কক্সবাজারের মহেশখালীর প্রতিবেশ সংকটাপন্ন সমুদ্র চ্যানেল থেকে পরিবেশগত ছাড়পত্র ছাড়াই বালু উত্তোলনের দায়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান টোকিও-ম্যাক্স ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেডকে ৫০ লাখ ৩৭ হাজার ৭৮০ টাকা ক্ষতিপূরণ পরিশোধের নির্দেশ দিয়েছে পরিবেশ অধিদপ্তর।
নির্দেশনায় বলা হয়েছে, আগামী সাত কর্মদিবসের মধ্যে সরকারের নির্ধারিত অর্থনৈতিক কোডে ক্ষতিপূরণের অর্থ জমা দিতে হবে। অন্যথায় প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
পরিবেশ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, ১৯ জুলাই চট্টগ্রাম আঞ্চলিক কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত একটি এনফোর্সমেন্ট মামলার শুনানি শেষে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক (অতিরিক্ত দায়িত্ব) সোনিয়া সুলতানা স্বাক্ষরিত আদেশের বিষয়টি মঙ্গলবার গণমাধ্যমকে জানানো হয়।
এ ঘটনায় টোকিও-ম্যাক্স ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেডের তিন কর্মকর্তাকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। তাঁরা হলেন প্রকল্প পরিচালক মো. আকবর হোসেন পাটোয়ারী, ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আলমগীর এবং প্রকল্প ব্যবস্থাপক কোজিমা।
পরিবেশ অধিদপ্তরের কক্সবাজার কার্যালয়ের উপপরিচালক খন্দকার মাহমুদ পাশা জানান, প্রতিষ্ঠানটি পরিবেশগত ছাড়পত্র ছাড়াই প্রায় দুই মাস ধরে মহেশখালী চ্যানেলের হামিদিয়াদিয়া ও ঠাকুরতলা এলাকা থেকে প্রায় দুই লাখ ঘনফুট বালু উত্তোলন করেছে। সরেজমিন তদন্তে ভারী ড্রেজারের মাধ্যমে সমুদ্রতল থেকে বালু উত্তোলনের প্রমাণ পাওয়া গেছে।
তিনি বলেন, উত্তোলিত বালু মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরের সংযোগ সড়ক নির্মাণকাজে ব্যবহার করা হচ্ছে। পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫ (সংশোধিত ২০১০) অনুযায়ী পরিবেশগত ছাড়পত্র ছাড়া সমুদ্র চ্যানেল থেকে বালু উত্তোলন শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এ কারণেই প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে ক্ষতিপূরণ আরোপ করা হয়েছে।
এর আগে গত ১৬ এপ্রিল প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে মহেশখালী চ্যানেল থেকে বালু উত্তোলনের অনুমোদন ও মূল্য নির্ধারণ নিয়ে বিতর্কের বিষয়টি উঠে আসে। প্রতিবেদনে বলা হয়, মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরের একটি সড়ক নির্মাণ প্রকল্পে ব্যবহারের জন্য ৬ কোটি ৩৫ লাখ ঘনফুট বালু উত্তোলনের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। যদিও বাজারে প্রতি ঘনফুট বালুর মূল্য প্রায় ১৬ টাকা, সেখানে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটির কাছে তা বিক্রি করা হচ্ছে মাত্র ২ টাকা ৩৭ পয়সা দরে।
কক্সবাজার জেলা বালুমহাল ব্যবস্থাপনা কমিটি গত ২ এপ্রিল এ অনুমোদন দেয়। কমিটির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন জেলা প্রশাসক মো. আবদুল মান্নান।
বিষয়টি নিয়ে আপত্তি জানিয়ে ৭ এপ্রিল পরিবেশবিষয়ক তিনটি সংগঠন জেলা প্রশাসকের কাছে স্মারকলিপি দেয়। সংগঠনগুলোর দাবি, মহেশখালী চ্যানেল থেকে বিপুল পরিমাণ বালু উত্তোলনের ফলে কক্সবাজার বিমানবন্দরের সম্প্রসারিত রানওয়ে ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। পাশাপাশি নদীভাঙন বৃদ্ধি, জলপ্রবাহে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি এবং জীববৈচিত্র্যের ক্ষতির আশঙ্কাও রয়েছে।
অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে পরিবেশ অধিদপ্তর প্রতিষ্ঠানটিকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেয় এবং পরে একটি এনফোর্সমেন্ট মামলা দায়ের করে। গত ১৯ জুলাই চট্টগ্রাম আঞ্চলিক কার্যালয়ে প্রতিষ্ঠানটির প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। শুনানি শেষে ক্ষতিপূরণের অর্থ নির্ধারণ করা হয়।
এদিকে মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর সংযোগ সড়ক প্রকল্পে বালু উত্তোলন ও মূল্য নির্ধারণের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে গত ১৫ জুন হাইকোর্টে জনস্বার্থে রিট আবেদন করেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী সোহানা শারমিন।
তিনি বলেন, বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইন, ২০১০ অনুযায়ী সরকারি প্রকল্পে বালু সরবরাহ বা ইজারা প্রদানের ক্ষেত্রে উন্মুক্ত দরপত্র আহ্বান বাধ্যতামূলক। কিন্তু সংশ্লিষ্ট প্রকল্পে কোনো প্রতিযোগিতামূলক প্রক্রিয়া ছাড়াই একটি নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে বালু উত্তোলন ও সরবরাহের অনুমতি দেওয়া হয়েছে, যা প্রচলিত আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
