স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখে তৃণমূলকে শক্তিশালী করার নির্দেশ, ‘হাইব্রিড’ নেতৃত্ব বিষয়ে সতর্কবার্তা
বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দলীয় নেতাকর্মীদের উদ্দেশে বলেছেন, রাজনৈতিক সংগঠনের ভেতরে মতপার্থক্য থাকা স্বাভাবিক, তবে কোনো অবস্থাতেই তা দলীয় ঐক্যকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে দেওয়া যাবে না। তিনি মনে করেন, দীর্ঘদিনের সংগ্রামের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠা ঐক্য বজায় থাকলে কোনো অপশক্তি বা স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী সংগঠনের ভেতরে প্রবেশ করে সুবিধা নিতে পারবে না। মঙ্গলবার প্রকাশিত এক বক্তব্যে তিনি নেতাকর্মীদের আগামীতেও একই সংহতি ধরে রাখার আহ্বান জানান।
বরিশাল শিল্পকলা একাডেমিতে আয়োজিত বিএনপির বিভাগীয় সাংগঠনিক সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী বলেন, গত দেড় দশকের বেশি সময় ধরে দলের নেতাকর্মীরা নানা প্রতিকূলতা, মামলা, নির্যাতন ও রাজনৈতিক চাপে থেকেও সংগঠনকে টিকিয়ে রেখেছেন। সেই সময় যেভাবে সবাই একসঙ্গে কাজ করেছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতেও একইভাবে ঐক্যবদ্ধ থাকার প্রয়োজন রয়েছে।
তিনি বলেন, সংগঠনের ভেতরে বিভক্তি তৈরি হলে সুযোগসন্ধানী গোষ্ঠী সক্রিয় হয়ে ওঠে। ফলে রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জন এবং জনগণের প্রত্যাশা পূরণে ঐক্যের বিকল্প নেই।
আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে তৃণমূল পর্যায়ে সাংগঠনিক কার্যক্রম আরও জোরদার করার নির্দেশ দেন তারেক রহমান। তিনি বলেন, জাতীয় নির্বাচনে যেভাবে সমন্বিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে সাফল্য এসেছে, স্থানীয় নির্বাচনেও একই ধরনের প্রস্তুতি প্রয়োজন।
তার মতে, নির্বাচনের আগে সাংগঠনিক কাঠামোকে আরও শক্তিশালী করতে হবে এবং নেতৃত্ব নির্বাচনের ক্ষেত্রে বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। বিশেষ করে ‘হাইব্রিড’ ও গোপন স্বার্থে রাজনীতিতে যুক্ত ব্যক্তিদের নেতৃত্বে আসার সুযোগ না দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
সনাতন ধর্মাবলম্বীদের গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় উৎসব সামনে রেখে দলীয় নেতাকর্মীদের সতর্ক থাকার নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, উৎসবকে ঘিরে যেন কোনো ধরনের উসকানি, বিশৃঙ্খলা বা অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটতে না পারে, সেদিকে সর্বোচ্চ নজর রাখতে হবে।
ধর্মীয় সম্প্রীতি বজায় রাখা এবং সকল সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
বক্তব্যে সাবেক আওয়ামী লীগ সরকারের উন্নয়ন কার্যক্রম নিয়েও সমালোচনা করেন তারেক রহমান। তিনি অভিযোগ করেন, উন্নয়নের নামে বিভিন্ন বৃহৎ প্রকল্প বাস্তবায়ন হলেও সেগুলোর ব্যয়ের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, অবকাঠামোগত উন্নয়নের পাশাপাশি স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও কৃষি খাতের উন্নয়নকে সমান গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। শুধুমাত্র সড়ক, সেতু বা ফ্লাইওভার নির্মাণকে উন্নয়নের একমাত্র মানদণ্ড হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
প্রধানমন্ত্রী জানান, উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলোর সক্ষমতা আরও বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে শিশুস্বাস্থ্য সেবার উন্নয়নে দেশব্যাপী বিশেষায়িত হাসপাতাল নির্মাণের পরিকল্পনাও সরকারের বিবেচনায় রয়েছে।
তিনি বলেন, স্বাস্থ্যসেবা জনগণের মৌলিক অধিকার। তাই রাজধানীকেন্দ্রিক চিকিৎসা ব্যবস্থার পরিবর্তে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে উন্নত চিকিৎসাসেবা পৌঁছে দেওয়াই সরকারের লক্ষ্য।
দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি প্রসঙ্গে তারেক রহমান বলেন, দায়িত্ব গ্রহণের সময় সরকারকে নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়েছে। ব্যাংকিং খাত, শিক্ষা ব্যবস্থা ও স্বাস্থ্যখাতে দীর্ঘদিনের সমস্যা মোকাবিলা করে জনমুখী কর্মসূচি বাস্তবায়নের চেষ্টা চলছে।
তিনি জানান, সামাজিক নিরাপত্তা ও কৃষিখাতকে শক্তিশালী করতে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এবং দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখার প্রচেষ্টাও অব্যাহত রয়েছে।
নেতাকর্মীদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় রাজনৈতিক কর্মীদের দায়িত্ব আরও বেড়ে যায়। দেশের আইনশৃঙ্খলা, সামাজিক স্থিতিশীলতা ও জনস্বার্থ রক্ষায় সবাইকে সংযত ও দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে।
তিনি বলেন, রাষ্ট্র পরিচালনা একটি যৌথ দায়িত্ব। তাই দলীয় পরিচয়ের বাইরে গিয়ে দেশের স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।
সাম্প্রতিক সময়ে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে স্থানীয় সরকার নির্বাচন, অর্থনৈতিক সংস্কার, ধর্মীয় সম্প্রীতি এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা নিয়ে আলোচনা জোরালো হয়েছে। এমন প্রেক্ষাপটে বিএনপির সাংগঠনিক শক্তি বৃদ্ধি ও তৃণমূল পর্যায়ে কার্যক্রম সম্প্রসারণের ওপর গুরুত্বারোপ করে এই বার্তা দেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
বিশ্লেষকদের মতে, স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখে দলীয় ঐক্য ও সাংগঠনিক শৃঙ্খলা বজায় রাখার প্রশ্নটি এখন রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
