দুই দিন বৃষ্টির তীব্রতা কিছুটা কমলেও ১৬ জুলাই থেকে নতুন করে সক্রিয় হতে পারে মৌসুমি বায়ু
দেশজুড়ে টানা বর্ষণের মধ্যে সাময়িক বিরতির আভাস দিলেও আগামী বৃহস্পতিবার থেকে আবারও ভারী থেকে অতিভারী বৃষ্টিপাতের আশঙ্কা রয়েছে বলে জানিয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তর। একই সঙ্গে উত্তর ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের অন্তত নয়টি জেলার নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চলে নতুন করে বন্যা দেখা দিতে পারে অথবা বিদ্যমান পরিস্থিতির আরও অবনতি হওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেছে বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র।
আবহাওয়া সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে মৌসুমি বায়ু বাংলাদেশের ওপর অত্যন্ত সক্রিয় অবস্থায় রয়েছে। এর প্রভাবে দেশের অধিকাংশ এলাকায় কয়েক দিন ধরে অব্যাহত বৃষ্টিপাত হচ্ছে। যদিও আগামী ৪৮ ঘণ্টায় বৃষ্টির তীব্রতা কিছুটা কমতে পারে, তবে ১৬ জুলাই থেকে পুনরায় বৃষ্টির প্রবণতা উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ার পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।
সাম্প্রতিক কয়েক দিনের ভারী বর্ষণে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে জনজীবন ব্যাহত হয়েছে। আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, রোববার সকাল থেকে সোমবার সকাল পর্যন্ত ২৭ ঘণ্টায় ঢাকায় ১১০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। সোমবারও রাজধানীতে প্রায় ৯৭ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে।
অন্যদিকে চট্টগ্রাম শহরের আমবাগান এলাকায় দেশের সর্বোচ্চ ১৭৪ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। টানা বর্ষণের কারণে অনেক এলাকায় জলাবদ্ধতা, যানজট এবং স্বাভাবিক কার্যক্রমে বিঘ্ন সৃষ্টি হয়েছে।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের বিশেষ পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, আগামী দুই দিনে বৃষ্টিপাতের প্রকোপ কিছুটা কমলেও ১৬ ও ১৭ জুলাই থেকে সারা দেশে আবারও মাঝারি থেকে অতিভারী বৃষ্টিপাত হতে পারে।
এ সময় দেশের অধিকাংশ এলাকায় বজ্রসহ বৃষ্টি, দমকা হাওয়া এবং কোথাও কোথাও অতিভারী বর্ষণের সম্ভাবনা রয়েছে। আবহাওয়াবিদদের মতে, সক্রিয় মৌসুমি বায়ু এবং বঙ্গোপসাগরীয় আবহাওয়াগত প্রভাব মিলিয়ে নতুন করে ভারী বর্ষণের পরিবেশ তৈরি হচ্ছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানিয়েছে, সুরমা, কুশিয়ারা ও সোমেশ্বরী নদীর কয়েকটি পয়েন্টে পানি বিপৎসীমার ওপরে প্রবাহিত হচ্ছে।
বর্তমানে সিলেট, সুনামগঞ্জ, নেত্রকোনা, শেরপুর, ময়মনসিংহ, নীলফামারী, লালমনিরহাট, রংপুর এবং কুড়িগ্রাম জেলার নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চল বন্যার ঝুঁকিতে রয়েছে। আগামী ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে এসব এলাকায় স্বল্পমেয়াদি বন্যা দেখা দিতে পারে অথবা বিদ্যমান বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হতে পারে।
তবে পার্বত্য অঞ্চলের পরিস্থিতি কিছুটা উন্নতির দিকে যাচ্ছে বলে পূর্বাভাসে উল্লেখ করা হয়েছে। বিশেষ করে সাঙ্গু ও মাতামুহুরি নদী অববাহিকার কিছু এলাকায় পানি কমার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।
আবহাওয়া বিশেষজ্ঞদের মতে, উত্তর-পশ্চিম বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট নিম্নচাপ ধীরগতিতে অগ্রসর হওয়ায় দীর্ঘ সময় ধরে বঙ্গোপসাগর থেকে বিপুল পরিমাণ জলীয় বাষ্প বাংলাদেশে প্রবেশ করছে।
এই আর্দ্র বায়ু চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি অঞ্চল, ভারতের ত্রিপুরা এবং মিয়ানমারের পার্বত্য এলাকায় বাধাপ্রাপ্ত হয়ে ওরোগ্রাফিক প্রভাব সৃষ্টি করছে। এর ফলে এসব অঞ্চলে দীর্ঘস্থায়ী ভারী থেকে অতিভারী বৃষ্টিপাত হচ্ছে।
এ ছাড়া সক্রিয় মৌসুমি বায়ু, বায়ুপ্রবাহের পরিবর্তন এবং বৈশ্বিক জলবায়ুগত প্রভাবও চলমান আবহাওয়ার পেছনে ভূমিকা রাখছে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।
টানা বৃষ্টির প্রভাবে রাজধানীর গুলশান-শাহজাদপুর লিংক রোডের একটি অংশ ধসে পড়েছে। দীর্ঘ সময় জলাবদ্ধতা এবং পানির চাপের কারণে সড়কের নিচের মাটি সরে যাওয়ায় এ ঘটনা ঘটেছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
ধসে পড়া অংশে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তবে ওই সড়কে যান চলাচল ব্যাহত হচ্ছে এবং অতিরিক্ত যানজট তৈরি হচ্ছে। স্থানীয় বাসিন্দারা সম্ভাব্য দুর্ঘটনার আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন।
অব্যাহত বর্ষণে একদিকে কৃষিজমিতে পর্যাপ্ত পানি সরবরাহ নিশ্চিত হলেও অন্যদিকে বন্যা ও জলাবদ্ধতার কারণে ফসল, যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং দৈনন্দিন জীবনযাত্রা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আগামী কয়েক দিনে অতিভারী বৃষ্টিপাত হলে নিম্নাঞ্চলে নতুন করে জলাবদ্ধতা, নদীভাঙন এবং বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হতে পারে। তাই ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার বাসিন্দাদের সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
দুই দিনের সাময়িক স্বস্তির পর বৃহস্পতিবার থেকে দেশের আবহাওয়ায় আবারও বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলছে। সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে অতিভারী বৃষ্টিপাত ও বন্যা পরিস্থিতি নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করতে পারে। ফলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পাশাপাশি সাধারণ মানুষকেও পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে প্রয়োজনীয় সতর্কতা অবলম্বনের আহ্বান জানিয়েছেন আবহাওয়া ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞরা।
