অবকাঠামো, স্বাস্থ্যসেবা ও নগর ব্যবস্থাপনার দুর্বলতায় উন্নতির ধারায় ফিরতে পারছে না রাজধানী
বিশ্বের সবচেয়ে কম বাসযোগ্য শহরগুলোর তালিকায় টানা দ্বিতীয় বছরের মতো তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা। আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (ইআইইউ) ২০২৬ সালের গ্লোবাল লাইভেবিলিটি ইনডেক্সে ১৭৩টি শহরের মধ্যে ঢাকার অবস্থান ১৭১তম। মাত্র ৪২ স্কোর নিয়ে রাজধানী শহরটি বাসযোগ্যতার সূচকে আবারও তলানির দিকের শহরগুলোর মধ্যে স্থান পেয়েছে।
সাম্প্রতিক এই মূল্যায়নে দেখা গেছে, শিক্ষা খাতে তুলনামূলক ভালো অবস্থান থাকলেও অবকাঠামো, স্বাস্থ্যসেবা, পরিবেশ ও নগর ব্যবস্থাপনার সীমাবদ্ধতার কারণে ঢাকা আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে পিছিয়ে রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দীর্ঘদিনের পরিকল্পনাগত দুর্বলতা এবং দ্রুত নগরায়ণের চাপ রাজধানীর জীবনমান উন্নয়নের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
প্রতি বছর বিশ্বের বিভিন্ন শহরের জীবনমান মূল্যায়ন করে লাইভেবিলিটি ইনডেক্স প্রকাশ করে ইআইইউ। স্থিতিশীলতা, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, সংস্কৃতি ও পরিবেশ এবং অবকাঠামো—এই পাঁচটি প্রধান সূচকের ভিত্তিতে শহরগুলোর র্যাংকিং নির্ধারণ করা হয়।
২০২৬ সালের প্রতিবেদনে ঢাকার মোট স্কোর ৪২। সূচকভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, শিক্ষায় ৬৭ স্কোর পেলেও অবকাঠামোতে মাত্র ২৭, স্বাস্থ্যসেবায় ৪২, সংস্কৃতি ও পরিবেশে ৪১ এবং স্থিতিশীলতায় ৪৫ স্কোর অর্জন করেছে রাজধানী।
প্রতিবেদনটি ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, নগর সেবার গুণগত মান ও অবকাঠামোগত সক্ষমতা বাড়ানো না গেলে ঢাকার অবস্থানের উল্লেখযোগ্য উন্নতি কঠিন হবে।
চলতি বছরের সূচকে ডেনমার্কের রাজধানী কোপেনহেগেন বিশ্বের সবচেয়ে বাসযোগ্য শহরের মর্যাদা ধরে রেখেছে। ৯৮ পয়েন্ট নিয়ে টানা দ্বিতীয়বারের মতো শীর্ষে রয়েছে শহরটি।
দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে অস্ট্রিয়ার ভিয়েনা এবং তৃতীয় স্থানে অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্ন। শীর্ষ দশে অস্ট্রেলিয়ার তিনটি শহর স্থান পেয়েছে। এছাড়া জাপানের টোকিও ও ওসাকা, সুইজারল্যান্ডের দুটি শহর এবং কানাডার একটি শহরও তালিকায় রয়েছে।
অন্যদিকে বাসযোগ্যতার দিক থেকে ঢাকার নিচে রয়েছে কেবল সিরিয়ার দামেস্ক এবং লিবিয়ার ত্রিপোলি—দুই যুদ্ধবিধ্বস্ত রাজধানী।
দক্ষিণ এশিয়ার শহরগুলোর মধ্যে ঢাকার অবস্থান উদ্বেগজনক। পাকিস্তানের করাচি ৪৩ স্কোর নিয়ে ঢাকার ঠিক এক ধাপ ওপরে অবস্থান করছে। যদিও এশিয়ার সামগ্রিক গড় স্কোর বেড়ে ৭৪-এ পৌঁছেছে, সেখানে ঢাকার স্কোর আঞ্চলিক গড়ের তুলনায় ৩২ পয়েন্ট কম।
বিশ্লেষকদের মতে, যানজট, বায়ুদূষণ, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, জনসংখ্যার অতিরিক্ত চাপ এবং অপর্যাপ্ত নাগরিক সুবিধা ঢাকার নিম্ন অবস্থানের প্রধান কারণ।
নগর বিশেষজ্ঞদের মতে, রাজধানীতে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক মানুষের আগমন ঘটলেও সে অনুযায়ী অবকাঠামো ও সেবার সম্প্রসারণ হয়নি। স্বাস্থ্যসেবার অসম বণ্টন, জলাবদ্ধতা, গণপরিবহনের সীমাবদ্ধতা এবং পরিবেশগত ঝুঁকি নগর জীবনের মানকে প্রভাবিত করছে।
এ ছাড়া জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, তাপমাত্রা বৃদ্ধি, বায়ুদূষণ এবং সবুজ উন্মুক্ত স্থানের সংকটও ঢাকার বাসযোগ্যতা কমিয়ে দিচ্ছে।
একটি শহরের বাসযোগ্যতা শুধু নাগরিক স্বাচ্ছন্দ্যের বিষয় নয়; এটি বিনিয়োগ, ব্যবসা সম্প্রসারণ, পর্যটন এবং আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, জীবনমানের নিম্ন সূচক বিদেশি বিনিয়োগকারীদের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলতে পারে। একই সঙ্গে দক্ষ জনশক্তি ধরে রাখা এবং আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান আকর্ষণের ক্ষেত্রেও এটি একটি চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।
বিশ্বের সবচেয়ে কম বাসযোগ্য শহরগুলোর মধ্যে ঢাকার অবস্থান অপরিবর্তিত থাকা রাজধানীর দীর্ঘদিনের কাঠামোগত সমস্যাগুলোর প্রতিফলন। শিক্ষা খাতে কিছু অগ্রগতি থাকলেও অবকাঠামো উন্নয়ন, স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণ, পরিবেশ সুরক্ষা এবং কার্যকর নগর পরিকল্পনা ছাড়া অবস্থার উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন সম্ভব নয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, টেকসই ও সমন্বিত উন্নয়ন উদ্যোগ গ্রহণ করা গেলে ভবিষ্যতে ঢাকার বাসযোগ্যতা সূচকে ইতিবাচক পরিবর্তনের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
