রংপুর নগরীতে একই পরিবারের চার সদস্য হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় তদন্তে নতুন তথ্য পেয়েছে পুলিশ। মামলার দুই আসামি সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাসের মধ্যে হত্যাকাণ্ডের আগের ১২ ঘণ্টায় ৩০ বার ফোনে যোগাযোগের তথ্য মিলেছে। এসব কলের স্থায়িত্ব ছিল মাত্র ১১ থেকে ১৭ সেকেন্ড।
আদালতের অনুমতি নিয়ে মঙ্গলবার রংপুর কেন্দ্রীয় কারাগারের গেটে দুই আসামিকে নতুন করে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে পুলিশ। বুধবার তাদের দ্বিতীয় দফায় জিজ্ঞাসাবাদ করার কথা রয়েছে।
তবে আদালতে দেওয়া দুই আসামির স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি এবং পুলিশের কাছে দায় স্বীকারের তথ্য বিশ্লেষণ করেও হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত উদ্দেশ্য বা মোটিভ সম্পর্কে এখনো নিশ্চিত হতে পারেনি তদন্তকারীরা।
যুগান্তরের অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্যের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাস পিসতুতো ও মামাতো ভাই। তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, এ হত্যাকাণ্ডের ‘মাস্টারমাইন্ড’ সিদ্ধার্থ দাস।
তদন্তসংশ্লিষ্টদের ধারণা, চারজনকে হত্যার ঘটনাটি পূর্বপরিকল্পিত হতে পারে। এটি শুধু নেশাগ্রস্ত অবস্থায় আকস্মিকভাবে সংঘটিত হত্যাকাণ্ড নয় বলেও মনে করছেন তারা।
তবে হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ বা পরিকল্পনার বিষয়ে এখনো নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
তদন্তে সিদ্ধার্থের পরিবার-সংক্রান্ত একটি তথ্যও সামনে এসেছে। সিদ্ধার্থের বাবা বিনয় দাস ও কাকা বিজয় দাসের বাড়ি ছিল নিহত অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির পাশে।
হত্যাকাণ্ডের প্রায় দেড় মাস আগে তারা প্রতিবেশী বিধান চন্দ্র দাসের কাছে ৩৫ লাখ টাকায় ওই বাড়ি বিক্রির জন্য বায়না চুক্তি করেন। বাড়ির দলিল সম্পন্ন হওয়ার পর পরিবারের সদস্যদের নিয়ে ভারতের শিলিগুড়িতে চলে যাওয়ার পরিকল্পনা ছিল বলে জানা গেছে।
স্থানীয় একটি স্বর্ণের দোকানের মালিক বিধান চন্দ্র দাস জানিয়েছেন, প্রায় দেড় মাস আগে বায়না সূত্রে তিনি জমিটি কিনেছেন।
দুই আসামির মোবাইল ফোনের কল ডিটেইলস রেকর্ড বা সিডিআরও তদন্তে গুরুত্ব পাচ্ছে। ১৯ থেকে ২২ আগস্ট পর্যন্ত ৮০ ঘণ্টার কল রেকর্ড বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, হত্যাকাণ্ডের আগে ও পরে সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধের মধ্যে মোট ৮০ বার ফোনে কথা হয়েছে।
এর মধ্যে হত্যাকাণ্ডের আগের ১২ ঘণ্টায় সিদ্ধার্থ তার দুটি নম্বর থেকে মুগ্ধের একটি নম্বরে ৩০ বার ফোন করেন।
তদন্তসংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিটি কলের স্থায়িত্ব ছিল মাত্র ১১ থেকে ১৭ সেকেন্ড। কয়েকটি ফোনকলে একাধিক ব্যক্তি যুক্ত থাকার তথ্যও পাওয়া গেছে। এসব কারণে সন্দেহভাজনের তালিকা আরও বিস্তৃত হচ্ছে বলে জানিয়েছেন তদন্তসংশ্লিষ্টরা।
রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের উপপুলিশ কমিশনার (ডিবি) সনাতন চক্রবর্তী বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ও রংপুর মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জিন্নাত আলী জানান, বুধবার কারাগারের গেটে দুই আসামিকে দ্বিতীয় দফায় জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।
তার ধারণা, সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধ হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে অনেক তথ্যই আড়াল করেছেন।
পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, নতুন করে পাওয়া কল রেকর্ডসহ অন্যান্য তথ্য বিশ্লেষণ করে তদন্ত এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
গত ২২ আগস্ট রাতে রংপুর নগরীর মাছুয়াপাড়া এলাকায় নিজেদের বাড়ি থেকে একই পরিবারের চার সদস্যের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। বাড়িটি বাইরে থেকে তালাবদ্ধ অবস্থায় ছিল।
নিহতরা হলেন রংপুর জিলা স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী জুয়েল (৬৫), তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী ভোলা (৫০), মেয়ে প্রার্থী চক্রবর্তী (২৫) এবং ছোট ছেলে প্রীয়ম চক্রবর্তী (১২)।
চারজনের মৃত্যুর ঘটনায় করা মামলায় সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাসকে আসামি করা হয়েছে। তদন্তে তাদের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি, কল রেকর্ড এবং অন্যান্য তথ্য পর্যালোচনা করা হচ্ছে। তবে হত্যাকাণ্ডের মূল উদ্দেশ্য এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
