রপ্তানি, বিনিয়োগ ও প্রযুক্তিতে নতুন সম্ভাবনার ইঙ্গিত; খাদ্য মূল্যস্ফীতি নিয়ে সতর্কতা
বৈশ্বিক অর্থনীতির ধীরগতির পর পুনরুদ্ধারের যে লক্ষণ দেখা যাচ্ছে, তা বাংলাদেশের জন্য নতুন সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠান এইচএসবিসির প্রধান এশিয়া অর্থনীতিবিদ ফ্রেডেরিক নিউম্যান। তাঁর মতে, বিশ্ববাজারে ভোক্তা ব্যয় বৃদ্ধি, জ্বালানি দামের পতন এবং অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক সংস্কার বাংলাদেশের রপ্তানি ও বিনিয়োগ প্রবাহকে শক্তিশালী করতে সহায়ক হবে।
সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, গত কয়েক বছরের বৈশ্বিক অস্থিরতা, ভূরাজনৈতিক সংঘাত এবং উচ্চ জ্বালানি ব্যয়ের চাপ মোকাবিলা করে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক স্থিতিস্থাপকতার পরিচয় দিয়েছে। এখন আন্তর্জাতিক বাজারে চাহিদা বাড়তে শুরু করায় দেশটির রপ্তানিমুখী শিল্প, বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাত নতুন গতি পেতে পারে।
ফ্রেডেরিক নিউম্যানের মতে, ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানি ব্যয় কমে যাওয়ায় সাধারণ ভোক্তাদের হাতে অতিরিক্ত অর্থ থাকবে, যা ভোগব্যয় বাড়াতে ভূমিকা রাখবে। এর সরাসরি সুফল পেতে পারে বাংলাদেশের রপ্তানি খাত।
তিনি বলেন, গত বছর পোশাক রপ্তানিতে কিছুটা অনিশ্চয়তা থাকলেও বর্তমানে বাজার পরিস্থিতি তুলনামূলক স্থিতিশীল। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে পূর্বের তুলনায় বেশি পূর্বাভাসযোগ্যতা তৈরি হয়েছে, যা বছরের দ্বিতীয়ার্ধে রপ্তানি প্রবাহকে আরও স্থিতিশীল করতে পারে।
এইচএসবিসির সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি প্রায় ৪ দশমিক ৪ শতাংশ হতে পারে। আন্তর্জাতিক বাজারের চাপ কমে আসা এবং দেশের ভেতরে সংস্কার কার্যক্রম এ প্রবৃদ্ধিকে সহায়তা করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
জ্বালানি খাতে স্বস্তি এলেও খাদ্যপণ্যের দাম আগামী সময়ে নতুন উদ্বেগের কারণ হতে পারে বলে সতর্ক করেছেন নিউম্যান।
তাঁর মতে, এল নিনো আবহাওয়া পরিস্থিতির কারণে ভারত, ইন্দোনেশিয়া ও ফিলিপাইনের মতো কৃষিনির্ভর অর্থনীতিতে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। এর প্রভাব আন্তর্জাতিক খাদ্যবাজারে পড়তে পারে, যা বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর দেশগুলোকেও প্রভাবিত করতে পারে।
তবে দেশের কৃষি উৎপাদন স্থিতিশীল থাকলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব বলেও তিনি মনে করেন।
বাংলাদেশ ও চীনের ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক সহযোগিতাকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন এই অর্থনীতিবিদ। তাঁর মতে, দীর্ঘ রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার পর আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের কাছে বাংলাদেশকে ব্যবসাবান্ধব গন্তব্য হিসেবে তুলে ধরতে এ ধরনের অংশীদারিত্ব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
তিনি বলেন, চীনের অর্থনীতি কিছু চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হলেও বাংলাদেশের মতো দেশে বিনিয়োগের সক্ষমতা তাদের রয়েছে। বিশেষ করে নবায়নযোগ্য জ্বালানি, অবকাঠামো ও প্রযুক্তি খাতে চীনের অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের উন্নয়নে সহায়ক হতে পারে।
তবে তিনি একক কোনো দেশের ওপর নির্ভরশীল না হয়ে বহুমুখী আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্ব গড়ে তোলার পরামর্শ দেন।
বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক অগ্রগতির জন্য অবকাঠামো উন্নয়নকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন নিউম্যান।
তাঁর মতে, সড়ক যোগাযোগ, বন্দর সুবিধা, বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং নগর অবকাঠামোয় ধারাবাহিক বিনিয়োগ ছাড়া উচ্চতর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন কঠিন হবে।
তিনি আরও বলেন, বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা এবং উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে দক্ষতা বাড়ানো প্রয়োজন। একই সঙ্গে রাজস্ব আদায় বাড়াতে কার্যকর আর্থিক সংস্কারও জরুরি।
বাংলাদেশকে প্রায়ই মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর বা শ্রীলঙ্কার সঙ্গে তুলনা করা হলেও নিউম্যান মনে করেন, এসব তুলনায় ঐতিহাসিক ও কাঠামোগত বাস্তবতা বিবেচনায় নেওয়া হয় না।
তাঁর ভাষ্য, বাংলাদেশের বিপুল জনসংখ্যা, সীমিত প্রাকৃতিক সম্পদ এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি উন্নয়নের পথে বাড়তি চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। তবুও ধারাবাহিক উন্নয়ন নীতি ও জনসম্পৃক্ততা থাকলে ভবিষ্যতে বাংলাদেশ আরও উন্নত অর্থনীতিতে পরিণত হওয়ার সম্ভাবনা রাখে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তিকে বাংলাদেশের জন্য সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র হিসেবে দেখছেন এইচএসবিসির প্রধান এশিয়া অর্থনীতিবিদ।
তাঁর মতে, তরুণ জনসংখ্যা ও প্রযুক্তি গ্রহণের সক্ষমতার কারণে বাংলাদেশ নতুন ডিজিটাল অর্থনীতিতে দ্রুত অগ্রসর হতে পারে। এআই শুধু প্রচলিত কিছু কাজের ধরন বদলাবে না, বরং নতুন বাজার ও সেবাখাতও তৈরি করবে।
এ সুযোগ কাজে লাগাতে ডিজিটাল অবকাঠামো উন্নয়ন এবং প্রশাসনিক জটিলতা কমানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
জাতিসংঘের স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বাংলাদেশের উত্তরণ সামনে রেখে নিউম্যান বলেন, বাণিজ্য সুবিধা অব্যাহত থাকলে তা সহায়ক হবে। তবে দেশের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সাফল্য মূলত অভ্যন্তরীণ সংস্কার কার্যক্রমের ওপর নির্ভর করবে।
তাঁর মতে, এলডিসি মর্যাদা পরিবর্তনের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো অর্থনৈতিক কাঠামো শক্তিশালী করা, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা এবং উৎপাদনশীলতা বাড়ানো।
বিশ্ব অর্থনীতিতে ধীরে ধীরে স্থিতিশীলতা ফিরে আসার প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ নতুন প্রবৃদ্ধির সুযোগের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। রপ্তানি বৃদ্ধি, বিদেশি বিনিয়োগ, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং প্রযুক্তিগত অগ্রগতি দেশের অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী করতে পারে। তবে খাদ্য মূল্যস্ফীতি, বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা এবং প্রয়োজনীয় সংস্কার বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করেই সেই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে হবে।
