উপসাগরীয় অঞ্চলে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার পাল্টাপাল্টি আঘাত; জ্বালানি বাজারে বাড়ছে উদ্বেগ
মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সামরিক উত্তেজনা নতুন মাত্রা পেয়েছে। উভয় পক্ষের পাল্টাপাল্টি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার মধ্যে ইরান আবারও কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি বন্ধ রাখার ঘোষণা দিয়েছে। এদিকে উপসাগরীয় অঞ্চলের কয়েকটি দেশে অবস্থিত মার্কিন সামরিক স্থাপনায় হামলার দাবি করেছে তেহরান, আর যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছে, তারা ইরানের শতাধিক সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হেনেছে।
রোববার (১২ জুলাই) আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে জানা যায়, গত কয়েক দিনের সংঘাতের ধারাবাহিকতায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা এবং সামুদ্রিক নিরাপত্তা সংকটকে কেন্দ্র করে দুই দেশের মধ্যে সামরিক অভিযান তীব্র আকার ধারণ করেছে।
বিশ্বের মোট সমুদ্রপথে পরিবাহিত অপরিশোধিত তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) উল্লেখযোগ্য অংশ হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়। ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের আঞ্চলিক হস্তক্ষেপ বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত এই প্রণালি বন্ধ থাকবে।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) দাবি করেছে, বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ হয়নি এবং অনেক জাহাজ এখনো নিরাপত্তা ব্যবস্থার মধ্যে দিয়ে চলাচল করছে।
মার্কিন সামরিক বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, শনিবার একদিনেই ইরানের প্রায় ১৪০টি সামরিক স্থাপনায় হামলা চালানো হয়েছে। গত তিন দিনের অভিযানে মোট ৩০০টিরও বেশি লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হেনেছে যুক্তরাষ্ট্র।
ওয়াশিংটনের দাবি, এসব হামলার উদ্দেশ্য ছিল ইরানের সামুদ্রিক হামলার সক্ষমতা দুর্বল করা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
ইরান জানিয়েছে, তারা জর্ডান, কুয়েত, ওমান, কাতার এবং যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র বিভিন্ন দেশের সামরিক স্থাপনা লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে। তেহরানের দাবি অনুযায়ী, কুয়েতে একটি মার্কিন রাডার কেন্দ্র, কাতারে সামরিক কমান্ড সুবিধা এবং ওমানে বিমানবাহী রণতরী-সংশ্লিষ্ট অবকাঠামো লক্ষ্যবস্তু ছিল।
কাতার সরকার জানিয়েছে, হামলার ধ্বংসাবশেষ পড়ে অন্তত তিনজন আহত হয়েছেন, যার মধ্যে একটি শিশুও রয়েছে। একই সময়ে বাহরাইন ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে সতর্কতা সাইরেন বেজে ওঠে।
জর্ডানের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা জানিয়েছে, দেশটিতে ইরান থেকে ছোড়া তিনটি ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানলেও বড় ধরনের প্রাণহানির ঘটনা ঘটেনি।
ওমান উপকূলের কাছে একটি বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার ঘটনায় ১১ জন ভারতীয় নাবিকের মধ্যে ১০ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে। তবে একজন ভারতীয় নাগরিক এখনো নিখোঁজ রয়েছেন বলে জানিয়েছে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
নয়াদিল্লি এ হামলার নিন্দা জানিয়ে দ্রুত উদ্ধার অভিযান চালানোর আহ্বান জানিয়েছে।
গত মাসে যুদ্ধবিরতির লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি অন্তর্বর্তী সমঝোতা হয়েছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক সংঘাত সেই চুক্তির ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে।
ইরানের শীর্ষ আলোচক মোহাম্মদ বাকের কালিবাফ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক বার্তায় বলেন, “একতরফা চুক্তির যুগ শেষ। প্রতিশ্রুতি রক্ষা করুন, নতুবা মূল্য দিতে হবে।”
অন্যদিকে ওমানে ইরান, ওমান ও কাতারের প্রতিনিধিদের মধ্যে হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা এবং নৌপথ সচল রাখার বিষয়ে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে বলে কূটনৈতিক সূত্র জানিয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালিতে অস্থিরতা দীর্ঘস্থায়ী হলে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে। তেলের দাম বৃদ্ধি বিশ্বজুড়ে মুদ্রাস্ফীতি বাড়াতে পারে, যা আমদানি-নির্ভর অর্থনীতিগুলোর জন্য অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করবে।
বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি দেশটির অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতিতেও প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।
মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সংঘাত এখন শুধু দুই দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এটি পুরো উপসাগরীয় অঞ্চল ও বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে। হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে চলমান উত্তেজনা যদি দ্রুত প্রশমিত না হয়, তবে এর অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক প্রভাব বিশ্বব্যাপী আরও গভীর হতে পারে।
