ঢাকার মেট্রোরেলে যাত্রীসংখ্যা প্রত্যাশার কাছাকাছি পৌঁছেছে। চালুর পর থেকে এখন পর্যন্ত ৩১ কোটি ৩৫ লাখের বেশি মানুষ মেট্রোরেলে যাতায়াত করেছেন। চলতি বছরের ১০ সেপ্টেম্বর এক দিনে সর্বোচ্চ ৪ লাখ ৯৯ হাজার ৭৫৬ জন যাত্রী মেট্রোরেলে ভ্রমণ করেছেন। যাত্রী বাড়ার সঙ্গে টিকিট বিক্রি থেকে আয়ও বাড়ছে। তবে পরিচালন ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়ের পাশাপাশি বড় অঙ্কের ঋণের কিস্তিও পরিশোধ করতে হবে।
এই পরিস্থিতিতে ট্রেনের সংখ্যা ও চলাচলের সময় বাড়িয়ে যাত্রী পরিবহন বৃদ্ধির পাশাপাশি টিকিটের বাইরে অন্যান্য উৎস থেকেও আয় বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড (ডিএমটিসিএল)।
২০২২ সালের ২৮ ডিসেম্বর উত্তরা থেকে আগারগাঁও অংশে মেট্রোরেল চালু হয়। ২০২৩ সালের ৪ নভেম্বর আগারগাঁও থেকে মতিঝিল অংশ চালু হয়। একই বছরের শেষ দিন থেকে উত্তরা-মতিঝিল পুরো পথে যাত্রী চলাচল শুরু করে।
মেট্রোরেল এখন ঢাকার গণপরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বিশেষ করে উত্তরা, মিরপুর, ফার্মগেট, শাহবাগ ও মতিঝিলের মধ্যে যাতায়াতে এটি জনপ্রিয় হয়েছে। সময় বাঁচানো ও যানজট এড়িয়ে নির্দিষ্ট সময়ে গন্তব্যে পৌঁছানোর সুযোগের কারণে যাত্রীসংখ্যা প্রতি বছরই বেড়েছে।
ডিএমটিসিএলের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চালুর পর মেট্রোরেলে মোট ৩১ কোটি ৩৫ লাখ ৪৬ হাজার ৩০৬ জন যাত্রী যাতায়াত করেছেন। ১০ সেপ্টেম্বর এক দিনে সর্বোচ্চ ৪ লাখ ৯৯ হাজার ৭৫৬ জন যাত্রী ভ্রমণ করেন।
সাম্প্রতিক সময়ে ১৩ সেপ্টেম্বর ৪ লাখ ৮০ হাজার ৬২০, ২০ আগস্ট ৪ লাখ ৭৮ হাজার ২৮০, ১৪ সেপ্টেম্বর ৪ লাখ ৭৬ হাজার ৮১৫ এবং ২১ মে ৪ লাখ ৭৪ হাজার ৬৩৫ জন যাত্রী মেট্রোরেলে যাতায়াত করেছেন।
ডিএমটিসিএলের কর্মকর্তাদের হিসাবে, বর্তমানে প্রতিদিন সাড়ে চার লাখের বেশি যাত্রী মেট্রোরেলে চলাচল করেন। প্রকল্প নেওয়ার সময় উত্তরা থেকে মতিঝিল পর্যন্ত প্রতিদিন পাঁচ লাখ যাত্রী হবে বলে প্রাক্কলন করা হয়েছিল।
মতিঝিল স্টেশন এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি যাত্রী ওঠানামা করা স্টেশন। প্রতিদিন গড়ে ৫১ হাজার ৫৪২ জন যাত্রী এই স্টেশনে প্রবেশ করেন এবং ৫১ হাজার ৩৬ জন বের হন।
অফিসপাড়া, সচিবালয় ও আশপাশের বাণিজ্যিক এলাকার সঙ্গে সংযোগ থাকায় মতিঝিল গুরুত্বপূর্ণ গন্তব্য হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
বেশি যাত্রী পরিবহন করা অন্য স্টেশনগুলোর মধ্যে রয়েছে উত্তরা উত্তর, পল্লবী, মিরপুর-১০, কারওয়ান বাজার ও সচিবালয়। তুলনামূলক কম যাত্রী পরিবহন করে উত্তরা দক্ষিণ, বিজয় সরণি ও উত্তরা সেন্ট্রাল স্টেশন।
ডিএমটিসিএলের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সাড়ে তিন মিনিট পরপর ট্রেন চালানোর সক্ষমতা রয়েছে। প্রকল্পের সময় সকাল থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত ট্রেন চালানোর পরিকল্পনাও ছিল। তবে প্রয়োজনীয় লোকবলের অভাবে শুরুতে সেই সক্ষমতা পুরোপুরি কাজে লাগানো সম্ভব হয়নি।
এখন পর্যায়ক্রমে চলাচলের সময় বাড়ানো হচ্ছে এবং লোকবল নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে। ডিএমটিসিএলের পরিচালক (পরিচালন ও রক্ষণাবেক্ষণ) মো. নজরুল ইসলাম জানান, লোকবল পাওয়া গেছে এবং পর্যায়ক্রমে রাতে মেট্রোরেলের চলাচল বাড়ানো হবে। দুই ট্রেনের মধ্যবর্তী বিরতির সময়ও কমানো হবে।
মতিঝিল থেকে কমলাপুর পর্যন্ত মেট্রোরেলের অবকাঠামো তৈরির কাজ মোটামুটি শেষ হয়েছে। আগামী জানুয়ারিতে পরীক্ষামূলক চলাচল শুরুর পরিকল্পনা রয়েছে।
কমলাপুর পর্যন্ত সম্প্রসারণ চালু হলে দৈনিক যাত্রীসংখ্যা ৬ লাখ ৭৭ হাজারে পৌঁছানোর প্রাক্কলন রয়েছে। একই সঙ্গে মেট্রোরেলের সঙ্গে দেশের রেলব্যবস্থার সরাসরি সংযোগ তৈরি হবে।
কর্তৃপক্ষের হিসাবে, ট্রেনের সংখ্যা ও চলাচলের সময় বাড়ানো গেলে টিকিট বিক্রি থেকে বছরে প্রায় ৫০০ কোটি টাকা আয় করা সম্ভব।
২০২২-২৩ অর্থবছরে আংশিক চালুর সময়ে মেট্রোরেলের টিকিট বিক্রি থেকে আয় হয়েছিল ২২ কোটি টাকার বেশি। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে আয় বেড়ে প্রায় ২৪৪ কোটি টাকা হয়। সর্বশেষ ২০২৪-২৫ অর্থবছরে অনিরীক্ষিত আয় ছিল প্রায় ৪০০ কোটি টাকা।
তবে মেট্রোরেলের আর্থিক হিসাব শুধু আয় দিয়ে দেখার সুযোগ নেই। এমআরটি-৬ প্রকল্পে জাইকার কাছ থেকে পাঁচটি ঋণচুক্তির মাধ্যমে ১৯ হাজার ৭১৮ কোটি টাকা নেওয়া হয়েছে। এই ঋণ সুদসহ আগামী ৩০ বছরে পরিশোধ করতে হবে।
২০২৩ সালের জুন থেকে সীমিত আকারে ঋণের কিস্তি দেওয়া শুরু হয়েছে। ২০৩০-৩১ সাল পর্যন্ত পাঁচ বছরে ৩ হাজার ৭০০ কোটি টাকার বেশি কিস্তি পরিশোধ করতে হবে, অর্থাৎ গড়ে বছরে প্রায় ৭৪০ কোটি টাকা।
মেট্রোরেলের নির্মাণ ব্যয় ৩৩ হাজার ৪৭২ কোটি টাকা। এর প্রায় ৫৯ শতাংশ জাইকার ঋণ। নির্মাণ ব্যয় বেশি হওয়ায় ভাড়া বাড়িয়ে আয় বৃদ্ধির সুযোগ সীমিত বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। বর্তমানে মেট্রোরেলে যাতায়াতের ওপর ভ্যাটও মওকুফ রয়েছে।
বুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক সামছুল হক বলেন, আয় বাড়াতে ট্রেনের সংখ্যা ও চলাচলের সময় বাড়াতে হবে। পাশাপাশি রাতে ও বন্ধের দিন মেট্রোরেল চলাচল বাড়ানো এবং অযৌক্তিক খরচ কমানোর দিকে নজর দেওয়া প্রয়োজন বলে তিনি মন্তব্য করেন।
ডিএমটিসিএল সূত্র জানিয়েছে, টিকিট বিক্রির বাইরে স্টেশনের অব্যবহৃত জায়গায় দোকান বরাদ্দ দিয়ে আয় বাড়ানোর চেষ্টা চলছে। স্টেশনের কাছে গাড়ি পার্কিং ও বাণিজ্যিক জায়গা ব্যবহারের সুযোগও কাজে লাগানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
মেট্রোরেলের যাত্রীসংখ্যা প্রকল্পের প্রাক্কলনের কাছাকাছি পৌঁছেছে। কমলাপুর পর্যন্ত সম্প্রসারণ এবং চলাচলের সময় বাড়লে যাত্রী আরও বাড়ার সুযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে বাড়তি যাত্রী থেকে আয় বৃদ্ধি এবং পরিচালন ব্যয় ও ঋণের কিস্তি সামাল দেওয়াই সামনে মেট্রোরেল পরিচালনার গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠবে।
