বিএনপির মহাসচিব ও স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে রাষ্ট্রপতি পদে দলীয় প্রার্থী হিসেবে চূড়ান্ত করেছে বিএনপি। আজ বৃহস্পতিবার দুপুরে সচিবালয়ে দলের জ্যেষ্ঠ নেতাদের সঙ্গে বৈঠকের পর বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তাঁর প্রার্থিতা চূড়ান্ত করেন। রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হলে বিএনপির মহাসচিব, জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য এবং স্থানীয় সরকারমন্ত্রীর পদ ছাড়তে হবে তাঁকে। একই সঙ্গে ঠাকুরগাঁও-১ সংসদীয় আসনটিও শূন্য হবে।
বিএনপির সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতার কারণে মির্জা ফখরুলের রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। ফলে তাঁর উত্তরসূরি হিসেবে দল ও সরকারের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি পদে কারা আসবেন, তা নিয়ে দলের ভেতরে আলোচনা শুরু হয়েছে।
মির্জা ফখরুল প্রায় ১৬ বছর ধরে বিএনপির মহাসচিবের দায়িত্বে ছিলেন। ২০১১ সালে তিনি দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব হন। পরে ২০১৬ সালের জাতীয় কাউন্সিলে আনুষ্ঠানিকভাবে মহাসচিব নির্বাচিত হন।
দলের কঠিন রাজনৈতিক সময়ে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। খালেদা জিয়ার কারাবন্দিত্ব এবং তারেক রহমানের লন্ডনে অবস্থানের সময় দল পরিচালনায় তাঁর ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে তিনি ছয়বার কারাগারে যান।
মির্জা ফখরুল রাষ্ট্রপতি হলে মহাসচিব পদে সম্ভাব্য উত্তরসূরি হিসেবে বিএনপির ভেতরে দুজনের নাম বেশি আলোচিত হচ্ছে। তাঁরা হলেন দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ এবং জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী।
দলীয় সূত্রগুলো বলছে, জাতীয় কাউন্সিলের আগে অথবা কাউন্সিলকে কেন্দ্র করে প্রথমে একজন ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব নিয়োগ করা হতে পারে। পরে জাতীয় কাউন্সিল কিংবা এর কাছাকাছি সময়ে মহাসচিব পদে স্থায়ী সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে।
রুহুল কবির রিজভী এবারের নির্বাচনে অংশ নেননি এবং তাঁকে মন্ত্রিসভাতেও রাখা হয়নি। এ কারণে মহাসচিবের পদ শূন্য হলে তাঁকে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব করার সম্ভাবনা বেশি বলে বিএনপির কয়েকজন দায়িত্বশীল নেতা মনে করছেন।
রাষ্ট্রপতি পদে নির্বাচিত হলে মির্জা ফখরুলকে স্থানীয় সরকারমন্ত্রীর দায়িত্বও ছাড়তে হবে। তাঁর পদত্যাগের পর মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব কে পাবেন, সে বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। বর্তমান মন্ত্রিসভার কাউকে দায়িত্ব দেওয়া হবে, নাকি নতুন কাউকে নিয়োগ করা হবে—তা পরিষ্কার নয়।
এদিকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার পর মির্জা ফখরুলের ঠাকুরগাঁও-১ আসনটি শূন্য ঘোষণা করবে সংসদ সচিবালয়। এরপর ওই আসনে উপনির্বাচন হবে।
নির্বাচন কমিশনের তফসিল অনুযায়ী, আজ বিকেল চারটা পর্যন্ত রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার সময় রয়েছে। এরপর মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই করা হবে। ১৮ আগস্ট প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ দিন। একাধিক প্রার্থী থাকলে ২০ আগস্ট সংসদের সভাকক্ষে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।
এরই মধ্যে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় ঐক্য লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমদকে রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী করেছে। আজ বেলা ১১টার দিকে তাঁর মনোনয়নপত্র জমা দেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে বিএনপি মির্জা ফখরুলের জন্য রাষ্ট্রপতি পদের মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছে। রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী হতে তাঁর আপত্তি নেই—এমন অঙ্গীকারনামাতেও তিনি স্বাক্ষর করেছেন। এটি রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের আইনি প্রক্রিয়ার অংশ।
দীর্ঘ প্রায় ৩৫ বছর পর রাষ্ট্রপতি পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক ভোটের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। সর্বশেষ ১৯৯১ সালে রাষ্ট্রপতি পদে ভোট হয়েছিল। এরপর ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীরা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছেন; বিরোধী দলগুলোও এ পদে প্রার্থী দেয়নি।
সংবিধান অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন সংসদ সদস্যদের ভোটে। বর্তমানে জাতীয় সংসদে বিএনপির দুই-তৃতীয়াংশের বেশি সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে। জামায়াতসহ বিরোধী দলগুলোর সদস্যসংখ্যা সংরক্ষিত নারী আসনসহ ৯০। ফলে মির্জা ফখরুলের রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হলে তিনি হবেন বাংলাদেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি।
গত ২৪ জুলাই রাষ্ট্রপতির পদ থেকে পদত্যাগ করেন ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের মনোনয়নে নির্বাচিত মো. সাহাবুদ্দিন। বর্তমানে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করছেন। সংবিধান অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হওয়ার ৯০ দিনের মধ্যে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করতে হয়।
সংবিধানের ৫০(১) অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রপতির মেয়াদ পাঁচ বছর নির্ধারিত হয়েছে। তবে উত্তরাধিকারী দায়িত্ব গ্রহণ না করা পর্যন্ত মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও রাষ্ট্রপতি দায়িত্বে থাকতে পারেন। একই ব্যক্তি দুই মেয়াদের বেশি রাষ্ট্রপতি হতে পারবেন না।
সংবিধান অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি তাঁর দায়িত্ব পালনকালে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার যোগ্য থাকেন না। কোনো সংসদ সদস্য রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হলে তিনি রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণের দিন সংসদ সদস্য পদ হারাবেন।
মন্ত্রীদের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই মন্ত্রিত্ব শেষ হওয়ার বিষয়ে সরাসরি কোনো বিধান নেই। তবে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণের পর একই সঙ্গে মন্ত্রী থাকা সম্ভব নয়। সংবিধানের ৫৬(১) অনুচ্ছেদে প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপমন্ত্রীর পদকে মন্ত্রিসভার কাঠামোর অংশ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। আর ৪৮(২) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি রাষ্ট্রের প্রধান।
এর আগে আবদুর রহমান বিশ্বাস, আবদুল হামিদসহ কয়েকজন নেতা স্পিকার বা মন্ত্রিসভার দায়িত্বে থাকা অবস্থায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছেন এবং রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেওয়ার আগে তাঁদের আগের পদ ছেড়েছেন।
