কুড়িগ্রামের চিলমারী উপজেলার সড়কটারী এলাকায় ব্রহ্মপুত্র নদের ডান তীর রক্ষা বাঁধে নতুন করে ধস দেখা দিয়েছে। সোমবার সন্ধ্যায় ধস শুরু হওয়ার পর স্থানীয় এক বাসিন্দার মাইকিংয়ে সাড়া দিয়ে কয়েক শ মানুষ রাতেই নদীপাড়ে ছুটে এসে ভাঙন প্রতিরোধের কাজে অংশ নেন। মঙ্গলবার থেকে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)ও জরুরি ভিত্তিতে জিও ব্যাগ ফেলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা শুরু করেছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, সোমবার সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার দিকে রানীগঞ্জ ইউনিয়নের সড়কটারী এলাকায় নদীর প্রবল স্রোত ও ঘূর্ণির কারণে ডান তীর রক্ষা বাঁধের প্রায় ৩০ মিটার অংশ ধসে নদীগর্ভে বিলীন হতে শুরু করে। বিষয়টি প্রথম দেখতে পান স্থানীয় বাসিন্দা ফরজ উদ্দিন (৭০)। তিনি দ্রুত পাশের সড়কটারী জামে মসজিদে গিয়ে মাইকে ঘোষণা দেন, “যার যা কিছু আছে, তাই নিয়ে নদীপাড়ে চলে আসেন, বাঁধ ভাঙছে।”
মাইকিংয়ের কিছুক্ষণের মধ্যেই প্রায় পাঁচ শতাধিক মানুষ নদীতীরে জড়ো হয়ে জিও ব্যাগে বালু ভরে ভাঙন ঠেকানোর কাজে অংশ নেন।
ফরজ উদ্দিন জানান, ধসের সময় তিনি নদীপাড়েই অবস্থান করছিলেন। একের পর এক ব্লক নদীতে তলিয়ে যেতে দেখে তিনি পরিস্থিতির ভয়াবহতা অনুধাবন করেন। তাঁর ভাষায়, স্থানীয় মানুষ দ্রুত এগিয়ে না এলে বাঁধের আরও বড় অংশ ভেঙে যেতে পারত।
তবে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, বর্তমান ব্যবস্থা দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর হবে না। তাঁর মতে, এই বাঁধ ভেঙে গেলে কাঁচকোল, চিলমারীসহ আশপাশের বিস্তীর্ণ এলাকা হুমকির মুখে পড়বে। এক মাসে চারবার ধসের ঘটনায় হাজার হাজার হেক্টর কৃষিজমি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মসজিদ এবং কয়েক হাজার পরিবার ঝুঁকিতে রয়েছে। স্থায়ী সমাধানের জন্য তিনি টি-বাঁধ নির্মাণের দাবি জানান।
মঙ্গলবার দুপুরে ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায়, পানি উন্নয়ন বোর্ডের তত্ত্বাবধানে শ্রমিকেরা জিও ব্যাগ ফেলছেন। একই সঙ্গে একটি কারিগরি দল নদীর গভীরতা ও তলদেশের অবস্থা পরিমাপ করছে।
স্থানীয় বাসিন্দা ফেলানী বেওয়া (৭৫) বলেন, হঠাৎ নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়ে ব্লকগুলো দ্রুত নদীতে পড়ে যেতে থাকে। ভাঙনের আতঙ্কে এলাকার মানুষ চরম উদ্বেগের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। তিনি নদীভাঙন থেকে স্থায়ী সুরক্ষার জন্য সরকারের হস্তক্ষেপ কামনা করেন।
ভাঙন প্রতিরোধকাজে নিয়োজিত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি সর্দার মজিবুর রহমান জানান, ১ জুলাই প্রথম ধসের পর চার দফায় ২৪ হাজার জিও ব্যাগ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। তবে কালিরকূড়া থেকে কাঁচকোল টি-বাঁধ পর্যন্ত প্রায় এক কিলোমিটার এলাকায় অন্তত ১০টি স্থানে ভাঙন দেখা দিয়েছে। প্রবল স্রোতের কারণে ফেলা জিও ব্যাগের কার্যকারিতাও অনেক ক্ষেত্রে কমে যাচ্ছে। তাঁর মতে, অন্তত এক লাখ জিও ব্যাগ এবং তিনটি টি-বাঁধ নির্মাণ করা গেলে ভাঙনের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব।
স্থানীয়দের ভাষ্য, গত বৃহস্পতিবার একই বাঁধের প্রায় ৬০ মিটার অংশ ধসে যায়। চলতি জুলাই মাসেই চারটি স্থানে প্রায় ২০০ মিটার এলাকাজুড়ে ধসের ঘটনা ঘটেছে। এতে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ, বসতবাড়ি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় স্থাপনা ও বিস্তীর্ণ আবাদি জমি হুমকির মুখে পড়েছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা যায়, ২০১৬ সালে ৪৪৮ কোটি টাকা ব্যয়ে ব্রহ্মপুত্র নদের ডান তীর রক্ষা প্রকল্পের আওতায় বাঁধটি নির্মাণ করা হয়। তবে নির্মাণের দুই বছর পর থেকেই বিভিন্ন স্থানে ধস দেখা দিতে শুরু করে। এরপর একাধিকবার সংস্কার করা হলেও স্থায়ী সমাধান মেলেনি।
কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রাকিবুল হাসান বলেন, ব্রহ্মপুত্রের পূর্ব তীরে নতুন চর জেগে ওঠায় মূল স্রোত পশ্চিম তীরের দিকে সরে এসেছে। ফলে পানির উচ্চতা ও স্রোতের চাপ বেড়ে চলতি মাসে চারটি স্থানে ধসের সৃষ্টি হয়েছে।
তিনি জানান, ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে ২৪ হাজার জিও ব্যাগ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে এবং মঙ্গলবার পর্যন্ত ১৪ হাজার বালুভর্তি জিও ব্যাগ ডাম্পিং করা হয়েছে। ভাঙনরোধে কাজ অব্যাহত রয়েছে।
স্থায়ী সমাধান প্রসঙ্গে রাকিবুল হাসান বলেন, পুরো বাঁধ পুনর্বাসনের জন্য আগে একটি প্রকল্প অনুমোদনের জন্য পাঠানো হলেও তা অনুমোদিত হয়নি। নতুন করে প্রকল্প প্রস্তাব পাঠানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। অনুমোদন পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় বরাদ্দের মাধ্যমে স্থায়ী প্রতিরোধব্যবস্থা গড়ে তোলা হবে।
