দূরবর্তী নক্ষত্রের আলোয় এত দিন আড়ালে থাকা অনেক ভিনগ্রহকে আরও স্পষ্টভাবে পর্যবেক্ষণের সুযোগ তৈরি করতে যাচ্ছে নাসার নতুন ন্যান্সি গ্রেস রোমান স্পেস টেলিস্কোপ। টেলিস্কোপটির নতুন প্রযুক্তি সফলভাবে কাজ করলে নক্ষত্রের পাশে থাকা অনুজ্জ্বল গ্রহের সরাসরি ছবি তোলা সহজ হতে পারে।
নাসার পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৭ সালের শুরুতেই রোমান স্পেস টেলিস্কোপের প্রথম বৈজ্ঞানিক ছবি প্রকাশ করা হতে পারে। এসব ছবিতে এমন কিছু দূরবর্তী জগত দেখা যেতে পারে, যেগুলো এত দিন নক্ষত্রের তীব্র আলোর কারণে সরাসরি পর্যবেক্ষণ করা কঠিন ছিল।
রোমান স্পেস টেলিস্কোপের গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষামূলক যন্ত্রগুলোর একটি হলো ‘করোনাগ্রাফ ইনস্ট্রুমেন্ট’। এর মূল কাজ হবে উজ্জ্বল নক্ষত্রের আলো দমন করে তার কাছাকাছি থাকা তুলনামূলক অনুজ্জ্বল গ্রহের আলো আলাদা করা।
এর সঙ্গে থাকবে অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে নিয়ন্ত্রিত আয়না। এগুলো টেলিস্কোপের অপটিক্যাল ব্যবস্থার ক্ষুদ্র ত্রুটিও সংশোধন করতে পারবে।
জার্মানির ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক ইনস্টিটিউট ফর অ্যাস্ট্রোনমির গবেষক অলিভার ক্রাউসের মতে, মহাকাশে ব্যবহৃত বৈজ্ঞানিক অপটিক্যাল পর্যবেক্ষণযন্ত্রগুলোর মধ্যে রোমানের করোনাগ্রাফ অন্যতম জটিল প্রযুক্তি।
গত ৩০ আগস্ট স্পেসএক্সের ফ্যালকন হেভি রকেটে যুক্তরাষ্ট্রের কেনেডি স্পেস সেন্টার থেকে রোমান স্পেস টেলিস্কোপ উৎক্ষেপণ করা হয়। প্রায় এক দশক ধরে এটি নির্মাণ করা হয়েছে।
বর্তমানে টেলিস্কোপটি পৃথিবী থেকে প্রায় ১৫ লাখ কিলোমিটার দূরের সূর্য-পৃথিবী এল-২ বিন্দুর দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। ডিসেম্বরের শুরুতে সেখানে পৌঁছানোর কথা রয়েছে।
রোমানকে প্রাথমিকভাবে পাঁচ বছরের বৈজ্ঞানিক অভিযানের জন্য তৈরি করা হয়েছে। মিশন আরও পাঁচ বছর বাড়ানোর পরিকল্পনাও ছিল। তবে উৎক্ষেপণ ও প্রাথমিক গতিপথ সংশোধন প্রত্যাশার তুলনায় কম জ্বালানি খরচে সম্পন্ন হওয়ায় নাসার হিসাবে টেলিস্কোপটি সম্ভাব্যভাবে অন্তত ২২ বছর বৈজ্ঞানিক কার্যক্রম চালাতে পারবে।
রোমানের করোনাগ্রাফ এমন একটি গ্রহ শনাক্ত করার জন্য তৈরি করা হয়েছে, যার নক্ষত্র গ্রহটির চেয়ে প্রায় ১০০ কোটি গুণ বেশি উজ্জ্বল। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সূর্য ও বৃহস্পতির উজ্জ্বলতার পার্থক্যও প্রায় এই মাত্রার।
বর্তমান প্রযুক্তির তুলনায় এই ব্যবস্থা প্রায় এক হাজার গুণ উন্নতি আনতে পারে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সাধারণ করোনাগ্রাফে বিশেষ ধরনের মুখোশ ব্যবহার করে নক্ষত্রের আলো ঢেকে দেওয়া হয়। তবে এতে ছবিতে বিভিন্ন ধরনের আলোকীয় বিকৃতি তৈরি হতে পারে। রোমানের ব্যবস্থায় দুটি নমনীয় আয়না থাকবে। প্রতিটি আয়নায় ১ হাজার ৬০০টির বেশি ক্ষুদ্র নিয়ন্ত্রক থাকবে, যা আয়নার আকৃতিতে সামান্য পরিবর্তন এনে আলোর বিকৃতি সংশোধন করবে।
রোমান স্পেস টেলিস্কোপের কাজ শুধু সম্ভাব্য ভিনগ্রহের ছবি তোলার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। এর সমন্বিত বর্ণালিমাপক যন্ত্র সম্ভাব্য গ্রহগুলোর বায়ুমণ্ডলে থাকা বিভিন্ন উপাদান বিশ্লেষণে সহায়তা করবে।
একই সঙ্গে কাছের নক্ষত্রগুলোর চারপাশে থাকা ধূলি ও পদার্থের চাকতিও দৃশ্যমান আলোয় পর্যবেক্ষণ করা হবে।
রোমান স্পেস টেলিস্কোপের প্রধান লক্ষ্যগুলোর মধ্যে রয়েছে মহাবিশ্বের ইতিহাস এবং ডার্ক ম্যাটার ও ডার্ক এনার্জির ভূমিকা অনুসন্ধান। এর পাশাপাশি বহু নতুন ভিনগ্রহ শনাক্তের সম্ভাবনাও রয়েছে।
বর্তমানে টেলিস্কোপটির বিভিন্ন যন্ত্র পরীক্ষা ও সমন্বয়ের পর্যায়ে রয়েছে। সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোলে ২০২৭ সালের শুরুতেই রোমানের প্রথম বৈজ্ঞানিক ছবি প্রকাশ করতে পারে নাসা। এসব ছবি মহাকাশের এমন কিছু দূরবর্তী জগত সম্পর্কে নতুন তথ্য দিতে পারে, যেগুলো এত দিন নক্ষত্রের তীব্র আলোর আড়ালে ছিল।
