বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নিয়েছেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। শুক্রবার সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় বঙ্গভবনের দরবার হলে আয়োজিত অনুষ্ঠানে তাঁকে শপথ পড়ান জাতীয় সংসদের ভারপ্রাপ্ত স্পিকার কায়সার কামাল।
শপথ অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রপতির দায়িত্বে থাকা স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী, সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস, জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান, মন্ত্রিসভার সদস্য, সংসদ সদস্য, বিদেশি কূটনীতিক এবং বেসামরিক ও সামরিক বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারাও অনুষ্ঠানে অংশ নেন।
মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গণির সঞ্চালনায় জাতীয় সংগীতের মধ্য দিয়ে শপথ অনুষ্ঠান শুরু হয়। এরপর পবিত্র কোরআন থেকে তেলাওয়াত করা হয়। পরে ভারপ্রাপ্ত স্পিকার কায়সার কামাল রাষ্ট্রপতিকে শপথবাক্য পাঠ করান।
শপথে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি পদের দায়িত্ব আইন অনুযায়ী বিশ্বস্ততার সঙ্গে পালনের অঙ্গীকার করেন। একই সঙ্গে তিনি বাংলাদেশের প্রতি বিশ্বাস ও আনুগত্য বজায় রাখা এবং সংবিধানের রক্ষণ, সমর্থন ও নিরাপত্তা বিধানের শপথ নেন। ভীতি, অনুগ্রহ, অনুরাগ বা বিরাগের প্রভাবমুক্ত থেকে আইন অনুযায়ী সবার প্রতি যথাযথ আচরণেরও অঙ্গীকার করেন তিনি।
শপথ গ্রহণ শেষে মির্জা ফখরুল শপথনামায় স্বাক্ষর করেন। ভারপ্রাপ্ত স্পিকার কায়সার কামাল তা সত্যায়ন করেন।
এর আগে বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। একাধিক প্রার্থী থাকায় ৩৫ বছর পর এবার রাষ্ট্রপতি পদে সরাসরি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।
বর্তমান সংসদের ৩৪৯ সদস্যের মধ্যে ৩৪৩ জন ভোট দেন। ক্ষমতাসীন বিএনপির প্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর পান ২৫৫ ভোট। তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্যের প্রার্থী কর্নেল (অব.) অলি আহমদ পান ৮৮ ভোট।
নির্বাচনে জয়ী হওয়ার পরদিনই দেশের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদ রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নিলেন মির্জা ফখরুল।
৭৮ বছর বয়সী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার আগে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রীর দায়িত্বে ছিলেন। ২০১৬ সাল থেকে তিনি বিএনপির মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন। এর আগে পাঁচ বছর দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব ছিলেন তিনি। বিএনপির ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘ সময় মহাসচিবের দায়িত্ব পালন করা নেতাও মির্জা ফখরুল।
১৯৪৮ সালের ২৬ জানুয়ারি ঠাকুরগাঁও জেলার কালীবাড়ি এলাকায় জন্মগ্রহণ করেন মির্জা ফখরুল। ঠাকুরগাঁওয়ে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা শেষ করে তিনি ঢাকা কলেজে উচ্চমাধ্যমিক পড়েন। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় ষাটের দশকে তিনি বামপন্থী ছাত্রসংগঠন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের সঙ্গে যুক্ত হন। ১৯৬৯ সালের গণ–অভ্যুত্থানের সময় তিনি সংগঠনটির ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি ছিলেন।
মুক্তিযুদ্ধের সময়ও সংগঠক হিসেবে ভূমিকা রাখেন মির্জা ফখরুল। পরে ভারতে আশ্রয় নেন। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে শিক্ষকতা পেশায় যোগ দেন। ঢাকা কলেজসহ বিভিন্ন সরকারি কলেজে শিক্ষকতা করার পাশাপাশি সরকারি চাকরির অংশ হিসেবে পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরের উপপরিচালকের দায়িত্বও পালন করেন।
মূলধারার রাজনীতিতে সক্রিয় হওয়ার লক্ষ্যে ১৯৮৬ সালে সরকারি চাকরি ছাড়েন মির্জা ফখরুল। দুই বছর পর ঠাকুরগাঁও পৌরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন তিনি। নব্বইয়ের দশকের শুরুতে বিএনপিতে যোগ দিয়ে প্রথমে দলের নির্বাহী কমিটির সদস্য এবং পরে জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিবের দায়িত্ব পান।
দলের অঙ্গসংগঠন জাতীয়তাবাদী কৃষক দলের সহসভাপতি ও সভাপতির দায়িত্বও পালন করেছেন তিনি।
২০০১ সালের জাতীয় নির্বাচনে প্রথমবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন মির্জা ফখরুল। ওই নির্বাচনে বিএনপি সরকার গঠন করলে তিনি কৃষি প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পান। পরে বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।
২০১৮ সালের নির্বাচনে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে বগুড়ার একটি আসন থেকে দ্বিতীয়বার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হলেও দলীয় সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তিনি সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নেননি।
দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের নানা পর্যায় পেরিয়ে এবার দেশের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদ রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করলেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
