রয়টার্স
যুক্তরাষ্ট্রের ২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনে করপোরেট অর্থের প্রবাহ নতুন রেকর্ড গড়েছে। জুন পর্যন্ত ১৮ মাসে বিভিন্ন কোম্পানি দেশটির রাজনৈতিক প্রচারে মোট ৬৪ কোটি ৬০ লাখ ডলার অনুদান দিয়েছে। ২০২৪ সালের পুরো প্রেসিডেন্ট নির্বাচনী পর্বে কোম্পানিগুলো যে পরিমাণ অর্থ দিয়েছিল, এবারের ১৮ মাসের অনুদান তার চেয়ে ৪০ শতাংশ বেশি।
নির্বাচনী অর্থের ওপর নজরদারি করা সংগঠন পাবলিক সিটিজেনের বিশ্লেষণে এ তথ্য উঠে এসেছে। সংগঠনটি ফেডারেল ইলেকশন কমিশনের (এফইসি) নথি পর্যালোচনা করে কোম্পানিগুলোর সরাসরি দেওয়া অনুদান শনাক্ত করেছে।
করপোরেট অনুদানের ক্ষেত্রে শীর্ষে রয়েছে উৎপাদন খাতের প্রতিষ্ঠান কোচ ইনকরপোরেটেড। জুনে প্রতিষ্ঠানটি কোচ নেটওয়ার্কের রাজনৈতিক অ্যাকশন কমিটি আমেরিকানস ফর প্রসপারিটি অ্যাকশনকে ২ কোটি ডলার দেয়।
অনলাইন স্পোর্টস বেটিং কোম্পানিগুলোও বড় অঙ্কের অর্থ দিয়েছে। ড্রাফটকিংস, ফ্যানডুয়েল, ফ্যানাটিকস ও বেট৩৬৫ দ্বিতীয় প্রান্তিকে শিল্প খাতের সুপার পিএসি উইন ফর আমেরিকায় ২ কোটি ৯০ লাখ ডলার দিয়েছে। মধ্যবর্তী নির্বাচনে স্পোর্টস বেটিং খাতের মোট অনুদান এরই মধ্যে ৭ কোটি ৬০ লাখ ডলারে দাঁড়িয়েছে।
বড় তামাক কোম্পানিগুলোও নির্বাচনী প্রচারে উল্লেখযোগ্য অর্থ দিয়েছে। এর বড় অংশ গেছে রিপাবলিকান প্রার্থীদের পেছনে। সিগারেটের ব্র্যান্ড ক্যামেল ও নিউপোর্টের মূল কোম্পানি রেনল্ডস আমেরিকান এপ্রিলের শেষ দিকে সহযোগী প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ট্রাম্পের সুপার পিএসি এমএজিএ ইনকরপোরেটেডকে ৫০ লাখ ডলার দেয়।
গাঁজা খাতের ছয়টি কোম্পানিও জুনে আমেরিকা ফার্স্ট অ্যাগ্রিকালচার অ্যাকশন ইনকরপোরেটেডকে সম্মিলিতভাবে ১ কোটি ১৫ লাখ ডলার দিয়েছে। এসব কোম্পানির মধ্যে কারিউলিফ ও ট্রুলিভ রয়েছে।
পাবলিক সিটিজেন ১৯৭১ সালে প্রতিষ্ঠিত একটি ভোক্তা অধিকার সংগঠন, যারা নির্বাচনে করপোরেট অর্থ ব্যয়ের বিরোধিতা করে আসছে। সংগঠনটি কোম্পানির সরাসরি দেওয়া অনুদান আলাদাভাবে শনাক্ত করতে এফইসির তথ্য হাতে ধরে যাচাই করেছে। কোম্পানির নির্বাহী ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের দেওয়া একই ধরনের অর্থ এতে বাদ দেওয়া হয়েছে।
তবে হিসাবটিতে ডার্ক মানি সংগঠনকে দেওয়া অর্থ এবং অঙ্গরাজ্য পর্যায়ের নির্বাচনে কোম্পানিগুলোর ব্যয় অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। ফলে ২০২৬ সালের নির্বাচনী প্রচারের শেষ দুই মাসে কংগ্রেসের দুই কক্ষের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা তীব্র হলে করপোরেট অনুদান আরও বাড়তে পারে।
পাবলিক সিটিজেনের গবেষণা পরিচালক রিক ক্লেপুল বলেন, নির্বাচনে করপোরেট অর্থের এই প্রবাহ একটি ‘সতর্কসংকেত’। কার্যকর গণতন্ত্রের স্বার্থে এই প্রবণতা নিয়ন্ত্রণ করা প্রয়োজন।
অন্যদিকে, ফার্স্ট অ্যামেন্ডমেন্ট বা মতপ্রকাশের স্বাধীনতার পক্ষে থাকা সংগঠনগুলোর কেউ কেউ রাজনৈতিক ব্যয়কে গণতান্ত্রিক অধিকার সুরক্ষার অংশ হিসেবে দেখেন। ইনস্টিটিউট ফর ফ্রি স্পিচের ভাইস প্রেসিডেন্ট টম গ্যারেটের মতে, রাজনৈতিক ব্যয় মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে স্বীকৃতি দেওয়া রাজনৈতিক ব্যবস্থার অংশ।
২০১০ সালে মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট রাজনৈতিক প্রচারে অনুদান ও ব্যয়ের ওপর থাকা কিছু বিধিনিষেধ তুলে নেওয়ার পর করপোরেট অর্থের প্রবাহ দ্রুত বাড়ে। এর ফলে কোম্পানি ও ধনী ব্যক্তিরা স্বাধীন রাজনৈতিক সংগঠনগুলোকে অর্থ দেওয়ার ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট সীমার বাইরে যাওয়ার সুযোগ পান।
২০১০ সালের পর থেকে মার্কিন নির্বাচনে কোম্পানিগুলো মোট ১৭০ কোটি ডলার অনুদান দিয়েছে। এর প্রায় এক-তৃতীয়াংশ এসেছে বর্তমান নির্বাচনী পর্বে।
পাবলিক সিটিজেনের তথ্য অনুযায়ী, রিপাবলিকানদের সমর্থক রাজনৈতিক অ্যাকশন কমিটিগুলোতে অনুদান দ্রুত বাড়ছে। প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেটের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে রিপাবলিকানরা কঠিন প্রতিদ্বন্দ্বিতার মুখে থাকায় এই অর্থপ্রবাহও বাড়ছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক নেট সিলভারের সর্বশেষ মধ্যবর্তী নির্বাচন পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, ডেমোক্র্যাটদের সিনেটের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার সম্ভাবনা ৫৭ দশমিক ২ শতাংশ। প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ ডেমোক্র্যাটদের হাতে যাওয়ার সম্ভাবনা ৮৪ শতাংশ।
রিপাবলিকান দলের বড় দাতা চার্লস কোচের নিয়ন্ত্রণাধীন কোচ ইনকরপোরেটেড জুনে আমেরিকানস ফর প্রসপারিটি অ্যাকশনকে ২ কোটি ডলার দেয়। এ বিষয়ে কোম্পানির মন্তব্য জানতে চাওয়া হলেও তারা কোনো বক্তব্য দেয়নি।
২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনে করপোরেট অনুদানের ক্ষেত্রে ক্রিপ্টো খাত সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছে। এরপর রয়েছে অনলাইন বেটিং ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাত। এই তিন খাত মিলিয়ে কোম্পানিগুলোর মোট অনুদানের অর্ধেকের বেশি—প্রায় ৩৪ কোটি ৪০ লাখ ডলার।
ক্রিপ্টো উদ্যোক্তা ক্যামেরন ও টাইলার উইঙ্কলভস ১৯ জুন জেমিনি ট্রাস্ট কোম্পানির মাধ্যমে ট্রাম্পের এমএজিএ ইনকরপোরেটেডকে ১ কোটি ডলার দেন। এ বিষয়ে জেমিনি কোনো মন্তব্য করেনি।
এদিকে নির্বাচনী রাজনীতিতে এবার প্রথম অর্থ দিয়েছে ভবিষ্যৎ নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে পূর্বাভাস দেওয়ার প্ল্যাটফর্ম পলিমার্কেট। এপ্রিল মাসে তারা ভি-পিএসি: ভিক্টরস, নট ভিকটিমস নামের একটি পিএসিকে ১০ হাজার ডলার দেয়। সংগঠনটি রিপাবলিকান উদ্যোক্তা ও সাবেক ডিপার্টমেন্ট অব গভর্নমেন্ট এফিশিয়েন্সির সহসভাপতি বিবেক রামাস্বামীর ওহাইওর গভর্নর পদে নির্বাচনী প্রচারে সমর্থন দিচ্ছে।
জুনে পলিমার্কেটের মূল কোম্পানির মাধ্যমে রিপাবলিকান প্রার্থীদের সমর্থন দেওয়া সিএলএফ পিএসিকে আরও ১০ লাখ ডলার দেওয়া হয়।
এআই খাতের কোম্পানিগুলোর নির্বাচনী অনুদানও উল্লেখযোগ্য। চ্যাটজিপিটির মূল কোম্পানি ওপেনএআই-সমর্থিত সুপার পিএসি লিডিং দ্য ফিউচার এ পর্যন্ত ৫ কোটি ডলার পেয়েছে। এতে এআই খাতের কোম্পানিগুলোর নির্বাচনী অনুদানের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬ কোটি ২০ লাখ ডলারে।
সংশ্লিষ্ট এক ব্যক্তি জানিয়েছেন, অনুদান ও দেওয়ার প্রতিশ্রুতি মিলিয়ে ওই পিএসি এখন পর্যন্ত ১৪ কোটি ডলার সংগ্রহ করেছে। তবে ওপেনএআই আগে জানিয়েছে, কোনো বাইরের রাজনৈতিক সংগঠন তাদের হয়ে কথা বলে না বা তাদের প্রতিনিধিত্ব করে না।
পাবলিক সিটিজেনের ৬৪ কোটি ৬০ লাখ ডলারের হিসাব করপোরেট রাজনৈতিক ব্যয়ের পুরো চিত্র নয়। অঙ্গরাজ্য ও স্থানীয় নির্বাচনে কোম্পানিগুলোর ব্যয় এতে অন্তর্ভুক্ত হয়নি। উদাহরণ হিসেবে, ইনস্টাগ্রামের মালিক মেটা অঙ্গরাজ্যের নির্বাচনে ব্যয়ের জন্য ৬ কোটি ৫০ লাখ ডলার আলাদা করে রেখেছে, যা এই হিসাবে নেই।
ডার্ক মানি সংগঠনগুলোর মাধ্যমে দেওয়া অর্থও হিসাবের বাইরে রয়েছে। এসব অলাভজনক সংগঠনের দাতাদের পরিচয় বা অর্থ ব্যয়ের পূর্ণ বিবরণ প্রকাশের বাধ্যবাধকতা নেই।
ক্লড এআইয়ের নির্মাতা অ্যানথ্রপিক এমন একটি সংগঠন পাবলিক ফার্স্ট অ্যাকশনকে ৪ কোটি ডলার দিয়েছে। সংগঠনটির এক মুখপাত্র জানিয়েছেন, মধ্যবর্তী নির্বাচনে ব্যয়ের জন্য তারা মোট ১০ কোটি ডলার সংগ্রহ করেছে। তবে অন্য দাতাদের পরিচয় প্রকাশ করা হয়নি।
অ্যানথ্রপিক আগে জানিয়েছিল, তাদের দেওয়া অর্থ শিক্ষা খাতে ব্যয় করা যেতে পারে, কিন্তু নির্দিষ্ট নির্বাচনী আসনের পক্ষে সরাসরি ব্যয় করা যাবে না। পাবলিক ফার্স্ট অ্যাকশন জানিয়েছে, এআইয়ের নতুন ঝুঁকি মোকাবিলায় ভোক্তা সুরক্ষার আইন পাসে কংগ্রেসের প্রতি আহ্বান জোরদার করাও তাদের অন্যতম উদ্দেশ্য।
করপোরেট অনুদানের পাশাপাশি কোম্পানির শীর্ষ নির্বাহীদের ব্যক্তিগত রাজনৈতিক ব্যয়ও রয়েছে। স্পেসএক্সের প্রতিষ্ঠাতা ইলন মাস্ক এ পর্যন্ত ফেডারেল নির্বাচনে ৯ কোটি ডলারের বেশি ব্যয় করেছেন। গুগলের সহপ্রতিষ্ঠাতা সের্গেই ব্রিন ক্যালিফোর্নিয়ায় প্রস্তাবিত সম্পদ করসহ বিভিন্ন ইস্যুতে ১০ কোটি ৬০ লাখ ডলারের বেশি ব্যয় করেছেন। তবে এ বিষয়ে ব্রিনের প্রতিনিধি ও মাস্কের মুখপাত্র কোনো মন্তব্য করেননি।
