কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলায় উত্তম কৃষি চর্চা বা গ্যাপ পদ্ধতিতে বিষমুক্ত করলা চাষ করে ভালো ফলন পেয়েছেন দুই কৃষক। তবে উৎপাদন ভালো হলেও বাজারে বিষমুক্ত ও সাধারণ সবজির জন্য আলাদা ব্যবস্থা না থাকায় প্রত্যাশিত দাম পাচ্ছেন না তারা।
উপজেলার চাঁদপুর ইউনিয়নের ধলনগর গ্রামের দবির উদ্দিন ফারাজী ও আব্দুল বারী তিন বিঘা জমিতে আলিসা জাতের করলা চাষ করেছেন। গত ১০ দিনে তারা প্রায় ২ হাজার ২০০ কেজি করলা বিক্রি করেছেন। স্থানীয় বাজারে প্রতি কেজি করলার পাইকারি দাম ছিল ৩০ থেকে ৫৫ টাকা। এতে তাদের আয় হয়েছে প্রায় ৬৫ থেকে ৭০ হাজার টাকা।
কৃষকদের আশা, আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে আগামী দেড় মাসে আরও ৪ হাজার কেজির বেশি করলা বিক্রি করতে পারবেন। এর বাজারমূল্য হতে পারে প্রায় আড়াই লাখ টাকা।
তবে কৃষকদের অভিযোগ, বিষমুক্ত ও সাধারণ সবজির জন্য আলাদা বাজার বা হাট না থাকায় উভয় ধরনের সবজি প্রায় একই দামে বিক্রি হচ্ছে। তাদের ভাষ্য, গত বছর একই সময়ে প্রতি কেজি করলা ৭০ থেকে ৮০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়েছিল। এবার দাম নেমে এসেছে ৩৫ থেকে ৫৫ টাকায়।
ধলনগর মাঠে গিয়ে দেখা যায়, করলা ক্ষেত নীল রঙের নেট দিয়ে ঘেরা। পোকামাকড় দমনে ব্যবহার করা হয়েছে ফেরোমন ফাঁদ ও জৈব বালাইনাশক। মাটিতে দেওয়া হয়েছে জৈব সার। কৃষকেরা নিজেরাই ক্ষেতের পরিচর্যা ও করলা সংগ্রহ করছেন।
উদ্যোক্তা দবির উদ্দিন জানান, গ্যাপ পদ্ধতিতে চাষ করতে তুলনামূলক বেশি খরচ হয়। জাল, ফাঁদ ও জৈব সারসহ বিভিন্ন উপকরণ কিনতে হয়। তবে এতে ফলন ভালো হয় এবং উৎপাদিত সবজি স্বাস্থ্যকর।
তিন বিঘা জমিতে জমি চাষ, বীজ, উপকরণ ও পরিচর্যা বাবদ প্রায় ১ লাখ ৮০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে বলে জানান তিনি। গত ১০ দিনে প্রায় ২ হাজার ২০০ কেজি করলা উৎপাদন হয়েছে। পাইকারি বাজারে ৩৫ থেকে ৫৫ টাকা কেজি দরে তা বিক্রি করে ৬৫ থেকে ৭০ হাজার টাকা পাওয়া গেছে। আবহাওয়া ভালো থাকলে আরও প্রায় ৪ হাজার ৪০০ কেজি করলা উৎপাদনের প্রত্যাশা করছেন তিনি।
দবির উদ্দিন ও আব্দুল বারীর আশা, একসময় তাদের বিষমুক্ত করলা ঢাকা ও কুষ্টিয়ার বড় বাজারে যাবে। ক্রেতারা পণ্যের লেবেল দেখে কিনবেন এবং তারা ন্যায্য দাম পাবেন।
আব্দুল বারী বলেন, বিষমুক্ত ও সাধারণ সবজি একই বাজারে বিক্রি হওয়ায় সঠিক দাম পাওয়া যাচ্ছে না। বাজারে বিষমুক্ত সবজির জন্য আলাদা কর্নার করা হলে ক্রেতারা বুঝে কিনতে পারবেন এবং কৃষকেরাও ন্যায্য দাম পাবেন।
উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছর কুমারখালীতে বিষমুক্ত তিন বিঘাসহ প্রায় ৫২ হেক্টর জমিতে করলার আবাদ হয়েছে। এসব জমি থেকে প্রায় ৫০০ টন করলা উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে। বাজারমূল্য হিসেবে যার পরিমাণ প্রায় দেড় কোটি টাকার বেশি। উপজেলায় আধুনিক ও মালচিং পদ্ধতিতেও করলার চাষ হচ্ছে।
ধলনগর গ্রামের কৃষক উজ্জল চৌধুরী প্রায় পাঁচ বিঘা জমিতে বিভিন্ন ফসল চাষ করেন। গত বছর আট কাঠা জমিতে করলা চাষ করে প্রায় ১২ হাজার টাকা খরচে ৬০ হাজার টাকার করলা বিক্রি করেছিলেন তিনি। এবার ১০ কাঠা জমিতে করলা চাষ করেছেন। গত এক সপ্তাহে ৯০ কেজি করলা বিক্রি করেছেন। ন্যায্যমূল্য পেলে আগামী বছর আরও বেশি জমিতে করলা চাষ করবেন বলে জানান তিনি।
একই গ্রামের মোহন শেখ জানান, গত বছর এক বিঘা জমিতে মালচিং পদ্ধতিতে করলা চাষে প্রায় ৫০ হাজার টাকা খরচ করে দেড় লাখ টাকার করলা বিক্রি করেছিলেন। চলতি বছর আগাম করলা চাষে প্রায় ৬০ হাজার টাকা খরচ করে দেড় লাখ টাকার করলা বিক্রি করেছেন। কৃষি প্রণোদনা পেলে আগামী বছর মালচিংয়ের পাশাপাশি বিষমুক্ত করলা চাষ করতে চান তিনি।
উত্তম কৃষি চর্চা বা গুড এগ্রিকালচারাল প্র্যাকটিসেস এমন একটি পরিবেশবান্ধব কৃষি পদ্ধতি, যার লক্ষ্য নিরাপদ ও মানসম্মত খাদ্য উৎপাদন, পরিবেশের ভারসাম্য ও মাটির স্বাস্থ্য রক্ষা এবং কৃষকদের নিরাপদ কর্মপরিবেশ ও সঠিক মূল্যায়ন নিশ্চিত করা।
অন্যদিকে, মালচিং পদ্ধতিতে গাছের গোড়া বা মাটির ওপর খড়, পাতা, কচুরিপানা কিংবা প্লাস্টিকের শিট দিয়ে সুরক্ষা স্তর তৈরি করা হয়। এতে মাটির আর্দ্রতা ধরে রাখা, আগাছা দমন, তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ ও মাটির ক্ষয়রোধে সহায়তা করে।
যদুবয়রা ইউনিয়নের জোতমোড়া গ্রামের কৃষক আব্দুল মাজেদ ২০ শতাংশ জমিতে নাবিলা ও আলিসা জাতের করলা চাষ করেছেন। তিনি জানান, চারা রোপণের ৪০ দিন পর ফলন শুরু হয়েছে। প্রতি বিঘায় ৩৫ থেকে ৪০ হাজার টাকা খরচ করে প্রায় ৫৫ থেকে ৬০ মণ করলা উৎপাদন হচ্ছে। তবে গতবারের তুলনায় দাম কম থাকায় লাভ সীমিত হচ্ছে।
পান্টি তহবাজারের আড়ৎদার মিলন হোসেন জানান, হাটে বিষমুক্ত সবজির জন্য আলাদা কর্নার নেই। ২০ দিন আগে করলা ৫৫ থেকে ৬০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হলেও বর্তমানে পাইকারি দাম ৩০ থেকে ৩৫ টাকা।
উপজেলা উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা মো. বিল্টু হোসেন জানান, চলতি মৌসুমে তিন বিঘা জমিতে উত্তম কৃষি চর্চা এবং অন্যান্য জমিতে মালচিং পদ্ধতিতে করলা চাষ করা হয়েছে। শুধু ধলনগর গ্রামেই প্রায় ২১ বিঘা জমিতে করলা চাষ হয়েছে। বাজারে পৃথক কর্নার করা গেলে বিষমুক্ত সবজি চাষে কৃষকের আগ্রহ বাড়বে বলে মনে করেন তিনি।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. মনির হোসেন বলেন, চলতি বছর উপজেলায় ৫২ হেক্টর জমিতে করলা চাষ হয়েছে। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ৫০০ মেট্রিক টন, যার বাজারমূল্য প্রায় দেড় কোটি টাকার বেশি।
তিনি আরও জানান, গ্যাপ পদ্ধতিতে উৎপাদিত সবজি স্বাস্থ্যের জন্য নিরাপদ। কৃষকদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। তবে বাজারজাতকরণের জন্য আলাদা ব্যবস্থা প্রয়োজন। উপজেলা পর্যায়ে বিষমুক্ত সবজির জন্য আলাদা হাট বসানোর প্রস্তাব ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হবে।
ব্যাপক উৎপাদন নিশ্চিত করা গেলে প্রতিটি হাটে বিষমুক্ত সবজির আলাদা কর্নার করার আশ্বাস দিয়েছেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফারজানা আখতার।
