বিশ্বকাপের উত্তাপ পেরিয়ে নতুন মৌসুমে ফিরছে ইউরোপের ক্লাব ফুটবল। ২০২৬-২৭ মৌসুমে জার্মানির বুন্দেসলিগায়ও আলোচনার কেন্দ্রে বর্তমান চ্যাম্পিয়ন বায়ার্ন মিউনিখ। সর্বশেষ ১৪ মৌসুমে ১৩ বার শিরোপা জেতা বায়ার্ন এবারও সবচেয়ে বড় ফেবারিট। তবে বরুশিয়া ডর্টমুন্ড, বায়ার লেভারকুসেন ও লাইপজিগ ব্যবধান কমিয়ে জার্মান জায়ান্টদের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে চাইবে।
বুন্দেসলিগার সাম্প্রতিক ইতিহাসে বায়ার্নের আধিপত্য এতটাই প্রবল যে শিরোপা দৌড়কে অনেক সময় এক ঘোড়ার রেসের সঙ্গে তুলনা করা হয়। গত মৌসুমেও চার ম্যাচ হাতে রেখেই চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল মিউনিখের দলটি। পুরো মৌসুমে ১২২ গোল করা বায়ার্নের হয়ে হ্যারি কেইন একাই করেছিলেন ৩৬ গোল।
তবে দীর্ঘদিনের আধিপত্যের সঙ্গে বাড়ে প্রত্যাশার চাপও। বায়ার্ন কোচ ভিনসেন্ট কোম্পানির দলের কাছে ঘরোয়া শিরোপা জয় যেন সাফল্যের চেয়ে দায়িত্বের অংশ। ফলে সামান্য ব্যর্থতাও প্রশ্নের জন্ম দিতে পারে। নতুন মৌসুমে চ্যাম্পিয়নস লিগ ও ঘরোয়া প্রতিযোগিতার ব্যস্ততা সামলে ধারাবাহিকতা ধরে রাখাই হবে বায়ার্নের বড় পরীক্ষা।
কেইনের গোল করার দক্ষতা, মাইকেল ওলিসের গতি ও পাসিং এবং দলের অভিজ্ঞতা বায়ার্নকে এগিয়ে রাখছে। তবে আন্তর্জাতিক ফুটবলের ব্যস্ত সূচির পর খেলোয়াড়দের ক্লান্তি এবং মৌসুমের শুরুতে পয়েন্ট হারানো তাদের জন্য বিপদ ডেকে আনতে পারে।
বায়ার্নের সঙ্গে ব্যবধান কমানোর প্রধান দাবিদারদের মধ্যে রয়েছে বরুশিয়া ডর্টমুন্ড। তবে দলটির স্কোয়াড এখনো পুরোপুরি গুছিয়ে উঠেছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন আছে। প্রাক্-মৌসুম প্রস্তুতিতে সেই ঘাটতি দেখা গেছে। দলবদলের বাজারে আরও কিছু খেলোয়াড় দলে যোগ দিতে পারেন।
বিশ্বকাপের পর চোট ও খেলোয়াড়দের দেরিতে ফেরার কারণে ডর্টমুন্ড কোচ নিকো কোভাচ শুরু থেকেই তাঁর বেশ কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ ফুটবলারকে পাননি।
তবে ডর্টমুন্ডের বড় সমস্যা স্কোয়াডের মানের চেয়ে পারফরম্যান্সের ধারাবাহিকতা। বড় দলের বিপক্ষে জয়ের সামর্থ্য থাকলেও মাঝারি মানের প্রতিপক্ষের বিপক্ষে পয়েন্ট হারানোর প্রবণতা রয়েছে তাদের। বায়ার্নকে চাপে ফেলতে হলে এই জায়গাটিই আগে ঠিক করতে হবে।
বায়ার লেভারকুসেনও এবার শিরোপার দৌড়ে গুরুত্বপূর্ণ দল। সর্বশেষ ১৪ মৌসুমে বায়ার্ন ছাড়া একমাত্র লেভারকুসেনই একবার বুন্দেসলিগা জিতেছে। তবে নতুন মৌসুমে তাদের ডাগআউটে নেই জাবি আলোনসো; দায়িত্বে আছেন কার্সেল মার্তিনেজ নভেল।
লেভারকুসেনের অন্যতম শক্তি তাদের সুসংগঠিত ফুটবল কাঠামো। নতুন খেলোয়াড়দের দলের খেলার ধরনে দ্রুত মানিয়ে নেওয়ার মতো খেলোয়াড় খুঁজে নেওয়ার ক্ষেত্রেও ক্লাবটির সুনাম রয়েছে। ফলে কোচ বদলালেও দলটি প্রতিদ্বন্দ্বিতার বাইরে চলে যাবে—এমনটা মনে করার কারণ নেই।
লাইপজিগও নতুন মৌসুমে শীর্ষ লড়াইয়ে প্রভাব ফেলতে পারে। দ্রুত আক্রমণ এবং প্রতিপক্ষকে চাপে ফেলার মতো শক্তি রয়েছে তাদের। কিন্তু পুরো মৌসুমে শিরোপা-দাবিদার হিসেবে টিকে থাকার মতো ধারাবাহিকতা এখনো দেখাতে পারেনি দলটি।
বায়ার্ন কিংবা ডর্টমুন্ডের বিপক্ষে গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট কেড়ে নিয়ে শিরোপার লড়াই জমিয়ে তুলতে পারে লেভারকুসেন ও লাইপজিগ। তবে নিজেদের চ্যাম্পিয়ন হওয়ার মতো অবস্থানে নিয়ে যাওয়া তাদের জন্য কঠিন হতে পারে।
জার্মান ফুটবলের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হাই-প্রেসিং, দ্রুত আক্রমণে ওঠা এবং একসঙ্গে অনেক খেলোয়াড়কে সামনে তুলে নেওয়া। এর ফলে ম্যাচে গোলের সুযোগ যেমন বাড়ে, তেমনি রক্ষণে ফাঁক তৈরি হওয়ার সম্ভাবনাও থাকে। আর সেই ফাঁক কাজে লাগিয়ে পাল্টা আক্রমণে ম্যাচের চিত্র বদলে দিতে পারে প্রতিপক্ষ।
২০২৫-২৬ মৌসুমে বুন্দেসলিগায় ২৯৭টি ম্যাচে মোট ৯৫৭ গোল হয়েছিল। অর্থাৎ ম্যাচপ্রতি গোলের সংখ্যা ছিল তিনের বেশি। নতুন মৌসুমেও এই আক্রমণাত্মক ফুটবলের ধারাবাহিকতা থাকার সম্ভাবনাই বেশি।
বায়ার্নের সামনে তাই আবারও চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেবে ডর্টমুন্ড, লেভারকুসেন ও লাইপজিগ। কেউ হয়তো দীর্ঘ সময় প্রতিদ্বন্দ্বিতায় থাকবে, কেউবা সাময়িকভাবে শিরোপার লড়াইয়ে উত্তাপ ছড়াবে। তবে বর্তমান শক্তি ও সাম্প্রতিক ইতিহাস বিবেচনায় মৌসুম শেষে বুন্দেসলিগার ট্রফি আবারও মিউনিখে যাওয়ার সম্ভাবনাই সবচেয়ে বেশি।
