনি বলেন, গণভোটের রায় অনুযায়ী প্রয়োজনীয় সংস্কার বাস্তবায়ন এবং গণপরিষদ গঠন করতে হবে। অন্যথায় আন্দোলনের মাধ্যমে সরকারকে তা করতে বাধ্য করা হবে।
সরকারের উদ্দেশে তিনি আরও বলেন, জুলাই আন্দোলনের আদর্শ থেকে সরে গেলে জনগণ তা মেনে নেবে না।
এবি পার্টির সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ বলেন, বর্তমান সরকার বিচার ও সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় এলেও গত দেড় বছরে সে ক্ষেত্রে প্রত্যাশিত অগ্রগতি হয়নি। তিনি বলেন, জনগণের সঙ্গে করা রাজনৈতিক অঙ্গীকার বাস্তবায়ন করাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
লেবার পার্টির চেয়ারম্যান ডা. ইরান, জাগপার সহসভাপতি ইঞ্জিনিয়ার রাশেদ প্রধান, নেজামে ইসলাম পার্টির নেতা মাওলানা আবদুল মাজেদ আতহারী এবং বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টির চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট একেএম আনোয়ারুল ইসলাম চান নিজ নিজ বক্তব্যে সরকারের বিভিন্ন নীতির সমালোচনা করেন। তারা গণভোটের রায় বাস্তবায়ন, রাজনৈতিক সংস্কার এবং জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার দাবি জানান।
সমাবেশের সভাপতিত্বকারী এলডিপির সভাপতি কর্নেল (অব.) অলি আহমদ (বীর বিক্রম) বলেন, জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য দুর্নীতি ও চাঁদাবাজি বন্ধ করতে হবে। তিনি বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের প্রতি জনগণের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে প্রয়োজনীয় সংস্কার বাস্তবায়নের আহ্বান জানান।
তিনি আরও বলেন, জনগণের প্রত্যাশা পূরণ না হলে সরকারবিরোধী একদফা আন্দোলনের পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।
সমাবেশে স্বাগত বক্তব্য দেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সিলেট মহানগর আমির মো. ফখরুল ইসলাম। এছাড়া বক্তব্য দেন ড. এএইচএম হামিদুর রহমান আযাদ, অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের, মাওলানা রেজাউল করিম জালালী, মাওলানা আতাউল্লাহ আমীন, মো. সেলিম উদ্দিন, মাওলানা হাবিবুর রহমান, মাওলানা ফয়েজ আহমেদ, জিয়াউল আনোয়ার, জুনায়েদ আহমদ, হাফিজ আব্দুল হাই হারুন, মাওলানা এমরান আলম, মাওলানা মোজ্জামেল হক তালুকদার, মাওলানা মো. ইকবাল হুসাইন, মাহবুবুর রহমান এবং শহিদুল ইসলাম সাজুসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক ও জোটভুক্ত সংগঠনের নেতারা।
