সরবরাহ কমলেও চাহিদা অটুট, ক্রেতাদের প্রথম পছন্দ এখন আম্রপালি
চট্টগ্রামের ফলের বাজারে এখন আম্রপালির একচ্ছত্র আধিপত্য। আমের মৌসুম শেষের দিকে এগোনোর সঙ্গে সঙ্গে গোপালভোগ, হিমসাগর ও ল্যাংড়ার সরবরাহ কমে আসায় বাজারের প্রধান স্থান দখল করেছে এই জনপ্রিয় জাতের আম। চাহিদা অব্যাহত থাকায় গত এক সপ্তাহে প্রতি কেজিতে ৫ থেকে ৬ টাকা পর্যন্ত দাম বেড়েছে। পাইকারি ও খুচরা—দুই বাজারেই আম্রপালির প্রতি ক্রেতাদের আগ্রহ সবচেয়ে বেশি দেখা যাচ্ছে।
চট্টগ্রাম নগরের স্টেশন রোডের ফলমন্ডি ঘুরে দেখা যায়, দেশের বিভিন্ন আম উৎপাদনকারী অঞ্চল থেকে প্রতিদিন ট্রাকে ট্রাকে আম আসছে। রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নাটোর, নওগাঁ, সাতক্ষীরা ও চুয়াডাঙ্গাসহ বিভিন্ন জেলা থেকে আমের চালান পৌঁছালেও বাজারে এখন আম্রপালির উপস্থিতিই সবচেয়ে বেশি।
ব্যবসায়ীরা জানান, মে ও জুন মাসের তুলনায় বর্তমানে আমের সরবরাহ কিছুটা কমতে শুরু করেছে। এর ফলে বাগান পর্যায় থেকেই তুলনামূলক বেশি দামে আম কিনতে হচ্ছে, যার প্রভাব বাজারমূল্যে পড়ছে। বর্তমানে উন্নত মানের আম্রপালি পাইকারি বাজারে প্রতি কেজি ৭০ থেকে ৮০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। মাঝারি মানের আমের দাম ৫৫ থেকে ৬৫ টাকার মধ্যে রয়েছে।
ফল ব্যবসায়ী মো. দেলোয়ার হোসেন বলেন, মৌসুমের শেষভাগে এসে আম্রপালির চাহিদা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। সরবরাহ কমতে শুরু করায় দামও কিছুটা বেড়েছে। তবে ক্রেতাদের আগ্রহে কোনো ভাটা পড়েনি।
আরেক ব্যবসায়ী মো. আবুল হোসেনের ভাষ্য, স্বাদ, মিষ্টতা এবং দীর্ঘ সময় বাজারে পাওয়া যাওয়ার কারণে আম্রপালি এখনও ক্রেতাদের কাছে সবচেয়ে আকর্ষণীয় আম হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। ফলে দাম বাড়লেও বিক্রিতে তেমন প্রভাব পড়েনি।
পাইকারি বাজারে আম্রপালির পর সবচেয়ে বেশি বিক্রি হচ্ছে বারি আম-৪। এই জাতের আমের দাম কেজিপ্রতি ৬৫ থেকে ৭৫ টাকা। ল্যাংড়া বিক্রি হচ্ছে ৬০ থেকে ৭০ টাকায়, ফজলি ৬০ থেকে ৭০ টাকায় এবং কাটিমনের দাম রয়েছে ৭০ থেকে ৯০ টাকার মধ্যে।
খুচরা বাজারে মান ও আকারভেদে আম্রপালির দাম প্রতি কেজি ৭০ থেকে ১৪০ টাকা পর্যন্ত উঠেছে। নগরের চকবাজার, আগ্রাবাদ, আন্দরকিল্লা, রেয়াজউদ্দিন বাজার ও ২ নম্বর গেট এলাকায় ফলের দোকানগুলোতে সবচেয়ে বেশি দেখা যাচ্ছে এই জাতের আম।
ক্রেতারা জানান, পরিবারের সদস্যদের পছন্দের তালিকায় আম্রপালি এখন শীর্ষে। কয়েক সপ্তাহ আগের তুলনায় দাম বাড়লেও এর স্বাদ ও মানের কারণে তারা এখনও এই আমই কিনছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আম্রপালির জনপ্রিয়তার পেছনে রয়েছে এর উচ্চ ফলনশীলতা, উন্নত স্বাদ, নিয়মিত উৎপাদন এবং ঘনবসতিপূর্ণ বাগানে চাষের উপযোগিতা। ভারতের কৃষি গবেষণার মাধ্যমে উদ্ভাবিত এই জাত পরবর্তীতে বাংলাদেশে ব্যাপকভাবে বিস্তার লাভ করে।
বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের ফল বিশেষজ্ঞদের তথ্য অনুযায়ী, দেশে নতুন যেসব বাণিজ্যিক আমবাগান গড়ে উঠছে, তার বড় অংশজুড়েই রয়েছে আম্রপালি। রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নাটোর, নওগাঁ, কুষ্টিয়া, যশোর, মেহেরপুর, সাতক্ষীরা ও চুয়াডাঙ্গাসহ বিভিন্ন জেলায় এর ব্যাপক চাষ হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, গাছ তুলনামূলক খাটো হওয়ায় একই জমিতে বেশি গাছ রোপণ করা সম্ভব হয়। পাশাপাশি এই জাত প্রতিবছর নিয়মিত ফল দেয়, যা অনেক দেশীয় জাতের ক্ষেত্রে দেখা যায় না। ফলে বাণিজ্যিক চাষিরা ক্রমেই আম্রপালির দিকে ঝুঁকছেন।
কৃষি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আম্রপালির চাষ সম্প্রসারণ দেশের ফল উৎপাদন খাতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে। অধিক ফলন, কম উৎপাদন ব্যয় এবং দীর্ঘ সময় বাজারে সরবরাহ অব্যাহত রাখার সক্ষমতা কৃষকদের লাভজনক অবস্থানে নিয়ে যাচ্ছে।
এ ছাড়া মৌসুমের শেষভাগেও বাজারে আমের সরবরাহ ধরে রাখতে এই জাত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। ফলে ভোক্তারা দীর্ঘ সময় ধরে দেশীয় আমের স্বাদ উপভোগ করার সুযোগ পাচ্ছেন।
ফল ব্যবসায়ীদের মতে, মৌসুম যত শেষের দিকে এগোয়, ততই বাজার থেকে গোপালভোগ, হিমসাগর ও ল্যাংড়ার মতো জাতগুলো কমে আসে। তখন তুলনামূলক দেরিতে পরিপক্ব হওয়া এবং দীর্ঘ সময় বাজারে পাওয়া যাওয়ার কারণে আম্রপালি ক্রেতাদের প্রধান পছন্দে পরিণত হয়।
বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় ব্যবসায়ীরা মনে করছেন, জুলাই মাসজুড়েই বাজারে আম্রপালির প্রাধান্য বজায় থাকবে। তবে সরবরাহ আরও কমে গেলে দাম কিছুটা বাড়ার সম্ভাবনাও রয়েছে।
