ডারউইনে ৯ উইকেটের বড় ব্যবধানে অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়ে আত্মবিশ্বাসে থাকা বাংলাদেশ দল এবার ভিন্ন আবহাওয়ার ম্যাকাইয়ে। অন্যদিকে সিরিজের প্রথম টেস্টে বড় পরাজয়ের পরও অস্ট্রেলিয়া দলকে দেখা গেছে বেশ স্বচ্ছন্দ ও নির্ভার। ২২ আগস্ট থেকে গ্রেট বেরিয়ার রিফ অ্যারেনায় শুরু হতে যাওয়া দ্বিতীয় টেস্টের আগে ঠান্ডা আবহাওয়া ও দীর্ঘ ভ্রমণের ধকল বাংলাদেশের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
মঙ্গলবার রাতে ম্যাকাই বিমানবন্দরে পৌঁছে অস্ট্রেলিয়া দলের ক্রিকেটারদের বেশ ফুরফুরে মেজাজে দেখা যায়। প্যাট কামিন্স, স্টিভেন স্মিথসহ দলের সদস্যরা লাগেজ বেল্টের পাশে অন্য যাত্রীদের সঙ্গে অপেক্ষা করছিলেন। লাগেজ পেতে দেরি হলেও গল্প-আড্ডায় সময় কাটাতে দেখা যায় তাঁদের। স্থানীয় সংবাদকর্মী ও সাধারণ যাত্রীরা ক্রিকেটারদের ঘিরে আগ্রহ দেখালেও অস্ট্রেলিয়ার খেলোয়াড়দের মধ্যে তার বিশেষ কোনো প্রভাব দেখা যায়নি।
বিমানবন্দরে বাংলাদেশ ও অস্ট্রেলিয়ার দুটি বড় পতাকা পাশাপাশি টাঙানো ছিল। ম্যাকাইয়ে প্রথমবার টেস্ট আয়োজনকে ঘিরে দুই দলকে স্বাগত জানানোর প্রস্তুতিরই অংশ ছিল এটি।
অস্ট্রেলিয়া দলের কিছুটা আগে মঙ্গলবার সন্ধ্যায় ম্যাকাইয়ে পৌঁছায় বাংলাদেশ দল। তবে ডারউইন থেকে ম্যাকাইয়ের যাত্রাপথে বাংলাদেশ দলকে দীর্ঘ সময় ভ্রমণ করতে হয়েছে। সকাল সাতটায় ডারউইন থেকে কেয়ার্নসের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করে দল। এরপর দীর্ঘ বিরতির পাশাপাশি টাউন্সভিলেও উড়োজাহাজ থামতে হয়। দলের একটি সূত্র জানায়, টেকনিক্যাল সমস্যার কারণে সেখানে প্রায় দুই ঘণ্টা উড়োজাহাজে অবস্থান করতে হয়েছে ক্রিকেটারদের।
সব মিলিয়ে ডারউইন থেকে ম্যাকাইয়ে পৌঁছাতে বাংলাদেশের প্রায় ১২ ঘণ্টা সময় লাগে। এই দীর্ঘ ভ্রমণের ক্লান্তির কারণে বুধবারের নির্ধারিত অনুশীলন বাতিল করেছে দলীয় ব্যবস্থাপনা।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ম্যাকাইয়ের ভিন্ন আবহাওয়া। ডারউইনের উষ্ণ পরিবেশের সঙ্গে ম্যাকাইয়ের পরিস্থিতির বড় পার্থক্য রয়েছে। মঙ্গলবার রাতে শহরটিতে পৌঁছে বাংলাদেশ দল কনকনে ঠান্ডা বাতাসের মুখে পড়ে। রাতে তাপমাত্রা ছিল প্রায় ১৭ থেকে ১৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস।
বর্তমানে ডারউইনে বাংলাদেশ হাইপারফরম্যান্স দলের ব্যাটিং কোচ হিসেবে কাজ করছেন জাতীয় দলের সাবেক ওপেনার ইমরুল কায়েস। খেলা ছাড়ার পর তিনি পরিবার নিয়ে সিডনিতে বসবাস করছেন। ম্যাকাইয়ের মৌসুমি আবহাওয়া সম্পর্কে তাঁরও ধারণা রয়েছে। তাঁর মতে, রাতে সেখানে বেশ ঠান্ডা থাকে এবং দিনে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ২২ থেকে ২৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত উঠতে পারে।
ম্যাকাইয়ের গ্রেট বেরিয়ার রিফ অ্যারেনা, যা রে মিচেল ওভাল হারাপ পার্ক নামেও পরিচিত, এবারই প্রথম টেস্ট ম্যাচ আয়োজন করতে যাচ্ছে। তবে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের সঙ্গে মাঠটির পরিচয় নতুন নয়। নারী ক্রিকেটের একাধিক আন্তর্জাতিক ম্যাচের পাশাপাশি গত বছর অস্ট্রেলিয়া ও দক্ষিণ আফ্রিকার তিন ম্যাচের ওয়ানডে সিরিজও এখানে অনুষ্ঠিত হয়েছে।
পুরুষদের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে এই মাঠে এর আগে একবারই ম্যাচ হয়েছিল। ১৯৯২ বিশ্বকাপে ভারত ও শ্রীলঙ্কার ম্যাচ আয়োজন করেছিল ম্যাকাই।
অস্ট্রেলিয়ার বড় ক্রিকেট শহরগুলোর তুলনায় ম্যাকাইয়ের ক্রিকেট ইতিহাস অপেক্ষাকৃত ছোট হলেও কুইন্সল্যান্ডের আঞ্চলিক ক্রিকেটে শহরটির গুরুত্ব রয়েছে। স্থানীয় ক্লাব, স্কুল ও আঞ্চলিক প্রতিযোগিতাকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরে সেখানে ক্রিকেটের চর্চা হয়ে আসছে। সময়ের সঙ্গে অবকাঠামোগত উন্নয়নের ফলে উত্তর কুইন্সল্যান্ডে ক্রিকেট প্রতিভা বিকাশের অন্যতম কেন্দ্র হিসেবেও ম্যাকাইয়ের অবস্থান শক্ত হয়েছে।
স্থানীয় ক্লাব, জুনিয়র ও স্কুল ক্রিকেটও শহরটির ক্রীড়া সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সপ্তাহান্তে বিভিন্ন মাঠে স্থানীয় ক্রিকেট প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়।
বাংলাদেশ ও অস্ট্রেলিয়ার দ্বিতীয় টেস্টের মাধ্যমে ম্যাকাইয়ের ক্রিকেট ইতিহাসে নতুন অধ্যায় যুক্ত হতে যাচ্ছে। ২২ আগস্ট শুরু হতে যাওয়া ম্যাচটি শহরটির প্রথম টেস্ট। ম্যাচ ঘিরে স্থানীয় দর্শকদের আগ্রহও ইতিমধ্যে স্পষ্ট। প্রথম দিনের সব টিকিট বিক্রি হয়ে গেছে বলে জানা গেছে।
ডারউইন থেকে ম্যাকাই যাওয়ার পথে ব্রিসবেন-ম্যাকাই ফ্লাইটে অ্যালান ও জেনেট নামের এক প্রৌঢ় দম্পতির সঙ্গে দেখা হয়। ম্যাকাইয়ে প্রথমবার টেস্ট ক্রিকেট হওয়ায় তাঁরা উচ্ছ্বসিত। অ্যালান একটি দিনের খেলা দেখার জন্য টিকিটও কিনেছেন। ডারউইন টেস্টের কিছু অংশ টেলিভিশনে দেখা এই দম্পতি বাংলাদেশের পারফরম্যান্সের প্রশংসা করেছেন। তবে তাঁদের ধারণা, ম্যাকাইয়ের ঠান্ডা পরিবেশ বাংলাদেশের জন্য সমস্যার কারণ হতে পারে।
অস্ট্রেলিয়ার সংবাদকর্মীরাও ডারউইন থেকে দল বেঁধে ম্যাকাইয়ে এসেছেন। বিমানবন্দরে তাঁদের একজন রসিকতা করে এই প্রতিবেদককে বলেন, ‘এবার কিন্তু আমরা তোমাদের কন্ডিশন থেকে আমাদের কন্ডিশনে এসেছি…!’
ডারউইনে প্রথম টেস্টে বাংলাদেশের কাছে ৯ উইকেটে হারের পরও অস্ট্রেলিয়া দলের মধ্যে দৃশ্যত কোনো অস্বস্তির ছাপ নেই। বরং ম্যাকাইয়ে পৌঁছে তাদের স্বাভাবিক ও প্রাণবন্ত আচরণ চোখে পড়েছে। বিপরীতে বাংলাদেশকে সামলাতে হচ্ছে দীর্ঘ ভ্রমণ, অনুশীলন বাতিল এবং ডারউইনের তুলনায় অনেক ঠান্ডা আবহাওয়ার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার চ্যালেঞ্জ।
সব মিলিয়ে ২২ আগস্ট শুরু হতে যাওয়া দ্বিতীয় টেস্টের আগে বাংলাদেশের সামনে শুধু প্রতিপক্ষ অস্ট্রেলিয়াই নয়, ম্যাকাইয়ের কন্ডিশনও বড় পরীক্ষা হয়ে উঠছে।
